চতুর্থ অধ্যায় : প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (৩২৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ)
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-৫
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
হবিগঞ্জ অঞ্চলের রাজা বৌদ্ধ হলেও সব ধর্মাবলম্বী প্রজার প্রতি ছিল তার সমান পৃষ্ঠপোষকতা। তিনি একটি হিন্দু মন্দিরের জন্য করমুক্ত ভূমি দান করেছিলেন।
ক) শশাঙ্ক কোন ধর্মের উপাসক ছিলেন? ১
খ) সেন শাসকদের ব্রহ্মক্ষত্রিয় বলে মনে করা হয় কেন? ২
গ) উদ্দীপকের রাজার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তোমার পঠিত কোন পাল রাজার কর্মকাণ্ডের মিল লক্ষ করা যায়? ব্যাখ্যা করো। ৩
ঘ) তুমি কী মনে করো ওই শাসকই ছিলেন পাল রাজাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ? উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি দাও। ৪
উত্তর: ক) শশাঙ্ক ছিলেন হিন্দু ধর্মের উপাসক। তিনি শৈব বা শিবের পূজারি ছিলেন এবং বৌদ্ধধর্মের বিরোধী মনোভাব পোষণ করতেন। তার শাসনামলে বৌদ্ধ মঠ ও ভিক্ষুদের ওপর নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া যায়।
খ) সেন শাসকদের ব্রহ্মক্ষত্রিয় বলা হয়, কারণ তারা উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ হলেও তারা রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে রাজ্য শাসন করতেন এবং সামরিক নেতৃত্ব দিতেন। ব্রহ্মক্ষত্রিয় বলতে এমন এক শ্রেণিকে বোঝায়, যারা ব্রাহ্মণ হিসেবে ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন হলেও যুদ্ধ ও শাসন কাজে অংশগ্রহণ করেন। সেন রাজারা ব্রাহ্মণ বংশীয় ছিলেন, কিন্তু তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সমাজ ও রাজ্য শাসনে নিজেদের নিয়োজিত করেন।
গ) উদ্দীপকের রাজার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পাল বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা ধর্মপাল এবং দেবপালের কর্মকাণ্ডের মিল পাওয়া যায়। উদ্দীপকের রাজা, যদিও নিজে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন, তবু তিনি তার রাজ্যের সব ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রতি সমান আচরণ করতেন এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য করমুক্ত ভূমি দান করেছিলেন। ধর্মপাল এবং দেবপালও এই ধরনের উদারতা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করতেন।
ধর্মপাল ও দেবপালের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও উদারতা:
১. ধর্মীয় সহিষ্ণুতা: ধর্মপাল এবং দেবপাল উভয়েই ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও তারা হিন্দু ধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং নিজেদের রাজ্যে হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং সংস্কারের জন্য ভূমি দান করতেন। উদাহরণস্বরূপ, পাল রাজারা হিন্দু দেবদেবীর মন্দির এবং মঠ নির্মাণের জন্য ভূমি ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এতে বোঝা যায় যে পাল রাজাদের মধ্যে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও উদারতা ছিল।
আরো পড়ুন : প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস অধ্যায়ের ১টি সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর, ৪র্থ পর্ব
২. সব ধর্মাবলম্বীর প্রতি সমান আচরণ: পাল শাসকরা, বিশেষত ধর্মপাল, সব ধর্মাবলম্বী প্রজার প্রতি সমান আচরণ করতেন এবং তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানাতেন। উদ্দীপকের রাজাও তার রাজ্যের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য করমুক্ত ভূমি দান করেন, যা পাল রাজাদের এই সহিষ্ণু ও সমানাধিকার নীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
৩. ধর্মীয় স্থাপনার পৃষ্ঠপোষকতা: পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হলেও তারা অন্য ধর্মের ধর্মীয় স্থানগুলোকেও সহায়তা করতেন। উদ্দীপকের রাজার কর্মকাণ্ডও একইভাবে প্রজাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে।
পাল রাজারা যেমন ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সমানাধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, তেমনি উদ্দীপকের রাজার কর্মকাণ্ডও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার একটি উদাহরণ। পাল রাজাদের শাসনামলে এই উদার মনোভাব এবং প্রজাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ তাদের শাসনব্যবস্থাকে শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখতে সহায়ক হয়েছিল।
ঘ) ওই শাসককে যদি আমরা ধর্মপাল বা দেবপাল হিসেবে ধরে নিই, তবে বলা যেতে পারে যে তিনি পাল রাজাদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন। পাল বংশের শাসকরা বাংলা অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা, সামরিক সাফল্য এবং সংস্কৃতির বিকাশে অসামান্য অবদান রেখেছেন। পাল রাজাদের মধ্যে ধর্মপালকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে গণ্য করা হয়। তার শাসনামলে বাংলা একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অর্জন করা সম্ভব হয়।
ধর্মপাল বা দেবপালের শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে যুক্তি:
১. সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি: ধর্মপাল তার শাসনামলে বাংলার সাম্রাজ্যকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে গড়ে তোলেন এবং তার সাম্রাজ্য উত্তর ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তিনি মহাজনপদ ও মিথিলার মতো অঞ্চল দখল করেন এবং পাঞ্জাবের গন্ধর্বরাজ্য পর্যন্ত পাল সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি করেন। এটি তাকে এক অনন্য শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
২. শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ: ধর্মপালের শাসনকালে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটে। তিনি বিক্রমশিলা মহাবিহারের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজত্বকালে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম এবং সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়।
৩. ধর্মীয় সহিষ্ণুতা: ধর্মপাল এবং দেবপাল ধর্মীয় সহিষ্ণুতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তারা বৌদ্ধ হলেও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সমান উদার ছিলেন এবং তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য সাহায্য করতেন। এটি তাদের মহান হিসেবে চিহ্নিত করে।
৪. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: ধর্মপাল তার শাসনামলে বাংলায় দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেন। তার শাসনকাল বাংলার মানুষের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়।
ওই শাসকই ছিলেন পাল রাজাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ শাসক, কারণ তার শাসনকালে শিক্ষা, সংস্কৃতি, এবং সামরিক শক্তি একত্রিত হয়ে পাল সাম্রাজ্যকে একটি স্থিতিশীল এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিল। তার শাসনব্যবস্থা পাল বংশের গৌরবকে আরও বৃদ্ধি করেছিল এবং বাংলার ইতিহাসে এক সোনালি অধ্যায় রচনা করেছিল।
লেখক : সহকারী শিক্ষক
সাভার অধরচন্দ্র সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
কবীর