উপন্যাস : লালসালু
উপন্যাসের পটভূমি
প্রশ্ন: লালসালু উপন্যাসের পটভূমি লেখ।
উত্তর: পটভূমি: লালসালু মূলত একটি সামাজিক উপন্যাস। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয় ভীতি এই উপন্যাসের উপজীব্য বিষয়। মজিদ নামে এক স্বার্থান্বেষী, ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ীকে কেন্দ্র করে এর কাহিনি গড়ে উঠেছে। স্বার্থান্বেষণে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে অবশেষে মজিদ মহব্বতনগর গ্রামে ঘাঁটি গাড়ে মাতব্বর খালেক ব্যাপারীর বাড়িতে। সেই গ্রামের বাঁশঝাড়সংলগ্ন ছিল একটি পরিচয়বিহীন কবর। এরপর মজিদ প্রচার করতে শুরু করে কবরটি মোদাচ্ছের (নাম না জানা) পীরের এবং স্বপ্নাদেশে মাজারের তদারকির জন্যই এ গ্রামে তার আগমন ঘটেছে। গ্রামবাসী তার স্বপ্নের বিবরণ শুনে ভীত হয় এবং একই সঙ্গে বিশ্বাস করে। তারা কবরটি দ্রুত পরিষ্কার করে লালসালুতে ঢেকে সেটিকে একটি পীরের মাজারে পরিণত করে। আর মজিদ হয়ে ওঠে মাজারের খাদেম। এভাবে মজিদের একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে মাজারটি। অল্পদিনের মধ্যেই মজিদ
আরো পড়ুন : সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ৪টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৬ষ্ঠ পর্ব
সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠে। ধর্মকর্মের মধ্য দিয়ে নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বলে প্রচারের মাধ্যমে গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন। ‘লালসালু’ বাঙালি লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ রচিত অভিষেক উপন্যাস। ১৯৪৮ সালে রচিত এবং প্রকাশিত উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী সৃষ্টিকর্ম হিসেবে বিবেচিত। এর পটভূমি ১৯৪০ কিংবা ১৯৫০ দশকের বাংলাদেশের গ্রামসমাজ হলেও এর প্রভাব কালোত্তীর্ণ। ধর্মভীরু গ্রামীণ মুসলিম সমাজে সাধারণ মানুষের সরলতাকে কেন্দ্র করে এক কল্পিত মাজারকে পুঁজি করে চতুর ধর্মব্যবসায়ী কীভাবে প্রতিষ্ঠা পায়, ধর্মকে ব্যবসার উপাদানরূপে ব্যবহার করে কীভাবে স্বার্থ হাসিল করে তাই চিত্রিত হয়েছে এ উপন্যাসে। ওয়ালীউল্লাহ্ এই উপন্যাসের জন্যে ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। উপন্যাসটি উর্দু, ফরাসি, ইংরেজি, জার্মান ও চেক ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। ১৯৪৮ সালে ‘লালসালু’ প্রকাশিত হয় ঢাকার কমরেড পাবলিশার্স থেকে। ১৯৬০ সালে ‘কথাবিতান’ প্রকাশনী বের করে দ্বিতীয় সংস্করণ। পরে ‘নওরোজ কিতাবিস্তান’ থেকে ১৯৬৩ সালে এর পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান লেখক সংঘ কর্তৃক করাচি থেকে Lal Shalu নামে উপন্যাসটির উর্দু অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অনুবাদ করেছিলেন কলিমুল্লাহ্। একই বছর প্যারিস থেকে এর ফরাসি অনুবাদ বের হয়। ‘L Arbre sans racines’ শিরোনমে ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল ‘Editions du Seuil’ প্রকাশনী থেকে। এটি অনুবাদ করেছিলেন ওয়ালীউল্লাহ্র সহধর্মিণী অ্যান-মারি-থিবো। ‘লালসালু’ উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ করেন অ্যান-মারি-থিবো, জেফ্রি ডিবিয়ান, কায়সার সাঈদ এবং মালিক খৈয়াম। তবে ওয়ালীউল্লাহ্ নিজে এতে সম্প্রসারণের কাজ করেন। ১৯৬৭ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ‘Chatto And Windus’ লিমিটেড থেকে উপন্যাসটি ‘Tree Without Roots’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে উপন্যাসটি আরবি, জার্মান, চেক, ইন্দোনেশীয়, জাপানি ভাষাসহ বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
কবীর