অফলাইন ও অনলাইন ব্যবসা ক্ষেত্রে একটি পরিচিত শব্দ হচ্ছে ‘ব্র্যান্ডিং’। যেকোনো প্রোডাক্টকে বাকি সবার থেকে আলাদা করে কাস্টমারদের পছন্দের তালিকায় নিয়ে আসতে ‘ব্র্যান্ডিং’-এর বিকল্প নেই।
দেশের বড় কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করলেও বেশির ভাগ ছোট ছোট কোম্পানি ব্র্যান্ডিং নিয়ে অনেকটাই উদাসীন। অথচ ব্র্যান্ডিংই একটি কোম্পানিকে সাফল্যের কাতারে নিয়ে আসে।
কোম্পানির ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ানোর উপায় নিচে তুলে ধরা হলো-
ব্র্যান্ডিং কী?
কাস্টমারের মনে একটি পণ্যের ইউনিক চিন্তাধারা তৈরির কৌশলই হলো ব্র্যান্ডিং। ক্রেতা বা কাস্টমার-প্রতি পণ্যের মান ও সেবার প্রতিশ্রুতি হলো ব্র্যান্ডিংয়ের মূল উদ্দেশ্য। বর্তমান বিশ্বের চরম প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই ব্র্যান্ডিংয়ের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে খুব সহজেই আপনার পণ্যের প্রতি ক্রেতা আকৃষ্ট করতে পারবেন।
ব্র্যান্ড ইমেজ বজায় রাখতে পারলে পণ্য বিক্রি করাটা খুব সহজ হয়ে যায়। এর মাধ্যমে কাস্টমার আপনার সেবা ও মানের প্রতি আসক্ত হতে বাধ্য থাকে। পাশাপাশি পারে কম বিক্রি করেও পর্যাপ্ত মুনাফা করার ব্যবস্থা করতে।
ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিংয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?
অনেকেই ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিং দুটোকেই এক মনে করে। অথচ এ দুটোই আলাদা আলাদা বিভাগ। তবে পুরোপুরি এক না হলেও একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পর্কিত। ব্র্যান্ডিংকে একটি ভিন্নমাত্রার মার্কেটিং প্ল্যানও বলা যেতে পারে।
মার্কেটিং পলিসিতে সাধারণত প্রোডাক্ট কিনতে কাস্টমারকে চাপ প্রয়োগ করা হয়। আমরা দিচ্ছি সেরা পণ্যটি, আমাদের পণ্য অন্য সব পণ্যের থেকে ভালো ইত্যাদি ইত্যাদি প্রমোশনাল বাক্য এক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হয়। যা সাধারণত টার্গেট কাস্টমারকে পণ্য কেনার জন্য উদ্বুদ্ধ করার জন্য বলা হয়ে থাকে।
অপরদিকে কোনো মানসম্মত ব্র্যান্ড কখনই এভাবে তার ব্র্যান্ডিং করবে না। এক্ষেত্রে তারা কাস্টমারকে পুশ না করে পুল করে। প্রলুব্ধ না করে তার নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার ফলে কাস্টমারই আকৃষ্ট হয়ে ব্র্যান্ডের কাছে আসে তার পণ্য কিনতে। মনে রাখবেন, ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে নিজেকে কাস্টমারের কাছে গিয়ে তার পণ্য কিনতে বলতে হয় না।
আপনি ব্র্যান্ডিং করবেন, নাকি গতানুগতিক মার্কেটিং করে পণ্য বিক্রি করার চেষ্টা করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনাকে ভেবে দেখতে হবে কোন পথটি আপনাকে স্থায়ী সমাধান দেবে! এক্ষেত্রে ব্র্যান্ডিং হতে পারে আপনার পারফেক্ট চয়েস।
ব্র্যান্ডিংয়ের বেশকিছু স্পেশাল টিপস
সফলতার সঙ্গে কীভাবে আপনার ব্যবসার জন্য ব্র্যান্ডিং বাস্তবায়ন করবেন তার ওপর দশটি গুরুত্বপূর্ণ টিপস সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো-
লোগো ব্যবহারেই ব্র্যান্ডিং হয় না: বর্তমান সময়ের কাস্টমার বা গ্রাহকরা অনেক বেশি সচেতন। তাই তাদের সচেতনতাকে সম্মান করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, সব কিছুর ওপর লোগো ব্যবহার করাকেই ব্র্যান্ডিং বলে না। তাই ব্র্যান্ডিং করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।
গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন: আপনার ব্র্যান্ডিং ভ্যালু বাড়াতে সর্বদা গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করুন। অনেকেই মনে করেন দাম কমালেই গ্রাহক ধরা যাবে। কিন্তু গ্রাহক আকৃষ্ট করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে, দাম কমানোর চেয়ে দারুণ দারুণ অফার দেওয়া। কেননা বিজ্ঞাপন দিয়েও যে কেউ চাইলে তার হারানো ব্র্যান্ডিং ফিরিয়ে আনতে পারে।
উদ্ভাবনী এবং সাহসী হওয়ার চেষ্টা করুন: সব সময় উদ্ভাবনী এবং সাহসী হওয়ার চেষ্টা করুন। বড় বড় ব্র্যান্ডের ডিসিশন মেকাররা কঠোর থাকেন তাদের ব্র্যান্ড নিয়ে। পাশাপাশি আমলাতন্ত্রের বড় স্তর থাকায় তাদের কাস্টমারদের চাহিদার পরিবর্তন হলেও তারা নমনীয় হন না। এমনটা না করে কোম্পানির জন্য উদ্ভাবনী এবং সাহসী ট্রিকস ফলো করুন। দেখবেন, সাফল্য আপনার হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেবে।
বড় ব্র্যান্ডগুলোকে অনুকরণ করা বন্ধ করুন: অনেকেই আছেন যারা বড় ব্র্যান্ডগুলোকে অনুকরণ করেন। কিন্তু সব সময় অনুকরণ না করে নিজের স্বাতন্ত্র্যসূচক পরিচয় খুঁজে দেখার কাজে নেমে পড়ুন। ইতোমধ্যে একটি বাজার দখল করে আছে এই বড় ব্র্যান্ডগুলো। তবে তাদের কিছু কাস্টমার আছেন যারা তাদের সার্ভিস কিংবা প্রডাক্ট থেকে আরও ইউনিক অথবা ভালো সার্ভিস খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করুন।
কাস্টমারের সঙ্গে প্রোডাক্ট নিয়েই আলোচনা করুন: কাস্টমার বা গ্রাহকের সঙ্গে সব সময় টু দ্য পয়েন্টে কথা বলার চেষ্টা করুন। কথা বলার সময় কখনো ইস্যু পরিবর্তন করবেন না। সার্ভিস বা প্রোডাক্ট নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করুন। এতে আপনার প্রতিটি কাস্টমার খুব ভালোভাবেই বুঝবে তার কোন ধরনের সেবা আপনি করতে পারবেন।
একই বার্তা ভিন্নভাবে প্রকাশ করুন: একই বার্তা বারবার শুনতে কারও ভালো লাগে না। এক্ষেত্রে চাইলে আপনার একই বার্তাটিকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করতে পারেন।
গ্রাহকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ুন: চাকচিক্যময় প্যাকেট কিংবা খুব বড় কোনো অফার দেওয়া মানেই গ্রাহকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা নয়। কিছু দেবেন বলে পরে তা যদি দিতে না পারেন, তবে আপনার সঙ্গে কাস্টমারের সম্পর্ক খারাপ হবে। সুতরাং সব সময় সত্য তথ্য দিয়ে আপনি আপনার কাস্টমারের বিশ্বাস অর্জন করার চেষ্টা করুন। গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘ সময় সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন।
বুঝে কাজ করুন: সবার প্রথমে খুঁজে বের করুন কোন প্রোডাক্ট বা সার্ভিস আপনার কোম্পানির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ওই প্রোডাক্ট বা সার্ভিসই আপনাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। তাই সেদিকে ফোকাস করুন। প্রোডাক্টের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য সময় ব্যয় করুন।
ব্র্যান্ড ডেভেলপকে ব্যক্তি ভাবুন: প্রত্যেকটা মানুষেরই আলাদা আলাদা চরিত্র, বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং উদ্দেশ্য আছে। এসব দিয়ে তাকে চেনা যায়। ঠিক তেমনি ব্র্যান্ডিংয়েরও তা থাকা উচিত। আমাদের ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায় নিজেদের উপস্থাপনায়, কীভাবে আমরা কথা বলি তার মাধ্যমে। ব্র্যান্ড ডেভেলপ করতে গেলে এসব ব্যাপারগুলোও মাথায় রাখতে হবে।
গ্রাহকের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করুন: মার্কেট রিসার্চ করে আপনার কাস্টমার বা ক্লায়েন্টের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা নিন। এতে প্রোডাক্ট বা সার্ভিস দিয়ে কীভাবে বাজারে আপনি পার্থক্য তৈরি করবেন তা ঠিক করা সহজ হয়ে যাবে।
ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্ব
পণ্যের জন্য একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি এবং বাস্তবায়ন করতে ব্র্যান্ডিং খুবই জরুরি। ব্র্যান্ডিং ভালো হলে পণ্যের ওপর কাস্টমারদের আস্থা থাকে। এর ফলে গ্রাহক বারবার সেই পণ্যের কাছেই ফিরে আসে। ব্র্যান্ডিং আপনার পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের একটি সামাজিক মূল্য তৈরিতে সাহায্য করে। ব্যবসার সফলতার অন্যতম একটি সিঁড়ি হচ্ছে ব্র্যান্ডিং।
তারেক