আজকের বিশ্ব তথ্য ও প্রযুক্তির বিশ্ব। প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, তথ্যের গুরুত্ব তত বাড়ছে। আর তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তথ্য বিশ্লেষণ। তথ্য বিশ্লেষণের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে পরিসংখ্যান। একসময় যেটিকে কেবল সংখ্যার হিসাব-নিকাশের বিষয় হিসেবে দেখা হতো, এখন সেটিই হয়ে উঠেছে আধুনিক অর্থনীতি, ব্যবসা, স্বাস্থ্য, গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের মূল ভরকেন্দ্র। তাই পরিসংখ্যান বিষয়ে পড়াশোনা এখন আর শুধু একাডেমিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার পথ।
পরিসংখ্যান মূলত তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি পদ্ধতি। সমাজ, অর্থনীতি বা ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ডেটার বিশ্লেষণ অপরিহার্য। পরিসংখ্যানবিদরা সেই কাজটাই করেন বৈজ্ঞানিকভাবে। বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি খাতেও এখন তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে, ফলে পরিসংখ্যানবিদদের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলেছে।
যেখানে পড়া যায়
বাংলাদেশের প্রায় সব পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর মেয়াদি বিএসসি এবং এক অথবা দুই বছর মেয়াদি এমএসসি ডিগ্রি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও পরিকল্পনা কমিশনে গবেষণা বা প্রশিক্ষণ ইন্টার্নশিপের সুযোগ থাকে, যা পরিসংখ্যান শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের দারুণ ক্ষেত্র।
যা যা পড়ানো হয়
পরিসংখ্যান বিষয়ে একাডেমিকভাবে মূলত তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশল শেখানো হয়। স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা সম্ভাব্যতার তত্ত্ব, বর্ণনামূলক পরিসংখ্যান, রিগ্রেশন ও সহ-সম্পর্ক বিশ্লেষণ, নমুনা সংগ্রহ পদ্ধতি, পরীক্ষা পরিকল্পনা ও কালানুক্রমিক বিশ্লেষণ শিখে। পাশাপাশি কম্পিউটারভিত্তিক ডেটা বিশ্লেষণের জন্য R, Python, SPSS, STATA ইত্যাদি সফটওয়্যার শেখানো হয়। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায়োগিক পরিসংখ্যান, বায়োস্ট্যাটিস্টিকস, ইকোনমেট্রিকস, মেশিন লার্নিং ও মাল্টিভেরিয়েট অ্যানালাইসিসের মতো বিশেষায়িত কোর্স অন্তর্ভুক্ত থাকে।
চাকরির ক্ষেত্র ও সুযোগ
পরিসংখ্যান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ রয়েছে। সরকারি খাতে যেমন- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, পরিকল্পনা কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্পে চাকরি পাওয়া যায়।
বেসরকারি খাতে সুযোগ আরও বহুমাত্রিক। ব্যাংক, বিমা, এনজিও, টেলিকম, মার্কেট রিসার্চ কোম্পানি, ডেটা অ্যানালিটিক্স ফার্ম, এমনকি সংবাদমাধ্যমেও পরিসংখ্যানবিদরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার বিশ্লেষণ ও গ্রাহকদের আচরণ বুঝতে ডেটা সায়েন্টিস্ট ও অ্যানালিস্ট নিয়োগ দিচ্ছে, যেখানে পরিসংখ্যানের জ্ঞান অপরিহার্য।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ
পরিসংখ্যান বিষয়ে যারা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী, তাদের জন্য দেশ-বিদেশে গবেষণার অনেক সুযোগ রয়েছে। বায়োস্ট্যাটিস্টিকস, ডেটা সায়েন্স, ইকোনমেট্রিকস, বা মেশিন লার্নিংয়ের মতো শাখায় উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারেন।
পরিসংখ্যান আর কেবল ‘সংখ্যার খেলা’ নয়; এটি এখন ‘তথ্যের শক্তি’। এই বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন মানে হলো এমন এক পেশাজীবন গড়া, যেখানে বিশ্লেষণ, যুক্তি ও প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎকে গঠন করা যায়। তাই যে তরুণরা যুক্তিনির্ভর চিন্তাশীলতা ও গবেষণায় আগ্রহী, তাদের জন্য পরিসংখ্যান হতে পারে উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের পথ।
তারেক/