অভিনয় ছিল তার মনে, প্রাণে ও ধ্যানে। চরিত্রকে এমনভাবে জীবন্ত করে তুলতেন, মনেই হতো না কেউ অভিনয় করছেন। মনে হতো ঘটনাটি এই প্রথম ঘটছে, আর এই ব্যক্তির সাথেই এটি ঘটছে। অভিনয় দক্ষতার জন্য জিতে নিয়েছেন অস্কারসহ অভিনয় জগতের সব শীর্ষ পুরস্কার। তবে দর্শকদের মাঝে বেশিদিন বাঁচতে পারেননি তিনি। মাত্র ৪৬ বছরেই সোনালি ক্যারিয়ারের মাঝেই পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। তবে মৃত্যুর পরেও গড়লে রেকর্ড, হলেন একুশ শতকের সেরা অভিনয়শিল্পী- বলছিলাম আমেরিকার প্রয়াত অভিনেতা, ‘দ্য অ্যাক্টরস অব ডেপথ’ ফিলিপ সেমোর হফম্যানের কথা।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রভাশালী গণমাধ্যম ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ চলচ্চিত্রে একবিংশ শতকের সেরা ৬০ অভিনয়শিল্পীর তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকা শীর্ষে উঠে এসেছেন হফম্যান। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী এমা স্টোন।
ফিলিপ হফম্যান ১৯৬৭ সালে নিউইয়র্কের ফেয়ারপোর্ট এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। মা-বাবা ছিলেন জাতিতে আইরিশ ও জার্মান বংশোদ্ভুত।
ছোটবেলা থেকেই মায়ের সাথে গিয়ে থিয়েটার উপভোগ করতেন হফম্যান। তবে খেলাধুলার প্রতি তার ছিল তুমুল আসক্তি। হতে চেয়েছিলেন একজন রেসলার ও বেসবল খেলোয়ার। ১৪ বছর বয়সে কনুইতে মারাত্মক আঘাত পান তিনি। বাধ্য হয়ে নিজের স্বপ্ন থেকে ফিরে আসেন। মায়ের অনুপ্রেরণায় এরপর অভিনয়ের দিকেই মনোযোগী হন তিনি। যোগদান করেন একটি নাটকের ক্লাবে। এক্ষেত্রে সেখানকার একজন নারী অভিনেত্রীর অভিনয় তার সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
ধীরে ধীরে অভিনয় হফম্যানের আবেগের জায়গায় পরিণত হয়। এ সম্পর্কে হফম্যান একবার বলেছিলেন, ‘অভিনয়ের সঙ্গ এবং এর আশেপাশের মানুষদের আমি ভালোবাসতাম, আর আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিই যে আমি এটাই করতে চাই।’
১৭ বছর বয়সে হফম্যান ‘নিউ ইয়র্ক স্ট্যাট সামার স্কুল অব দ্য আর্ট’ এ যোগদানের সুযোগ পান। এখানে বেনেট মিলার ও ড্যান ফাটারম্যানের মতো ভবিষ্যৎ সহকারী অভিনেতাদের সাথে তার পরিচয় হয়। মিলার হফম্যানের প্রাথমিক অভিনয় সম্পর্কে মন্তব্যে করে একদা বলেছিলেন, ‘হফম্যান যা করতো তা সম্পর্কে সে সত্যিকার অর্থেই প্রচুর ঐকান্তিক ও আবেগপ্রবণ ছিলেন। আর তার প্রচেষ্টা দেখে আমরা খুবই আকৃষ্ট হতাম।’
এরপর হফম্যান নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিনয়ে পড়াশোনার সুযোগ পান। ১৯৮৯ সালে তিনি সেখান থেকে ড্রামা ডিগ্রি লাভ করেন।
স্নাতক শেষে এ অভিনেতা যোগদেন ‘অফ-ব্রডওয়ে থিয়েটার’-এ। এসময় জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি কাস্টমার সার্ভিসের চাকরিও করেন। ১৯৯১ সালে ‘দ্য ভায়োলেন্স অব সামার’ এর ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’ এপিসোডে প্রথমবারের মতো তাকে পর্দায় দেখা যায়। তিনি এখানে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করেন। সে বছরই তার পরবর্তী কাজ ‘ট্রিপল বগে অন অ্যা পার ফাইভ হোল’ এ অভিনয় করে তিনি জনপ্রিয়তা পান। এসময় তার নাম নিয়ে তিনি বিরম্বনায় পড়েন। কেননা তার নামেই আরেকজন অভিনেতা ছিল। তাই তিনি তার দাদার নাম ‘সেমোর’ কে তার নামের মাঝে যোগ করেন।
এরপর তিনি ‘মাই নিউ গান’, ‘লিপ অব ফেইথ’ এর মতো সিনেমাগুলোতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। তিনি প্রথম সবার নজরে আসেন আল পেচিনোর অস্কার পাওয়া সিনেমা ‘সেন্ট অব অ্যা উইমেন’-এ একজন প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষর্থীর চরিত্রে অভিনয় করে। চরিত্রটির জন্য তাকে পাঁচবার অডিশন দিতে হয়েছিল। এই সিনেমাটি তখন বিশ্বব্যাপি ১৩৪ মিলিয়ন ডলার আয় করে। সিনেমাটি সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে হফম্যান বলেছিলেন, ‘এই সিনেমায় যদি আমি অভিনয়ে সুযোগ না পেতাম তাহলে আজকে হয়তোবা আমি এই জায়গায় থাকতাম না।’
১৯৯৬-১৯৯৯ সালের মধ্যে উদীয়মান অভিনেতা হিসেবে হফম্যান বেশ সুনাম অর্জন করেন। এসময় তিনি ‘হার্ড এইট’, ‘টুইস্টার’, ‘বগি নাইটস’, ‘রোলিং স্টোন’, ‘মন্টানা’র মতো জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করেন।
পর্দায় অভিনয়ে জোর দিলেও একইসাথে থিয়েটারেও অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছিলেন হফম্যান। থিয়েটারে অভিনয়ের জন্য অর্জন করেন ‘ড্রামা ডেস্ক অ্যাওয়ার্ড’, ‘টনি অ্যাওয়ার্ড’ এর মতো পুরস্কারও।
২০০২ সালে হফম্যান প্রথমবারের প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। টড লুইসের ট্রাজিকমিডি ঘরণার সিনেমা ‘লাভ লিজা’তে। তবে সিনেমাটি ব্যবসাসফল হতে পারেনি। ২০০৩ সালে হফম্যানের দ্বিতীয় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা ‘ওনিং মাহাওনি’ সিনেমাটিও তেমন আয় করতে পারেনি।
২০০৫ সালে ‘ক্যাপোট’ সিনেমাটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন হফম্যান। এ সিনেমাটিকে তার ক্যারিয়ার ঘুরানো সিনেমা হিসেবে দেখা হয়। সিনেমাটির শুটিংয়ের সময় তিনি চরিত্রটির ভেতর সারাক্ষণ নিমগ্ন থাকতেন যাতে চরিত্রের জন্য তার কণ্ঠ ও অঙ্গভঙ্গি হারিয়ে না ফেলেন। পরিশ্রম করে সফলতাও পান তিনি। সিনেমাটিতে নিজের অভিনয়ের জন্য হফম্যান বিনোদন জগতের শীর্ষ পুরস্কার ‘অস্কার’ জিতে নেন। এছাড়াও এ সিনেমার জন্য তিনি গ্লোন্ডেন গ্লোব, স্ক্রিন অ্যাক্টর গিল্ড অ্যাওয়ার্ড, বাফটা অ্যাওয়ার্ডেও ভূষিত হন।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি এই অভিনেতাকে। উপহার দিয়েছেন ‘চার্লি উইলসন ওয়ার্স’, ‘ডাউট’, ‘দ্য মাস্টার’, ‘দ্য আইডিয়াস অব মার্চ’, ‘দ্য সেভেজেস’-এর মতো বহু জনপ্রিয় ও ব্যবসাসফল সিনেমা। জিতেছেন বিনোদন জগতের নামকরা সব পুরস্কার।
১৯৯৯ সালে কস্টিম ডিজাইনার মিমি ও’ডনেলের সাথে সম্পর্কে জড়ান হফম্যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিল তাদের সে সম্পর্ক। তাদের সংসারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। আমেরিকান অভিনেতা কুপার হফম্যান তাদের সন্তান।
সোনালী এক ক্যারিয়ার গড়ে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে মারা যান হফম্যান। বাথরুম থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বিভিন্ন ধরনে মাদক একসাথে নেওয়ার কারণে তার মৃত্যু হয়েছিল বলে পড়ে জানা যায়।
হাসান