নারী অধিকার, কৃষি, প্রাণবৈচিত্র্য ও খাদ্য সার্বভৌমত্বের আন্দোলনে পরিচিত মুখ ফরিদা আখতার। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের কৃষক, নারী এবং স্থানীয় উৎপাদনব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে আসছেন। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান উবিনীগের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তিনি বিকল্প উন্নয়ন ভাবনার অন্যতম প্রবক্তা। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন সরকারের দায়িত্ব পালনের অম্ল-মধুর নানা অভিজ্ঞতার কথা। তার সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন খবরের কাগজের সিনিয়র রিপোর্টার শাহনাজ পারভীন এলিস।
খবরের কাগজ: আপনি তো রাজনীতিক নন, একজন মানবাধিকার কর্মী। কৃষি ও নারী আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা সমাজকর্মী। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার আহ্বান প্রথম কীভাবে পেলেন?
ফরিদা আখতার: আমি দলীয় রাজনীতি করিনি, কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্নে সব সময় সক্রিয় ছিলাম। নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে ১৯৮৭ সাল থেকে আছি। দীর্ঘদিন ধরে কৃষি আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। সরকারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রথম প্রস্তাবটা ছাত্রদের কাছ থেকেই আসে। প্রথমে আমি রাজি হইনি, বলেছিলাম, আমি তোমাদের সঙ্গে রাস্তায় থাকতে চাই। পরে যখন জানতে পারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তালিকায়ও আমার নাম আছে, তখন দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হই।
খবরের কাগজ: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ফরিদা আখতার: এই মন্ত্রণালয়টি বরাবরই অবহেলিত। প্রথমে মনে হয়েছিল বিষয়টি আমার জন্য অপরিচিত। কিন্তু পরে বুঝলাম কৃষি, মৎস্য খাত ও প্রাণিসম্পদের বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্থানীয় জাত সংরক্ষণ, কৃষকের অধিকার এবং খাদ্য সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমি বহুদিন কাজ করেছি। মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখলাম, দেশীয় জাত সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে উৎপাদন বাড়াতে হবে, অন্যদিকে স্থানীয় জাত ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে। এই ভারসাম্য রক্ষার সংগ্রামেই আমার সময় কেটেছে।
খবরের কাগজ: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
ফরিদা আখতার: অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনই ছিল না। অবৈধ জাল ব্যবহার, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরা—এসব বন্ধ করতে আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ছিল। আবার মৎস্যজীবীদের জন্য কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাও ছিল না। মৎস্যজীবীদের সবচেয়ে বড় সংকট দাদন ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার হাত থেকে জেলেদের মুক্ত করতে আমরা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যেন মৎস্যজীবীরাও নীতিগত জায়গা থেকে ঋণ পেতে পারেন। কিন্তু ওটা বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত গিয়ে আটকে আছে। তারা ব্যাংক বাড়াতে অনীহা জানিয়েছে।
খবরের কাগজ: নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আপনি কী বলবেন?
ফরিদা আখতার: নারী কমিশন গঠনের দাবিটা আমরা কয়েকজন উপদেষ্টাই তুলেছিলাম। কমিশনের সুপারিশগুলোও অনেক ভালো ছিল। কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, বিশেষ করে নারীর সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্নে। কমিশনের প্রস্তাবে অনেক ভালো বিষয় ছিল। যেমন সংসদে সংরক্ষিত যে নারী আসন, সেগুলোতেও সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব এই কমিশনের ছিল। আমি মনে করি, সরকারের আন্তরিকতার অভাব ছিল না। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা ছিল। ধর্মীয় গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তির কারণে অনেক বিষয় এগিয়ে নেওয়া যায়নি। নারী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে এটা নিয়ে আমার মনেও দুঃখবোধ আছে। তবে আমি দেখেছি, তাদের আন্তরিকতার অভাব ছিল না; বরং পরিস্থিতিগত সীমাবদ্ধতা ছিল।
খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ ছিল সংসদ নির্বাচন আয়োজন ও নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু এই নির্বাচনকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ফরিদা আখতার: একটা বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। অন্তর্বর্তী সরকার শুধু নির্বাচন দেওয়ার জন্য গঠিত হয়নি। আমাদের তিনটি প্রধান দায়িত্ব ছিল– গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন। দায়িত্ব গ্রহণের পর আমাদের প্রথম ছয় মাসই কেটেছে শহিদ পরিবার, আহত মানুষ এবং তাদের পুনর্বাসনের কাজ নিয়ে। হাজার হাজার আহত মানুষের চিকিৎসা ও তালিকা প্রস্তুত হয়েছে। শহিদদের পরিবারগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রাখতে হতো। এ ছাড়া শিক্ষকদের আন্দোলন, স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন- প্রায় প্রতিদিন শাহবাগ মোড়, যমুনা ও সচিবালয় ঘেরাও অথবা বিক্ষোভ কর্মসূচি থাকত। এসবের পেছনে ফ্যাসিবাদী শক্তির অনেক ইন্ধন ছিল। সবই আমাদের সামাল দিতে হয়েছে। এরপর সংস্কার ও নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। ফলে নির্বাচন আয়োজনের যে সময়টা লেগেছে, এটা কোনো কালক্ষেপণ না।
খবরের কাগজ: বড় একটি রাজনৈতিক দলকে (আওয়ামী লীগ) বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন কতটা গণতান্ত্রিক?
ফরিদা আখতার: অবশ্যই আমি এটাকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলব। কারণ আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই—যারা গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ হয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, লাখো মানুষ যারা রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের কাছে আমরা কী জবাব দিতাম, যদি সেই দলকেই আবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিতাম? যে রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, যাদের বিরুদ্ধে ১৫ বছর ধরে ভোটাধিকার হরণ, অর্থ পাচার, অর্থনীতি ধ্বংস এবং জনগণের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার অভিযোগ রয়েছে, সেই দলকে শুধু ‘সব দলকে নির্বাচনে আনতে হবে’–এই যুক্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যায় না। শহিদদের কাছে আমাদের দায় ছিল। গণতন্ত্রের নামে সবকিছু এক কাতারে ফেলা যায় না। এ ছাড়া তাদের দলীয় কর্মকাণ্ড তখন আইনগতভাবেই নিষিদ্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারত না। সুতরাং ‘সব দল’ বলতে তখন যেসব দল আইনগতভাবে বৈধ ছিল, তাদেরই বোঝানো হয়েছে। আমাদের সরকারের দায়বদ্ধতা ছিল শুধু ভোটারদের প্রতি নয়; গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ হওয়া মানুষ এবং আহতদের প্রতিও ছিল। সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।
খবরের কাগজ: গণভোটের প্রচার ও ভোটের ফল নিয়ে এত বিতর্ক কেন হলো?
ফরিদা আখতার: এ বিষয়ে বিতর্কের বড় কারণ ছিল মানুষের মধ্যে কিছু বিভ্রান্তি। চারটি প্রশ্ন থাকায় অনেকে বুঝতে পারেননি, একটি প্রশ্নে দ্বিমত থাকলে কীভাবে ভোট দেবেন। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও সবসময় স্পষ্ট ছিল না। বিশেষ করে বিএনপি একসময় ‘না’ ভোট, পরে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথা বলায় তাদের সমর্থকদের মধ্যেও দ্বিধা তৈরি হয়। তারপরও মানুষ সংস্কারের প্রত্যাশা থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। আমরা উপদেষ্টারা বিভিন্ন জেলায় গিয়ে শুধু ‘হ্যাঁ’ ভোটের অর্থ কী, সেটি ব্যাখ্যা করেছি। কাউকে ‘না’ ভোট না দিতে বলিনি।
খবরের কাগজ: ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বিতর্ক নিয়ে অনেক বিতর্ক চলছে। সেই ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন? আপনি কি ছিলেন?
ফরিদা আখতার: আমি সেই বৈঠকের অংশ ছিলাম না। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ একটি পরিচিত ধারণা। আমাদের সরকারে আনুষ্ঠানিকভাবে এ নামে কোনো কাঠামো ছিল না। প্রতি বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক করতাম এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সেখানেই নেওয়া হতো। এর বাইরে সপ্তাহের আরেকটি দিনে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন আলাদাভাবে বৈঠক করতেন। তবে এটাকে অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মূল সিদ্ধান্তগুলো উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকেই হয়েছে। হয়তো প্রধান উপদেষ্টার প্রয়োজন বা বাস্তবতার কারণেই এ ধরনের বৈঠক হয়েছে। এ নিয়ে অতিরিক্ত বিতর্ক তৈরি করা ঠিক নয়।
খবরের কাগজ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন, এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী ছিল?
ফরিদা আখতার: একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি বলব—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি যেটা হয়েছে, সেটা ক্ষতিকর। এতে জনগণের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এবং ট্রাম্পকে তো আমরা জানি। ট্রাম্প যেমন ইরানে বোমা মারতে পারে অহেতুক, এই চুক্তি এ দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের বোমা মারার মতো সেরকমই এক ঘটনা।
বিশেষ করে মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির বিষয়টি আমাদের দেশীয় খামারিদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পভিত্তিক পশুপালন ব্যবস্থা এবং জিএমও খাদ্য ব্যবহারের বিষয়েও আমার উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে আমার মন্ত্রণালয় থেকে আপত্তি জানিয়েছিলাম। উপদেষ্টা থাকাকালে ক্যাবিনেটেও আমি এই চুক্তির বিরোধিতা করেছি এবং শেষ দিন পর্যন্ত আপত্তি জানিয়েছি, বলেছি অন্তত চুক্তির এই অংশগুলো যেন বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।
বিরোধিতার আরও একটি কারণ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পভিত্তিক পশুপালন ব্যবস্থা আমাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড কর্ন ও সয়াবিন ব্যবহার করে। সেই মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য বাংলাদেশের বাজারে অবাধে ঢুকলে স্থানীয় খামারিরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন। সস্তা মাংস বাজারে এলে আমাদের লাখ লাখ গরু-ছাগল পালনকারী পরিবার ধসে পড়তে পারে। এটি শুধু প্রাণিসম্পদ নয়, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, গার্মেন্টস—সব খাতেই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
খবরের কাগজ: এত বিরোধিতার পরও ভোটের মাত্র তিন দিন আগে সরকার এই চুক্তি করল। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কি জানত?
ফরিদা আখতার: আমাদের জানানো হয়েছিল বিএনপি ও জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। এ বিষয়টি আমি আগেও বলেছি। তবে এত বড় একটি চুক্তি সংসদের বাইরে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। আসলে সে সময় পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, সরকার মনে করেছিল, চুক্তি না করে উপায় নেই। আমি এখনো মনে করি, এই চুক্তির জনস্বার্থবিরোধী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত ছিল। জনগণেরও মতামত নেওয়া উচিত ছিল। সম্প্রতি এমপি রুমিন ফারহানা সেই প্রস্তাব সংসদে দিয়েও ছিলেন। সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আমার মতে, এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। এই চুক্তি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া উচিত। সরকারের পাশাপাশি আমাদের যার যতটুকু সাধ্য আছে, এই চুক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে কথা বলা দরকার।
খবরের কাগজ: বর্তমান সরকারের যিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তিনি তো আগের সরকারের আমলে নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। এই সরকারে তার অবস্থানকে আপনি কতটা যৌক্তিক মনে করেন?
ফরিদা আখতার: ব্যক্তিগতভাবে আমি এ সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি বা প্রয়োজনীয়তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাইনি। তাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ একটি নির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রে সাধারণত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকেই মন্ত্রী নির্বাচন করা হয়। সেই জায়গা থেকে দেখলে একজন সাবেক উপদেষ্টাকে সরকার গঠনের প্রথম দিনেই মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। যদি পরে টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকে দায়িত্ব দেওয়া হতো, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যেত। কিন্তু শুরু থেকেই তাকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় এক ধরনের নতুন সংযোজন; যে ঘটনার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এখনো অস্পষ্ট।
খবরের কাগজ: মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আপনি সুপরিচিত। কিন্তু আপনার সরকারের সময় বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িসহ সারা দেশে অসংখ্য মুক্তিযুদ্ধের নামফলক, স্মৃতিসৌধ ও স্মারক ধ্বংস করা হয়েছে। জাতীয় চার নেতা ও সাত বীরশ্রেষ্ঠসহ মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করা হয়েছে। এসব ঘটনায় এখন আপনার অনুভূতি কী?
ফরিদা আখতার: প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই—মুক্তিযুদ্ধ কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি বাংলাদেশের জনগণের যুদ্ধ। আমরা সবসময় মুক্তিযুদ্ধকে সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে একটি দলীয় ও পারিবারিক বয়ানে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে, যা মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আমি মনে করি, এই অতিরিক্ত দলীয়করণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, কোনো স্মৃতিসৌধ, নামফলক বা ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানকে আমি সমর্থন করি না। এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক এবং উদ্বেগের। জনগণের আবেগ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সেগুলোকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা হিসেবে দেখার আগে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকার কখনোই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করেনি কিংবা ২০২৪ সালের ঘটনাকে তার বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টাও করেনি। বরং আমরা বিশ্বাস করি, ২০২৪-এর আন্দোলনও মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিকতা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, জাতীয় চার নেতা কিংবা বীরশ্রেষ্ঠদের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ—এসব নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তবে ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
খবরের কাগজ: আপনার পরিবার সুফিবাদের অনুসারী। অথচ আপনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে দেশের বিভিন্ন মাজার এবং সুফি-সাধকদের ওপর নৃশংস হামলা, নির্যাতন, এমনকি কাউকে কাউকে নির্যাতনের পর পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। নৃশংস এসব ঘটনায় আপনার কোনো দুঃখবোধ আছে কী?
ফরিদা আখতার: অবশ্যই আছে। মাজার, সুফি-সাধক কিংবা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর যেকোনো হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। আমার পরিবারের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পটভূমি যেমনই হোক না কেন, এ বিষয়টি ব্যক্তিগত নয়; এটি জাতীয় ও মানবিক প্রশ্ন। সরকার কখনোই মাজার ভাঙচুর বা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাকে সমর্থন করেনি। এ ধরনের ঘটনা নিয়ে একাধিকবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, নিন্দা জানানো হয়েছে এবং যেখানে সম্ভব সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এটাও সত্য যে, সব ঘটনা প্রতিরোধ করা সবসময় সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী ও উগ্র গোষ্ঠী পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে, যার ফলেও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।
খবরের কাগজ: সে সময় শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের ওপর আঘাত এসেছে। এসব ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই?
ফরিদা আখতার: এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং দুঃখজনক। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত করেছে। তবে আমি মনে করি না যে সরকার এসব ঘটনার প্রতি উদাসীন ছিল বা এগুলোকে প্রশ্রয় দিয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে আমরা নিন্দা জানিয়েছি, ক্যাবিনেটে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি এবং যেখানে সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব ঘটনা প্রতিরোধ করা সব সময় সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন উগ্র ও স্বার্থান্বেষী শক্তি পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে। তারপরও আমি মনে করি, এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। আশা করি ভবিষ্যতে সে বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
খবরের কাগজ: তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের বিগত তিন মাসের শাসনামল নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ফরিদা আখতার: বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় অনভিজ্ঞ নয়। তবে বর্তমান বিএনপি আগের বিএনপির মতো নয় এবং বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি দলটির জন্য বড় ঘাটতি। পররাষ্ট্র ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দলের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তারেক রহমান কিছু জনবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছেন, যা প্রশংসনীয়। তবে কেবল জনতুষ্টিমূলক পদক্ষেপ নয়, রাষ্ট্রক্ষমতা ও জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের প্রশ্নে আরও দৃঢ় ও কৌশলী নেতৃত্ব প্রয়োজন।
খবরের কাগজ: সারা দেশে নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বেড়েই চলেছে। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকারের প্রতি পরামর্শ কী?
ফরিদা আখতার: নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা দেশের গভীর সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতন একটি সামাজিক বিকৃতি, যা মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। কিছু নৃশংস ঘটনায় সরকারের দ্রুত বিচার উদ্যোগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই যথেষ্ট নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে ধর্ষণ ও শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর করতে হবে। এসব অনাচার প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ও অপরাধের জন্য ভয় সৃষ্টি করতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ করা, সামাজিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা এবং পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষা বাড়ানো জরুরি।
খবরের কাগজ: কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থানীয় উৎপাদন নীতি নিয়ে আপনার মতামত কী?
ফরিদা আখতার: বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি হওয়া উচিত স্থানীয় উৎপাদন, কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং খাদ্যে স্বনির্ভরতা। বিদেশি নির্ভরতা বাড়িয়ে দেশীয় কৃষি ও উৎপাদন ব্যবস্থা দুর্বল করা উচিত নয়; কৃষকবান্ধব ও টেকসই নীতিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।
খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, তাদের ১৮ মাসের শাসনামল নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ফরিদা আখতার: আমাদের অবশ্যই কিছু অপ্রাপ্তি আছে। সবকিছু শেষ করতে পারিনি। কারণ অত্যন্ত জটিল ও সংকটপূর্ণ সময়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সরকার কাজ করেছে। সব প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব না হলেও উপদেষ্টারা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, কোনো উপদেষ্টা চেষ্টার ত্রুটি করেননি।
খবরের কাগজ: সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আপনারা কতটা পূরণ করতে পেরেছেন?
ফরিদা আখতার: সেটা পরিমাপ করা অত্যন্ত কঠিন। সীমিত সময় ও বাস্তবতার মধ্যে যতটুকু সম্ভব সংস্কারমূলক কাজ করা হয়েছে। ফলে সব প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে অনেক ইতিবাচক সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের উচিত, অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিবাচক সংস্কারগুলো বাতিল না করে সংরক্ষণ করা। প্রয়োজনে আরও উন্নত করে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া।
খবরের কাগজ: খবরের কাগজের পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?
ফরিদা আখতার: খবরের কাগজের পাঠক ও দর্শকদের ধন্যবাদ জানাই। আমি চাই, আপনারা ইতিবাচক কাজের মূল্যায়ন করবেন এবং একই সঙ্গে গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। গণতন্ত্রের জন্য এটিই সবচেয়ে প্রয়োজন।