চলতি বছর তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশে প্রচার হওয়া ৯৫৯টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে দেশের তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। তৃতীয় প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অপতথ্য, যা শনাক্ত হওয়া মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৬৪ শতাংশ।
সব মিলিয়ে গেল ৯ মাসে বাংলাদেশে প্রচার হয়েছে এমন ২ হাজার ৭৫৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। গত বছর একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। এই প্রান্তিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য প্রচারের পরিমাণ যেমন বেড়েছে তেমনি বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে রীতিমতো ভুয়া তথ্যের নিরন্তর প্রবাহও লক্ষ্য করা গেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে রিউমর স্ক্যানার প্রকাশিত ফ্যাক্টচেকসহ অন্যান্য প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজনৈতিক ইস্যুতে অপতথ্যের ভয়াবহতা
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির ময়দানে এখন বিভিন্ন ইস্যুতেই বেশ সরগরম। এর রেশ যে অপতথ্যের প্রবাহেও পড়ছে তা জানান দিচ্ছে পরিসংখ্যানই। এ বছর তৃতীয় প্রান্তিকে এসে রাজনৈতিক অপতথ্যের যেন বিস্ফোরণ দেখা যাচ্ছে। প্রথম দুই প্রান্তিকে যেখানে রাজনৈতিক ইস্যুতে ৭১০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, সেখানে তৃতীয় প্রান্তিকেই শনাক্ত হয়েছে ৬১৫টি অপতথ্য। দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকে এই ক্ষেত্রটিতে অপতথ্য বেড়েছে প্রায় ৬৯ শতাংশ।
রাজনীতির ময়দানে গেল তিন মাসে নানা ঘটনা প্রবাহ দেখা গেছে। গত ৯ জুলাই রাজধানীর মিটফোর্ডে ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যা, ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রা, ১৯ জুলাই ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশ, ২০ জুলাই আওয়ামী লীগের চারটি সংগঠনের ডাকা হরতাল, ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী, সিলেটে পাথর লুটের ঘটনা, ২৯ আগস্ট ঢাকায় জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে সংঘর্ষ, ৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন এবং ১১ সেপ্টেম্বরের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অপতথ্যের প্রবাহ ছিল লক্ষ্যণীয়। এসব ঘটনায় একক ইস্যু হিসেবে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সর্বাধিক ৫২টি গুজব শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এ ছাড়া, গোপালগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে ৩৮টি, শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে ২১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
অপতথ্যের এই ভয়াবহতার আঁচ লেগেছে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকে আলোচনায় থাকা দলগুলোর সবকটিকে জড়িয়েই অপতথ্যের প্রচার বেড়েছে। বৃদ্ধির এই হার সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ক্ষেত্রে। প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকে বিএনপিকে জড়িয়ে অপতথ্যের প্রচার বেড়েছে প্রায় ১৮০ শতাংশ। এনসিপির ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি, প্রায় ২০৪ শতাংশ।
তৃতীয় প্রান্তিকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যগুলোয় সবচেয়ে বেশি নাম এসেছে বর্তমানে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকা দল আওয়ামী লীগের। দল, এর বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং নেতা-কর্মীদের জড়িয়ে গত তিন মাসে ২৮৩টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে শুধু দল হিসেবেই আওয়ামী লীগের নাম জড়িয়েছে ১১০ অপতথ্যে। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এসব অপতথ্যের প্রায় ৯৪ শতাংশই দলটির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এই সময়ের মধ্যে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে সর্বাধিক অপতথ্য (৬৩) প্রচার করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বিএনপিকে জড়িয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (১৫১) অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে শনাক্ত হওয়া ৬৬টি অপতথ্যের মধ্যে প্রায় ৯৪ শতাংশই দলটির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এই সময়ের মধ্যে দলটির বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে জড়িয়ে ১০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জড়িয়ে ৯টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
গেল তিন মাসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এই দলটির অঙ্গ সংগঠন এবং নেতা-কর্মীদের জড়িয়ে ১২৬টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে প্রচার হয়েছে এমন অপতথ্য ছিল ৪৮টি। এসবের প্রায় ৯৩ শতাংশই দলটির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এই সময়ের মধ্যে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান দুটি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন, যার সবগুলোতেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এ ছাড়া, এনসিপিকে জড়িয়ে তৃতীয় প্রান্তিকে ৭৩টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে এনসিপিকে জড়িয়ে প্রচার হয়েছে এমন অপতথ্য ছিল ৩৩টি, যার সবগুলোতেই দলটিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়ে চারটি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এসবের সবগুলোতেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ভুল তথ্য কমেছে
চলতি বছর রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে অপতথ্যের প্রবাহ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে দেখা গেলেও জাতীয় বিষয়ে এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রথম প্রান্তিক থেকে তৃতীয় প্রান্তিকে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় বিষয়ে ভুল তথ্যের প্রবাহ কমে এসেছে। এই হ্রাসের হার প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ।
জাতীয় ক্ষেত্রে এই তিন মাসে ভুয়া তথ্যের প্রবাহে প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে অন্তত দুটি বড় ঘটনা। ২১ জুলাই ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বাহিনীর বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ৩৯টি এবং খাগড়াছড়িতে সহিংসতার ঘটনায় ২০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও তৃতীয় প্রান্তিকে ভুল তথ্যের হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকে এই হ্রাসের হার প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ। এর কারণ বৈশ্বিক ইস্যুভিত্তিক ঘটনাবলী কমে আসা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইসরায়েল কর্তৃক গাজায় গণহত্যা, পাকিস্তান-ভারত সংঘাত, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতসহ একাধিক আন্তর্জাতিক ইস্যুর কারণে ভুল তথ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও তৃতীয় প্রান্তিকে এমন উল্লেখযোগ্য কোনো বৈশ্বিক ইস্যু দেখা যায়নি। ফলে ভুল তথ্যের পরিমাণেও এর প্রভাব পড়েছে।
অপরদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে তৃতীয় প্রান্তিকে ধর্মীয় ইস্যুতে অপতথ্যের প্রবাহ যেমন বেড়েছে তেমনি এশিয়া কাপ ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে খেলাধুলা বিষয়েও ভুল তথ্যের প্রবাহ দেখা গেছে। এ ছাড়া, বিনোদন অঙ্গনের বিভিন্ন তারকাকে জড়িয়ে দ্বিতীয় প্রান্তিকে অপতথ্যের প্রবাহ বৃদ্ধি পেতে দেখা গেলেও শেষ তিন মাসে তা হ্রাস পেতে দেখা গেছে।
ভুল তথ্যের নিয়মিত শিকার অন্তর্বর্তী সরকার
গণ-আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত বছরের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব পরবর্তী সময় থেকেই নিয়মিত ভুয়া তথ্যের শিকার হচ্ছেন সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তৃতীয় প্রান্তিকে সরকার ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তিকে জড়িয়ে ৭৭টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। অবশ্য প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকে সংখ্যাটি ছিল আরও বেশি, যথাক্রমে ১২৮ ও ১২১টি।
তৃতীয় প্রান্তিকে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে জড়িয়ে প্রচার হওয়া ভুল তথ্যের পরিমাণও কমেছে। তাকে জড়িয়ে জানুয়ারি থেকে মার্চে ৫০টি, পরের তিন মাসে ৬২টি ভুল তথ্য প্রচার হলেও তৃতীয় প্রান্তিকে এই সংখ্যা ৩৭টি।
এ ছাড়া এই সরকারের ৯ জন উপদেষ্টাকে জড়িয়ে গেল তিন মাসে সর্বমোট ২৫টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এদের মধ্যে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে জড়িয়ে ৯টি, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে জড়িয়ে ৫টি, ড. আসিফ নজরুলকে জড়িয়ে ৪টি, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে জড়িয়ে দুটি এবং মাহফুজ আলম, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সি আর আবরার, ফারুক-ই-আজম ও বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারকে জড়িয়ে প্রচার হওয়া একটি করে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
সেনাবাহিনী-পুলিশ ভুয়া তথ্যের লক্ষ্যবস্তু
দেশে সশস্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জড়িয়ে এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ১৭৯টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার। দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় এই হার বেড়েছে প্রায় চার শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে সর্বোচ্চ ৭২টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। বাহিনীটির বর্তমান প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে নিয়ে গত তিন মাসে ১৯টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
এ ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে নিয়ে ৫৯টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে এই তিন মাসে। দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় যা বেড়েছে প্রায় ২২৮ শতাংশ। এ ছাড়া, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমকে নিয়ে একটি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
এর বাইরে, তিন মাসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে নিয়ে ১৩টি, বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে নিয়ে দুটি, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব) নিয়ে চারটি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) নিয়ে ছয়টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার৷
নির্বাচন সংক্রান্ত অপতথ্যে এআই-ফটোকার্ড
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাব্য একটি সময়ের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই জানানো হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অপতথ্যের প্রবাহও লক্ষ্যণীয়। গেল তিন মাসে নির্বাচন সংক্রান্ত ২৫টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। যদিও দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় এই হার কমেছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে শনাক্ত হওয়া নির্বাচন সংক্রান্ত অপতথ্যগুলোর মধ্যে আটটিতে ভুয়া ও সম্পাদিত ফটোকার্ডের মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে অপতথ্যের প্রচারে শক্তিশালী ও বহুল প্রচলিত মাধ্যম হয়ে উঠেছে গণমাধ্যমের ফটোকার্ড। এর সঙ্গে গণমাধ্যমের নাম, লোগো এবং আনুষঙ্গিক উপাদান ব্যবহার করে নিয়মিতই অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে গণমাধ্যমের নাম, লোগো, শিরোনাম এবং নকল ও ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ৭২টি ঘটনায় দেশি ও বিদেশি ২৮টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ৭৩টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
নির্বাচন সংক্রান্ত অপতথ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারও দেখা যাচ্ছে নিয়মিত। তৃতীয় প্রান্তিকে এমন চারটি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। শুধু নির্বাচন ইস্যুতেই নয়, এআইয়ের অপব্যবহার হচ্ছে সব ক্ষেত্রেই। তৃতীয় প্রান্তিকে সব মিলিয়ে ১২৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যাতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। একই সময়ে ১৮টি ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত করা হয়েছে।
সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ও ভারতীয় গণমাধ্যমের অপপ্রচারে লাগাম
সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের বিষয়টি গেল কিছু মাস ধরেই আলোচনায় রয়েছে। এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৩৬টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। দ্বিতীয় প্রান্তিকে শনাক্ত হয় ২৮টি। গেল তিন মাসে শনাক্ত হওয়া সাম্প্রদায়িক অপতথ্যগুলো মধ্যে ২০টি ঘটনাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া, তৃতীয় প্রান্তিকে বাংলাদেশ সম্পর্কিত পাঁচটি ঘটনায় ভারতের ৩১টি সংবাদমাধ্যমে পাঁচটি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি (৩) অপতথ্য প্রচারে এই তালিকায় সবার ওপরে আছে ইন্ডিয়া টিভি।
মেটা প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্যের বন্যা
দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকে ফেসবুকে ভুল তথ্য প্রচারের হার কিছুটা হ্রাস পেলেও একই সময়ে ইনস্টাগ্রামে প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে ভুল তথ্যের প্রচার। একই সময়ে আরেক প্ল্যাটফর্ম টিকটকেও ভুল তথ্য শনাক্তের হার বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এক্সের ক্ষেত্রেও দেখা গেলে ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে ভুল তথ্য প্রচারের হার অনেকটাই স্থিতিশীল দেখা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ছাড়াও দেশের গণমাধ্যমও ভুল তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। গত তিন মাসে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে ভুল তথ্য, ছবি এবং ভিডিও সম্বলিত ফ্যাক্টচেক করা হয়েছে ৫১টি, যা আগের দুই প্রান্তিকের তুলনায় বেশি। এ ছাড়া, একই সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে অন্তত পাঁচটি ঘটনায় বাংলাদেশকে জড়িয়ে অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে রিউমর স্ক্যানারে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এই সময়ে পুরোপুরি মিথ্যা বা ভুয়া ঘটনা সম্বলিত ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ৬৭৩টি। এ ছাড়া, বিভ্রান্তিকর রেটিং দেওয়া হয়েছে ১৮৯টি। বিকৃত রেটিং পেয়েছে ৯৬টি। এ ছাড়া, সার্কাজম বা কৌতুক হিসেবে হাস্যরসাত্মক ঘটনাকে বাস্তব দাবির প্রেক্ষিতে ফ্যাক্টচেক করা হয়েছে একটি। এসব ভুল তথ্য শনাক্তের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করা হয়েছে ২২৫টি, ছবি যাচাই করা হয়েছে ১৩০টি এবং ভিডিও যাচাই করা হয়েছে ৬০৪টি।
এসজি/