চলছে অমর একুশের গ্রন্থমেলা। নানা বয়সের মানুষ নিজের বা প্রিয়জনকে বই উপহার দেওয়ার জন্য পছন্দমতো বই কিনতে বইমেলায় ভিড় জমান। বই যে কত উত্তম সঙ্গী বা বন্ধু হতে পারে, জগতে তার প্রমাণ রয়েছে। মার্কাস টুলিয়াস সিসেরোর মতে, ‘বই ছাড়া ঘর একটি আত্মা ছাড়া শরীরের মতো।’ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছেন, ‘বইয়ের মতো এত বিশ্বস্ত বন্ধু আর নেই।’ একবার যদি আপনার বই পড়া অভ্যাসে পরিণত হয়, তাহলে আপনার সৃজনশীল মানসিকতার বিকাশ ঘটবে খুব সহজেই। এমনকি চিন্তাশক্তি হয়ে উঠবে সবল। আজকাল শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে স্ট্যাটাস দেওয়ার জন্যও অনেকে বইমেলায় ঘুরতে যান। একুশে বইমেলা আমাদের দেশে একটা উৎসবের আমেজ সৃষ্টি করে।
জানা যায় অনেক কিছু
বই পড়লে অনেক কিছু জানা যায়। একটা ভিডিও বা ব্লগ পড়েও অনেক কিছু জানতে পারলেও পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। সাহিত্য, সংস্কৃতি অনেক কিছু বই থেকে জানা যায়। ইলন মাস্ককে একটি ইন্টারভিউয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি কীভাবে রকেট বানানো শিখলেন? মাস্ক উত্তরে বলেছিলেন, ‘বই পড়ে।’ তাই কোনো কিছু শিখতে বা জানতে হলে পড়তে পারেন সে বিষয়ের একটি ভালো বই।
মস্তিষ্ক সচল থাকে
বই পড়লে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। যেকোনো বই পড়ার সময় পাঠককে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতে বিষয়ভিত্তিক তথ্যসূত্র মনে রাখতে হয়। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন বই পড়লে মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে দ্রুত সিগন্যাল চলাচল করতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। প্রতিটি নতুন স্মৃতি একটি নতুন সাইন্যাপস তৈরি করে বিদ্যমান স্মৃতিকে আরও শক্তিশালী করে এবং স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিকে আরও উন্নত করে। এতে বৃদ্ধ বয়সে আলঝেইমারের মতো ভুলে যাওয়া রোগ থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়।
কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা বাড়ায়
বই মানুষকে এক কল্পনার রাজ্যে নিয়ে যেতে পারে। তাকে দেখায় কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। বই যেন এক বিশাল মাকড়সার জাল, যা সবকিছুকেই এক সূত্রে গেঁথে দেয়, পাঠকের জানা বিষয়ের সঙ্গে নতুন আবিষ্কৃত বিষয়কে জোড়া লাগিয়ে নতুন এক উত্তর কিংবা সমাধান বের করতে পারে।
মনোযোগ বাড়ায়
সোশ্যাল মিডিয়ার ছোট ছোট স্ট্যাটাস আর রিলসের যুগে দিন দিন কমছে আমাদের মনোযোগ। সেই সঙ্গে কমছে আমাদের কাজে মনোনিবেশ করার ক্ষমতা। এই খারাপ অভ্যাস থেকে আমাদের মুক্ত করতে পারে বই। প্রতিনিয়ত ঘণ্টাখানেক বই পড়ার চেষ্টা করলে মনোযোগ বাড়বে।
নতুন চিন্তা বা আবিষ্কার ক্ষমতা বৃদ্ধি
বই পড়ার মাধ্যমে একজন মানুষ নতুন বিষয় বা তথ্য উদঘাটনে সহায়তা পান। কোনো সমস্যা সমাধান করা অথবা কোনো কিছু অর্জন করার নতুন কোনো মাধ্যম আবিষ্কার করতে বই ব্যাপক ভূমিকা রাখে। বই পড়ার সুবাদে তার পছন্দের তালিকায় নতুন কোনো শখ কিংবা নতুন কোনো পেশায় যুক্ত হয়েছে, যেটি শেষে সে তার পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে এবং সফলতা অর্জন করেছে। অন্বেষণের শুরু কিন্তু পড়া এবং উপলব্ধির মাধ্যমেই।
মানবিক, সহানুভূতিশীল করে
বই পড়লে মানসিক চাপ হ্রাস পায়। অনেকে তাদের মানসিক চাপ কমাতে ব্যায়ামের আশ্রয় নেয়, কেউ কেউ আবার যোগব্যায়াম করে থাকেন। কিন্তু মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে ভালো বই পাঠ করলে মানসিক চাপমুক্ত জীবনযাপন করতে পারেন। নিজেদের চারপাশের বাইরেও যে কত ধরনের জীবন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আছে, বই পড়লে আমরা অনুভব করতে পারি। এতে বই অন্য মানুষের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হওয়ার ক্ষমতা বাড়ায়। অন্যের দুঃখ বুঝতে সাহায্য করে, মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে।
বই সবচেয়ে বড় বন্ধু
বইয়ের চেয়ে বড় বন্ধু আর কেউ নেই। এ কথা ষোলোআনা সত্যি। খুব ছোটবেলাতেই বইকে ভালোবাসতে শিখলে জীবনে কোনোদিন একাকিত্ব গ্রাস করতে পারবে না। ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষার মাস। বইয়ের পঠন পাঠনের মাধ্যমে জাতিকে একটি বিশুদ্ধ জ্ঞাননির্ভর কুসংস্কার মুক্ত বিজ্ঞানমনস্ক জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করতে পারলে তবেই হবে বইমেলার সার্থকতা।
বইমেলার ইতিহাস
আমাদের জাতীয় জীবনে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা জাতির রুচির উৎকর্ষ সাধন ও মনন গঠনে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিশিষ্ট প্রকাশক চিত্ত রঞ্জন সাহা তৎকালীন বর্ধমান হাউজের প্রাঙ্গণে মাত্র ৩২টি বই নিয়ে মেলার সূচনা করেন এবং ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত এভাবে ছোট বইমেলা চলতে থাকে। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী এই বইমেলাকে বাংলা একাডেমির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। কালক্রমে যা আজকের বাংলা একাডেমির অমর একুশে বই মেলায় রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে এই বইমেলা বাঙালির প্রাণের স্পন্দন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভাগীয় শহর থেকে জেলা শহরে।
ঘুরে আসুন বইমেলা থেকে
বইমেলা বই কেনার উপযুক্ত জায়গা। এখানে সব ধরনের বইয়ের সন্ধান পাবেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বইমেলায় ঘুরতে আসা একটা প্রাণোচ্ছল ব্যাপার। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো একটা আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা হতে পারে। ছুটির দিনগুলো পরিবারের সবাই বইমেলায় গেলে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হবে। যা পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। বইমেলায় খাবারের স্টল থেকে প্রিয়জন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে খাবার উপভোগ করতে পারেন। বইমেলায় ঘোরার ফলে বইয়ের প্রতি সবার ভালোবাসাও বৃদ্ধি পায়। অনেকে মেলায় এসে বইয়ের তালিকা নিয়ে যায়। যাতে সারা বছর সে এই বইগুলো আস্তে আস্তে কিনে পড়তে পারেন।
কলি