মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিক সাহিত্যকর্ম সাধন হয়েছে। উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা, কবিতা, সংগীত, নাটক, চিত্র, ভাস্কর্য প্রভৃতি। এর মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ রূপটি ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। বাংলা সাহিত্যে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস রচনা করে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তন্মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি উপন্যাসটি রচনা করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। এই উপন্যাসে যা বর্ণিত হয়েছে বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটেছিল, তা তার সামনেই ঘটেছিল। নিজের অক্ষমতা, হতাশা, আক্ষেপ, হৃদয়ের ক্ষতবিক্ষত রূপ এ উপন্যাসে উঠে এসেছে। একেবারে বাস্তবতার সবটুকু রক্ষা করে কিন্তু অসামান্য শৈল্পিক আঙ্গিকে। ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ ছাড়াও বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ আরও অসংখ্য উপন্যাস রচিত হয়েছে। তন্মধ্যে শওকত ওসমানের ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ (১৯৭১), ‘নেকড়ে অরণ্য’ (১৯৭৩), ‘দুই সৈনিক’ (১৯৭৩), ‘জলাঙ্গী’ (১৯৭৪)। আকবর হোসেনের ‘দুষ্টক্ষত’ (দ্বিতীয় সং ১৯৯৩), শওকত আলীর ‘যাত্রা’ (১৯৭৬), সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ (১৯৮১), ‘নীল দংশন’ (১৯৮১), ‘মৃগয়ায় কালক্ষেপ’ (১৯৮৬), ও ‘অন্তর্গত’ (১৯৮৪) কাব্যোপন্যাস। রাবেয়া খাতুনের ফেরারি সূর্য (১৯৭৪), হানিফের ঘোরা (১৯৮৫), হিরণদাহ (১৯৮৫), একাত্তরের নিশান (১৯৯২), বাগানের নাম মালিনিছড়া (১৯৯৫) ঘাতক রাত্রি (১৯৯৬), মেঘের পরে মেঘ (২০০১) এবং যা কিছু অপ্রত্যাশিত (২০০২) উপন্যাস। রশিদ করিমের ‘আমার যত গ্লানি’ (১৯৭৩), ‘খাঁচা’ (১৯৭৫) ‘অন্ধ কথামালা’ (১৯৮২)। সেলিনা হোসেন মুক্তিযুদ্ধকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে উপন্যাসে উপজীব্য করেছেন। তার ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ (১৯৭৬), ‘যুদ্ধ’ (১৯৯৮), ‘কাঠকয়লার ছবি’ (২০০১), ‘মাটি ও শস্যের বুনন’ (২০০১), ‘ঘুমকাতরে ঈশ্বর’ (২০০৪), ‘দিনের রশিতে গিটটু’ (২০০৭), ‘বীরঙ্গনা’ (২০১৪)। হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ (১৯৭৪), ‘নির্বাসন’ (১৯৭৪), ‘সৌরভ’ (১৯৭৮) ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৮৬), ‘সূর্যের দিন’ (১৯৮৬), ‘অনিল বাগচীর একদিন’ (১৯৯২), ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ (২০০৪), ‘দেয়াল’ (২০১২)। আহমদ ছফার ‘আলী কেনানের উত্থান পতন’ (১৯৮৮) ও ‘মরণ বিলাস’ (১৯৮৯)। মাহমুদুল হক (১৯৪১-২০০৮) এর ‘জীবন আমার বোন’ (১৯৭৬) ও ‘খেলাঘর’ (১৯৭৮)। সুব্রত বড়ুয়ার ‘ধলপহর’ (২০১২) উপন্যাস। মইনুল আহসান সাবের এর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘পাথর সময়’ (১৯৮৯), ‘পরাজয়’ (১৯৯০), ‘কেউ জানে না’ (১৯৯০), ‘সতেরো বছর পর’ (১৯৯১)। ইমদাদুল হক মিলনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘কালো ঘোড়া’ (১৯৮৩), ‘ঘেরাও’ (১৯৮৫), ‘মহাযুদ্ধ’ (১৯৮৯), ‘বালকের অভিমান’ (১৯৯০), ‘নিরাপত্তা হই’ (১৯৯৩), ‘রাজাকার তন্ত্র’ (১৯৯৩), ‘একজনা’ (১৯৯৩), ‘সুতোয় বাঁধা প্রজাপতি’ (১৯৯৩) এবং ‘একাত্তর ও একজন মা’ (২০১৯)। শামসুর রাহমানের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ (১৯৮৫) উপন্যাস। আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘দেয়াল’ (১৯৮৬), আমজাদ হোসেনের ‘যুদ্ধ যাত্রার রাত্রি’ (১৯৭৫), ‘অবেলায় অসময়’ (১৯৭৮), ‘অস্থির পাখিরা’ (১৯৮৩) এবং ‘যুদ্ধে যাবো’ (১৯৯১) উপন্যাস। কবি আল মাহমুদ রচনা করেছেন ‘উপমহাদেশ’ (১৯৯৩)। আতা সরকারের ‘চিতা কাহিনী’ (২০২০), আনিসুল হকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস হলো ‘চিয়ারি বা বুদু’ ওঁরা কেন দেশ ত্যাগ করেছিল’ (২০০০), ‘বীর প্রতীকের খোঁজে’ (২০০১), ‘মা’ (২০০৩), ‘স্বপ্ন’ (২০০৮), ‘মায়া’ (২০০৯), ‘জননী-সাহসিনী’ (২০১০) ইত্যাদি।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাহিত্যের সব শাখাতেই উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম রচিত হলেও উপন্যাসই সবচেয়ে সমৃদ্ধতর বিবেচিত হতে পারে। যদি মনে করা হয় মুক্তিযুদ্ধের যে বৃহৎ প্রেক্ষিত তা পুরো ধারণ করে মহাকাব্যিক ধারার যে উপন্যাস রচিত হতে পারতো তা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যত উপন্যাস রচিত হয়েছে তন্মধ্যে আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ অনন্য মর্যাদার অধিষ্ঠিত এবং এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত প্রথম উপন্যাসের মর্যাদার তিলকটিও এই উপন্যাসের ললাটে জ্বলজ্বল করছে। উপন্যাসটিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভয়াবহ কালরাত থেকে শুরু হয়ে ২৮ মার্চ সন্ধ্যা পর্যন্ত কাহিনি বিস্তৃত। এই উপন্যাসে মাত্র তিন দিন ও তিন রাতের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের দোসরদের নিয়ে ঢাকার নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর অতর্কিত তাণ্ডবলীলা চালিয়েছিল, সেই তাণ্ডবলীলার শিকার অসংখ্য পরিবারে মধ্যে মাত্র দুটি পরিবারের বেঁচে থাকার করুণ গল্প রয়েছে।
উপন্যাসের মূল চরিত্র সুদীপ্ত শাহীন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। স্ত্রী আমিনা এবং তিন বাচ্চা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স কোয়ার্টারের ২৩ নম্বর বিল্ডিংয়ে বসবাস করতেন। ২৫ মার্চ কালরাতে হানাদার বাহিনী ২৩ নম্বর বিল্ডিংয়ে আক্রমণ করে। এতে সবাই নিহত হলেও সুদীপ্ত শাহীন ও তার পরিবার ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। চারপাশে লাশের স্তূপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত বহু অধ্যাপক সপরিবারে নিহত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মৃত্যুর শিকার হয়েছে। নৃশংস মৃত্যুর শিকার হয়েছে শহরের সাধারণ মানুষও। সুদীপ্ত শাহীন শিক্ষক হিসেবে নিজের সন্তানতুল্য ছাত্রদের রক্ষা করতে না পারার যে যন্ত্রণা, সহকর্মীদের মধ্যে নিজের বেঁচে থাকাটা তার কাছে অপরাধে পরিণত হয়- ক্ষতবিক্ষত হতে থাকেন নিজের ভেতরে। সেই যন্ত্রণা, সেই ক্ষতবিক্ষত মানসিক যে অবস্থা তাই সুদীপ্ত শাহীনের ভেতর দিয়ে আনোয়ার পাশা তুলে ধরেছেন। এখানে আনোয়ার পাশা মূলত নিজেই সুদীপ্ত শাহীনের ভেতর দিয়ে নিজের হতাশা, আক্ষেপ, ক্ষোভ, ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
উপন্যাসের সময়কাল খুবই কম। মাত্র তিন মাসের গল্প হলেও এ যেন যুগকেও অতিক্রম করেছে। স্বল্পচিত্রেই অত্যন্ত সার্থকভাবে ওঠে এসেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভয়াবহ নৃশংসতার চিত্র।