প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ১৯১৯ সালে
১৯২০ সালের মার্চে সেনাবাহিনীর ৪৯ নম্বর পল্টন ভেঙে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের সৈনিক জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। করাচিতে বসেই নজরুল মনস্থির করলেন, স্থায়ীভাবে তিনি কলকাতায় থাকবেন। অতঃপর করাচি থেকে কলকাতায় চলে এলেন। কলকাতায় কোথায় থাকবেন, আয়-রোজগারের সংস্থান কী; কিছুই তার মাথায় নেই। কলকাতায় আসা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্পও ছিল না তার। কলকাতায় থাকবেন, লেখালেখি করবেন এটাই ছিল তার মাথায়। পরে যা হওয়ার হবে।
কলকাতায় এসে প্রথমেই নজরুল নজরুল তার বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে খুঁজে বের করেন। শৈলজানন্দ নজরুলের বাল্যবন্ধু। তাদের উভয়ের জন্ম বর্ধমানে। তাদের শৈশব, বেড়ে ওঠা একইসঙ্গে। একসঙ্গে তাদের খেলাধুলা, সাহিত্যচর্চা। একই সঙ্গে তারা বিশ্বযুদ্ধেও যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মেডিকেল পরীক্ষায় শৈলজানন্দ বাদ পড়ে যাওয়ায় তার যাওয়া হয়নি। যা হোক, কলকাতায় শৈলজানন্দকে খুঁজে পেলেন। তাকে জানালেন তার ইচ্ছার কথা। পরে তিনি তার সঙ্গেই রায়কান্ত বোস স্ট্রিটের মেসে ওঠেন। দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হচ্ছে, মেসের চাকর যখন জানতে পারলেন, নজরুল মুসলমান, তখন তার এঁটো বাসন ধুতে আপত্তি জানান। এ কথা জানতে পেরে নজরুল আর সেখানে থাকলেন না। তিন-চার দিন পরেই তিনি ৩২ কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে বন্ধু মজফফ্র আহমদের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন।
তখন সমিতির সভাপতি ছিলেন পুথি সংগ্রাহক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। সমিতির পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে মোজাম্মেল হক ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। নজরুল আসার আগ পর্যন্ত শহীদুল্লাহ এখানেই ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর ফিয়ার্স লেনে চলে যান।
নজরুল সাহিত্য সমিতির অফিসে আসার পর থেকে লেখক-সাহিত্যিকদের আড্ডা জমজমাট হয়ে ওঠে। জুলাই মাসে নজরুল ইসলাম ও তার বন্ধু মুজফফ্র আহমদের যৌথ সম্পাদনায় প্রথম সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ প্রকাশিত হয়। মাত্র ২১ বছর তখন নজরুলের বয়স। আগে কখনো সাংবাদিকতা করেননি। নবযুগেই তার হাতেখড়ি। নবযুগ পত্রিকা শুরুর পর তারা উভয়েই মার্কুইস লেনের একটি বাড়িতে ওঠেন। কিন্তু বাড়িটি ছিল অস্বাস্থ্যকর। ওই পরিবেশে থাকা সম্ভব হলো না। কাজেই আবার বাড়ি বদল। এরপর ঘন ঘন কয়েকবার বাড়ি বদল করতে হয়।
নবযুগ প্রকাশের পরপরই পত্রিকাটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু বেশিদিন এর প্রকাশনা স্থায়ী হয়নি। মাত্র তিন মাসের মাথায় ব্রিটিশ শাসকদের রোষানলে পড়ে পত্রিকাটি। অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে উত্তেজনাপূর্ণ লেখা প্রকাশের জন্য ব্রিটিশ সরকার নবযুগ পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করে। দুই মাস প্রকাশনা বন্ধ থাকার পর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের দুই হাজার টাকা জামানত হিসেবে জমা দিয়ে মুজফফ্র আহমদ নতুন করে ডিক্লারেশন নেন। এর মধ্যে অফিস বদল হয়। মার্কুইস লেন থেকে ৬ টার্নার স্ট্রিটে অফিস স্থানান্তর করেন। সেখানেই দুই বন্ধু বসবাস শুরু করেন। পরে তারা অফিসের কাছাকাছি একটি বাসা ভাড়া নেন।
নবযুগ ঠিকঠাকভাবেই চলছিল। পত্রিকা পরিচালনার জন্য নজরুলকে অনেক বেশি সময় দিতে হতো। এতে তার মৌলিক লেখালেখিতে ব্যাঘাত ঘটছিল। তাকে তার কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী বোঝাতে সক্ষম হন যে, পত্রিকায় এত বেশি সময় দিলে তার প্রতিভা বিকাশ ব্যাহত হবে। অতঃপর নজরুল নবযুগ ছেড়ে মোসলেম ভারত পত্রিকার নির্ভরযোগ্য লেখক হন। আফজাল উল হক নজরুলকে নির্ধারিত অর্থ দিয়ে দূরে পাঠাবার উদ্যোগ নেন। সাংবাদিকতা বাদ দিয়ে তিনি বিশ্রাম ও লেখালেখির উদ্দেশ্যে বিহারের দেওঘরে চলে যান।
দেওঘরে নজরুলের ভালো কাটেনি। যে আশা নিয়ে প্রকাশক তাকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন সে আশাও পূরণ হয়নি। বরং নজরুল দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। এ কথা জানার পর মুজফফ্র আহমদ দেওঘরে গিয়ে কাজী নজরুলকে কালকাতায় নিয়ে এলেন। মুজফফ্র তার বন্ধু ফজলুর রহমানের ১৪/২ বেতলাহাট রোডের বাড়িতে ওঠেন নজরুলকে নিয়ে। এ খবর জানার পর আফজাল উল হক নজরুলের খরচাপাতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে নিয়ে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে ওঠেন। এখানেই পরিচয় হয় ছোটদের পাঠ্য বইয়ের প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে। আলী আকবর খুবই চতুর লোক। নজরুলকে কব্জা করতে অপকৌশলের আশ্রয় নেন।
অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে বিধ্বস্ত নজরুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন আলী আকবর। এক পর্যায়ে তাকে তিনি দৌলতপুরে আমন্ত্রণ জানান। ৩ এপ্রিল (১৯২১) কাউকে না জানিয়ে আলী আকবর খান নজরুলকে নিয়ে কুমিল্লার উদ্দেশে যাত্রা করেন। ৪ এপ্রিল তিনি কুমিল্লায় যাত্রাবিরতি করেন। আলী আকবরের সহপাঠী বীরেন্দ্র সেনগুপ্তের কান্দিরপাড়ের বাড়িতে যান। নজরুল অল্প সময়ের মধ্যেই সবার মন জয় করতে সক্ষম হন। বীরেন্দ্র সেনগুপ্তের মা বিরজাসুন্দরী দেবীর কাছে মাতৃস্নেহ পেয়ে তাকে মা বলে ডাকেন।
পরদিন ৫ এপ্রিল নজরুল আলী আকবরের সঙ্গে দৌলতপুরে চলে যান। সেখানে আলী আকবরের বড় বোন আসমাতুন্নেসার একমাত্র মেয়ে সৈয়দা খাতুনের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়। তাদের মেলামেশার সুযোগ হয় এবং নজরুল সৈয়দা খাতুনের প্রতি আকৃষ্ট হন। ভালোবেসে তিনি তার নাম দেন নার্গিস। সেই থেকে পরিবারের দেওয়া নাম আড়ালে চলে যায়। তাকে নিয়ে নজরুল কবিতা, গান রচনা করেন।
একপর্যায়ে ১৭ জুন নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন নার্গিসের বড় ভাই আবদুল জব্বার মুনশী। নার্গিসের বড় মামা আলতাফ আলী খান ছিলেন উকিল। পঁচিশ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্য করা হয়। বিয়ের শর্ত ছিল, নজরুল অন্য কোথাও যেতে পারবেন না। এক কথায় ঘরজামাই। এতে নজরুল অপমানিত বোধ করেন। রাতেই তিনি দৌলতপুর ছেড়ে কুমিল্লায় কান্দিরপাড় সেনবাড়িতে এসে আশ্রয় নেন।
সেনবাড়িতে পরিচয় হয় বীরেন্দ্র সেনের মাসিমা গিরিবালা দেবীর মেয়ে আশালতা ওরফে দুলির সঙ্গে। দুলির বয়স তখন মাত্র তেরো বছর। দুই সপ্তাহ সেন বাড়িতে অবস্থানকালে দুলির প্রতি আকৃষ্ট হন নজরুল। ভালোবেসে দুলির নাম দেন প্রমীলা। পরবর্তীকালে প্রমীলাকেই তিনি বিয়ে করেন।
কুমিল্লা থেকে নজরুলকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তার বন্ধু মুজফ্ফর আহমদ ৬ জুলাই সেন বাড়িতে আসেন। ১০ জুলাই তারা কলকাতার উদ্দেশে কুমিল্লা ত্যাগ করেন। এবার মুজফফ্র নজরুলকে নিয়ে কলকাতায় ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়িতে ওঠেন। জুলাইয়ের শেষ দিকে নজরুল প্রথমবারের মতো জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে যান। মোসলেম ভারত পত্রিকায় নজরুলের কবিতা পড়ে বিশ্বকবি তার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। অক্টোবরে তিনি আবার ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে ঠাকুরবাড়িতে যান।
১৯২১ সালের শেষ দিকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মহাত্মা গান্ধী, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষ বসুর আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন নজরুল। চিত্তরঞ্জন দাশকে গ্রেপ্তারের পর তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তার লেখনীর মাধ্যমে। তিনি লেখেন,
কারার ঐ লৌহ কপাট
ভেঙে ফেল কর রে লোপাট,
রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।
ওরে ও তরুণ ঈশান,
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ
ধ্বংস নিশান উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।
গানটি অতি অল্প সময়ের মধ্যে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এক রাতে ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়িতে বসে কাঠ পেনসিল দিয়ে কবি নজরুল লিখলেন বিদ্রোহী কবিতা।
বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি,
নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রির!
এম ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটিকা দীপ্ত
জয়শ্রীর!
কবিতাটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। কে জানত, মাত্র বাইশ বছর বয়সে লেখা কাজী নজরুলের কবিতাটি কালজয়ী হবে!
বি. দ্র. তালতলা লেনের ঐতিহাসিক সেই বাড়িটি আর বাস্তবে নেই। অনেক আগেই সেখানে বহুতল ভবন উঠেছে। গত বছর সেখানে গিয়ে দেখলাম, বাড়ির মূল গেটের পাশের দেয়ালে কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস-সংবলিত একটি নামফলক রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
১। কাজী নজরুল ইসলাম, জীবন ও সৃজন -রফিকুল ইসলাম
২। নজরুল তারিখ অভিধান -ড. মাহবুবুল হক।
৩। অন্তরঙ্গ আলোকে নজরুল ও প্রমীলা -আসাদুল হক
৪। দেবো খোঁপায় তারার ফুল (উপন্যাস) -মোস্তফা কামাল