১৯৪০ সালের এক সকাল। কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে হাজারো মানুষের ঢল নেমেছে। মঞ্চে উঠে দাঁড়িয়েছেন আকর্ষণীয় চেহারা আর গভীর দৃষ্টির একজন মানুষ। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘আমরা আমাদের নিরাপদ ও সুন্দর আগামী চাই। আমাদের দাবির নাম লাহোর প্রস্তাব- স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন।’
দীপ্ত কণ্ঠে যিনি এই ঘোষণা দিলেন তার নাম এ কে ফজলুল হক। বাংলার মানুষ ভালোবেসে ডাকে, শের-ই-বাংলা। ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখার গ্রামে জন্ম নেওয়া ফজলুল হক দিন দিন বাংলার মানুষের আশা ও প্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
শিশুকালে ফজলুল হকের মেধা, শক্তি ও সাহস ছিল অসাধারণ। একবার বাজার থেকে ঝুনো নারকেল কিনে এনে এক ঘুসি দিয়ে সেই নারকেল ভেঙে খেয়েছিলেন। আবার কখনো অনায়াসে মুখে পুরে দিতেন বড়সড় আস্ত এক আম। এমন অসম্ভব ঘটনা শিশুকালেই তাকে নায়ক বানিয়ে দিয়েছিল।
ফজলুল হকের শিক্ষাজীবনও ছিল দুর্দান্ত। ঢাকার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিত, পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে অনার্সে প্রথম শ্রেণি, তারপর মাস্টার্সে অঙ্কে প্রথম শ্রেণি- সবই তার অদম্য মেধা ও অধ্যবসায়ের প্রমাণ। ফজলুল হক ছিলেন বাঙালির আত্মসম্মানের প্রতীক।
সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে নেমেছেন, কারণ তিনি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে জানতেন না। ফজলুল হক সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে। তবে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি বাংলার শোষিত ও দরিদ্র কৃষক-প্রজার দুঃখ-দুর্দশা গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। তিনি খেয়াল করলেন, সরকারি চাকরিতে থেকে কৃষকদের জন্য কার্যকরভাবে কিছু করতে পারছেন না। সরকারের নীতি ও সাধারণ মানুষের স্বার্থের সঙ্গে তার মতবিরোধ হচ্ছে, তাই তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের আরামদায়ক ও লোভনীয় সরকারি চাকরি ছেড়ে দিলেন।
এরপর তিনি আবার আইন পেশায় ফিরে আসেন। হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন। ওকালতির শুরুতেই তার উপস্থিত বুদ্ধি ও কথা বলার ভঙ্গির জন্য দ্রুত চারদিকে নাম ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে দেশীয় শব্দ ব্যবহার করে আন্তরিকতা নিয়ে, ধৈর্যের সঙ্গে এমনভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করতেন যে, তার কথা শুনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সঙ্গে বিচারপতিরাও মুগ্ধ হয়ে যেতেন।
দিল্লি অধিবেশনে বা পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করার সময় তার বক্তব্য সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। ভাষণ, যুক্তি ও প্রজ্ঞা মিলে সবাই হয়েছিলেন মোহিত। পাঞ্জাববাসী তাকে দিয়েছিল ‘শের-ই-বঙ্গাল’ উপাধি, যা আজও ‘শের-ই-বাংলা’ হয়ে আছে। সাহস, দূরদর্শিতা ও অদম্য মনোভাব তাকে এই উপাধির যোগ্য করেছে।
ফজলুল হক কৃষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই আত্মত্যাগই প্রমাণ করে যে, তার কাছে ক্ষমতা বা বিত্তের চেয়ে বাংলার মানুষের মুক্তি ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ শাসনের অন্ধকারে তিনি বরাবর আলোর মতো নির্ভীক, যুক্তিবাদী এবং জনগণের পক্ষে আপসহীন ছিলেন।
ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবনের অবদান ছিল চমকপ্রদ। কলকাতা করপোরেশনের মেয়র তিনিই প্রথম বাঙালি মুসলমান। দেশ বিভাগের পর ফজলুল হক পাকিস্তানের গৃহমন্ত্রী, পূর্বপাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৩৫ সালে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করে ৩৫টি আসনে জয়লাভ করেন। এরপর তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এ সময় তিনি কৃষকদের অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেন। ফজলুল হকের প্রধান লক্ষ্য ছিল কৃষকদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা। ফজলুল হককে বাংলার কৃষক-প্রজা তাদের জন্য ‘গরিবের মা-বাপ’ হিসেবে দেখত। জমিদারদের লাগামহীন অত্যাচারের শিকার কৃষকদের বাঁচাতে তিনি আইন সংশোধন করে জমির ওপর তাদের অধিকারের স্বীকৃতি দেন। অন্যদিকে, তার গঠন করা ঋণ সালিশি বোর্ড বাংলার কোটি কোটি ঋণগ্রস্ত চাষিকে মহাজনদের নাগপাশ থেকে মুক্তি দেয়। ঋণের দায়ে ৪০ বছর আগে যাদের ভিটেমাটি হস্তান্তর হয়েছিল, তারাও তার প্রণীত আইনের সাহায্যে সেই হারানো ভিটেমাটি ফিরে পায়। তিনিই প্রথম দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন- ‘লাঙল যার, জমি তার।’ এই স্লোগান আজও কৃষক অধিকারের প্রতীক হয়ে আছে।
ফজলুল হক দেশের সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। তিনি কখনো ক্ষমতার রাজনীতি করেননি- সব সময় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের রাজনীতি করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের শক্তি হলো কৃষক, শ্রমজীবী ও প্রজা। তাদের অধিকার রক্ষা ও কল্যাণে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ফজলুল হকের অবদান চিরস্মরণীয়। যখন কলকাতার বাবুরা ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন, তখন ফজলুল হক দৃঢ়ভাবে পক্ষে অবস্থান নেন। বাংলার মুসলিম সমাজের অনগ্রসরতা দূর করতে তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর। তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য থাকাকালীন মোট ১৪৮ বার বক্তব্য দেন, যার মধ্যে ১২৮ বারই তিনি দাঁড়িয়েছিলেন মুসলমানদের শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য। তারই প্রচেষ্টায় শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে, যা বাঙালি মুসলমানদের জন্য শিক্ষা ও জ্ঞানের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
ফজলুল হক আমাদের শিখিয়েছেন- জ্ঞান, সততা, সাহস, মানবিকতা এবং মানুষের কল্যাণের জন্য ত্যাগ। তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত নেতা, যিনি তার কাজ, ত্যাগ আর সাহসের মাধ্যমে বাংলার ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তার জীবন আজও আমাদের প্রেরণা জোগায়।