বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০) তার সাহিত্যে জীবনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। অন্যান্য লেখকের মতো তিনি হতে পারেননি।
তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা লিখেছেন। তিনি ‘পথের পাঁচালী’ (১৯২৯) উপন্যাসে সেই মানুষকে খুঁজেছেন, ফকির লালন গেয়েছিলেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় তার উপন্যাস অবলম্বন করে ১৯৯১ সালে ‘পথের পাঁচালী’ চলচিত্র নির্মাণ করে অস্কার জয় করে ভারত ছাড়িয়ে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি লাভ করেন।
একজন শিল্পী, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, শিল্প ও জীবন নিয়ে তার ভাবনাগুলো চলচ্চিত্রে নির্মাণ করে বিশ্বজয় করেন। কী এমন ছিল এ উপন্যাসের মধ্যে, যা বিশ্ববাসীকে আকর্ষণ করেছিল? আমরা জানি এ সমাজব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে ভবিষ্যৎ সমাজের ভ্রূণ। একদল মানুষ এ সমাজব্যবস্থাকেই চরম ও পরম বলে স্বীকার করেন না; তারা ওই ভ্রূণাবস্থায় থাকা ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ রূপ মনশ্চক্ষুতে দেখতে পান এবং সেই সমাজের কথা বলেন। সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেন।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম প্রকাশিত বই ‘পথের পাঁচালী’। তার স্বীকৃতি বা জনপ্রিয়তা প্রায় তুলনাহীন। যে পথের সঙ্গে রয়েছেন একজন করুণাময় ‘পথিক দেবতা’। এ উপন্যাসে বহু স্বর, বা এমন সব উল্লেখ আছে যার মধ্যদিয়ে ভারতবর্ষের বহুবিচিত্র সংস্কৃতির বা ঐক্যের দিকটি প্রকাশিত। বাঁশের বনে অপু আবিষ্কার করে মহাভারতের যুদ্ধ। যে যুদ্ধে কর্ণ চরিত্রটি তাকে আকর্ষণ করে, যে কর্ণকে মাটিতে বসে যাওয়া রথের চাকা তোলার সময় অর্জুন হত্যা করেছে। অপুর পাঠ্য তালিকাটিও আকর্ষণীয়। ‘পথের পাঁচালী’ বাল্য ও বাৎসল্য রসের এক আশ্চর্য প্রকাশ। সত্যজিৎ রায় ‘পথের পাঁচালী’কে বাংলার গ্রামজীবনের বিশ্বকোষ বলে উল্লেখ করেছেন।
‘পথের পাঁচালী’র ভাষা, পটভূমি, চরিত্রের সমাহার, সংস্কৃতির পরিসর এবং কাঠামো মানবতাবাদী ভারতীয় সাহিত্য-ঐতিহ্যের এক আঞ্চলিক নান্দনিক প্রকাশ। হরিহরের দারিদ্র্য, রেলপথ, সাম্রাজ্যবাদী শাসন, নীল চাষ, জমির সঙ্গে প্রাত্যহিক সম্পর্কহীন অনাবাসী বারানসির ভূস্বামী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা এসবই চিনিয়ে দেয় ভারতবর্ষের প্রাচীন কৃষিভিত্তিক গ্রাম-সভ্যতার পরিবর্তন। চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও নিসর্গের সঙ্গে ব্যক্তিমনের অভিঘাত, দারিদ্র্য ও বঞ্চনা- এসবই ভারতীয় গ্রাম জীবনের একান্ত আপন দৃশ্য।
পাঁচালী শব্দটির প্রয়োগ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ মনে করেন; যা আমাদের সামাজিক এবং পারিবারিক জীবনকে চেনায় এবং যা আমাদের পরিবার জীবনের গণ্ডির বাইরে এনে ফেলে। হর-গৌরীর গান যেমন সমাজের গান, রাধা-কৃষ্ণের গান তেমনি সৌন্দর্যের গান। ‘পথের পাঁচালী’র আধুনিক মানবতাবোধ (‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’) এবং বাস্তব আখ্যান বদলে দিয়েছে সেই আখ্যানের প্রসঙ্গ এবং স্বরটিকে। পথের পাঁচালী, এ শব্দ দুটি মনে আনে এক পথ এবং এক ছন্দময় আখ্যানের গীতিরূপ।
‘পথের’ শব্দটি বয়ে আনে যাত্রার এক অনুষঙ্গ, যে যাত্রা জীবনেরই প্রতীক। এটি এক সরল গ্রাম্য ব্রাহ্মণ বালকের দৈহিক ও মানস-যাত্রা। সে বেড়ে উঠেছে এক গরিব সংসারে কিন্তু তার শিশুমন আশ্চর্য কল্পনা-সম্পদের অধিকারী। তার গ্রাম-পরিক্রমার মধ্যদিয়ে সে আবিষ্কার করে প্রতিবেশী মানুষজন, বনবাদাড়, গাছপালা, ডোবাপুকুর, পালাপার্বণ, বহতা নদী, ব্যতিক্রমী মানুষজন, ঐতিহ্য, পুরাণকথা, গদ্য-পদ্যের নায়ক-নায়িকা, অঞ্চলের লোককথা, স্মৃতিসৌধ আর সর্বোপরি এই পরিবেশের মানুষজন। সে হয়ে ওঠে এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। সে পড়ে বাবার পুঁথি, বই ও পত্রিকা, প্রতিবেশী রানী ও সুরেশের বাড়ির বইপত্র। গ্রামের যে পাঠশালায় নীরেন পড়ায় সেখানেও পড়েছে কিছুকাল। বালক মনের কল্পনায় গ্রামের পুকুর তখন হয়ে উঠেছে দ্বৈপায়ন হ্রদ। চারপাশের ঝুলন্ত বাঁশের পালা ঘিরে গড়ে উঠেছে মহাকাব্যের পটভূমি- চেনা পরিবেশ হয়ে উঠেছে রহস্যলোক। উপন্যাসে মেলে তার নিজের গাঁ থেকে অন্য গাঁয়ে যাওয়ার কাহিনি, পরে সুদূর কাশীযাত্রার কথা। বহুভাষাভাষী বহুজাতী গোষ্ঠীর কাশী তার কাছে চেনাশোনার জগৎ। কাশীর পরিবেশে সে আত্মপরিচয় ভুলে যেতে থাকে। বিশেষ করে তার বাবার মৃত্যুর পর মা যখন কাশীর এক ধনী পরিবারে রাঁধুনির কাজ নিতে বাধ্য হয়, সে ফিরে যেতে চায় নিশ্চিন্দিপুরে- যে গ্রাম থেকে তাকে চলে আসতে হয়েছে দারিদ্র্যের কারণে, জীবিকার তাগিদে। কাশীতে তার হৃদয় সংকুচিত হয়, তার কল্পনা ছোট হয়ে আসে।
গ্রাম জীবনের যে বহুমুখী বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অপুর দৈহিক ও মানস যাত্রা, তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পঁচাত্তর বছর বয়সী তার বৃদ্ধা ঠাকুরমা ইন্দির ঠাকরুন এবং অপুর বালিকা দিদি দুর্গার অভিজ্ঞতা তাকে সমৃদ্ধ করে। ইন্দির ঠাকরুন একটি প্রতীক- উবে যাওয়া গ্রাম জীবনের, যে গ্রাম হারিয়ে যেতে থাকে বিদেশি বেনিয়া নীলকর সাহেবদের হাতে, কুলীন স্বামী ও বদ্ধ সংস্কার-দীর্ণ এক সামাজিক রীতিনীতি এবং সামাজিক সম্পদহীনতায়। দারিদ্র্য আর নিসঙ্গতার চাপে ইন্দির ঠাকরুন মারা যায় বাড়ির বাইরে।
অপুর অভিজ্ঞতার সঙ্গে দুর্গার অভিজ্ঞতার কোনো গরমিল নেই। দুর্গা তার চেনা জগতের মধ্যে অন্য এক জগৎ দেখতে পায় যেখানে দয়ার চেয়ে নিষ্ঠুরতা বেশি। তার চঞ্চল, গতিশীল এবং সন্ধানী বালিকামনের প্রতি সহানুভূতির পরিবর্তে সেখানে রয়েছে উদাসীনতা। তার পাশের ছড়ানো প্রকৃতি থেকে সে খুঁজে নিতে পারে তার মনের উজ্জীবন, কিন্ত দারিদ্র্য আর পুরুষ-প্রাধান্য ব্যাহত করে তার নারীত্বের বিকাশ এবং পূর্ণতা। কে বিয়ে করবে এই গরিব মেয়েটিকে? ঈর্ষাকাতর প্রতিবেশীরা জানে সে অভাগী, বিয়ের সুখ তার কপালে নেই। তার প্রাণ সত্তা হারিয়ে যেতে থাকে এবং অবশেষে দুর্গা ম্যালেরিয়ায় ভুগে মারা যায়। সুরহীন ভালোবাসাহীন দুর্গা নীরবে আমাদের ছেড়ে চলে যায়।
পথের পাঁচালীর প্রকৃতি কমবেশি কিশোর অপুর ও কিছুটা তার দিদি দুর্গার আত্মেরই বিস্তৃতি, এক মানবায়িত প্রকৃতির সন্তান। সবকিছু জীবন্ত দেখিয়েছেন বর্ণনার মধ্যদিয়ে। যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ক্যানভাস, যাদের দেখবার স্বাধীন দৃষ্টি আছে তাদের কাছে যেন দেখবার দৃষ্টি খুলে দিয়েছেন লেখক। ‘পথের পাঁচালী’র মহত্ত্ব তার মানবতাবোধ, গীতিময়তা এবং সত্যের উচ্চারণে। লেখকের ভাষা-পটভূমি, নিসর্গ-চিত্রকল্প নির্মাণে সাহিত্য শেষপর্যন্ত আন্তর্জাতিক। সাহিত্যের চূড়ান্ত মূল্য তার নান্দনিকতায় এবং বিশ্বজনীনতায়।