ঢাকা ৯ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
মেসির জোড়া গোলে অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে নকআউটে আর্জেন্টিনা গ্যালারির সবচেয়ে ব্যতিক্রমী মুখটি এবার বিশ্বকাপে মেসির রেকর্ড গড়া গোলে প্রথমার্ধে এগিয়ে আর্জেন্টিনা ক্লোসাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন মেসি অপ্রত্যাশিত এক রেকর্ড মেসির পেনাল্টি মিস করলেন মেসি বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেলেন জার্মান ডিফেন্ডার পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দশমিকের হিসাবে আটকে আছে তামাক কর, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার দক্ষিণ এশীয় শিশু সুরক্ষা সম্মেলনে যোগ দিতে কলম্বো পৌঁছেছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী চীনে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সেনা মোতায়েন সাঁথিয়ায় বুদ্ধি প্রতিবন্ধীকে ধর্ষণ, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার একাদশে পরিবর্তন মানিকগঞ্জে মারিয়া হত্যা মামলায় প্রধান শিক্ষকসহ গ্রেপ্তার ৮ গাজীপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের ৩৪ নেতাকর্মী আটক সাতকানিয়ায় যুবলীগ নেতা হাসান মাহমুদ গ্রেপ্তার নোয়াখালীতে আসল র‍্যাবের হাতে নকল র‍্যাব সদস্য গ্রেপ্তার সারাদেশে ভূমিকম্প অনুভূত সুরে সুরে শেষ হলো বিশ্ব সংগীত দিবসের বর্ণিল আয়োজন টাইব্রেকারে জামালপুরকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন মাগুরা প্রকৃত মুমিন নিজেকে কীভাবে সামলে নেয়? সহিংসতা এড়াতে গোপালগঞ্জেও পৌঁছেছে সেনাবাহিনী ‘মসজিদ-মাদরাসায় রাজনৈতিক সভা ও জামায়াত রাজনীতি নিষিদ্ধে সংসদে আইন পাসের দাবি’ রাম মূর্তি নির্মাণ ও হিন্দুত্ববাদী তৎপরতার প্রতিবাদে ইসলামপুরে বিক্ষোভ মিছিল নাশকতা ঠেকাতে গাজীপুরেও সেনা মোতায়েনের নির্দেশ চবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের মোটরসাইকেল শোডাউন ফরিদপুরে আ. লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সেনাবাহিনী মোতায়েন শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে মাত্র ৫ দিনে মিলল প্রায় ১৮ লাখ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার ঈশ্বরদীতে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা

দারিদ্র্যই মানুষকে শিক্ষার দিকে তাড়িত করেছে

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
দারিদ্র্যই মানুষকে শিক্ষার দিকে তাড়িত করেছে
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

দেশবরেণ্য লেখক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশের একজন অভিভাবক, বাঙালির বাতিঘর এই শিক্ষাগুরু সবার স্যার। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যেমন অনন্য অবদান রেখেছেন, তেমনি সাহিত্য সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। সেই ছোটবেলায় তার লেখালেখিতে হাতে খড়ি। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি নিয়মিতই লিখছেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, অবসর গ্রহণের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। চব্বিশ বছর ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন। এক শ বাইশ গ্রন্থের রচয়িতা। লেখালেখির জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

শুরু করা যাক পশ্চাৎভূমি দিয়েই। আমার জন্ম ১৯৩৬-এ, জুন মাসের ২৩ তারিখে। আব্বা তার ছেলেমেয়েদের জন্মের সাল-তারিখ একটি খাতায় লিখে রাখতেন, সেখান থেকেই এ তথ্য পাওয়া। সেকালে নিয়ম ছিল মায়েদের প্রথম সন্তান মায়েদের বাবার বাড়িতেই ভূমিষ্ঠ হবে; সে নিয়মে আমার প্রথম ক্রন্দন নানাবাড়িতেই। আমার নানাবাড়ি ও দাদাবাড়ি আড়িয়ল বিলের এপাড়ে-ওপাড়ে। আড়িয়ল বিল ঢাকার বিক্রমপুর পরগনার অনেকটা এলাকা দখল করে রেখেছিল। বর্ষাকালে তো বিল নয়, মনে হতো সমুদ্র। সমুদ্রের এপারে দাদাবাড়ি বাড়ৈখালী, ওপারে নানাবাড়ি সাইনপুকুর। সাইনপুকুরেরও আবার দুই ভাগ- খালপাড় ও পদ্মাপাড়। পদ্মাপাড়ের লোকদের সুবিধা বেশি, ভাগ্যকূলে স্টিমার ঘাট থাকার জন্য। সেখান থেকে স্টিমারে চেপে গোয়ালন্দ হয়ে রেলে করে সরাসরি কলকাতায় গিয়ে হাজির হওয়া যেত, একই টিকিটে; রেল কোম্পানি ও স্টিমার কোম্পানির মধ্যে ওই রকমের একটা বন্দোবস্ত ছিল; শুনেছি দুই কোম্পানির মালিকানাও নাকি ছিল অভিন্ন, অবশ্যই ব্রিটিশের। খালপাড়ের লোকেরা তুলনায় একটু অসুবিধাতেই ছিলেন, তবে সেটা খুব বড় রকমের নয়। সেই তুলনায় বাড়ৈখালীর লোকদের অসুবিধাটা ছিল অনেক বেশি; তাদের স্টিমার ধরতে হতো রীতিমতো কাঠখড় পুড়িয়ে, ভাগ্যকূল গিয়ে। সবার গন্তব্যই অবশ্য ছিল অভিন্ন- কলকাতা, বাংলার এবং তৎকালীন ভারতবর্ষেরও রাজধানী। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক পূর্ব বাংলার এক প্রান্তে বিক্রমপুর। 

বিক্রমপুরের সুখ্যাতি অবশ্য ছিল বহুলপ্রচলিত; কিন্তু এলাকাটির অর্থনীতি ছিল দুর্বল। এর অনেক জায়গাই বছরে ছয় মাস পানির নিচেই থাকত; ফলে কৃষির ওপর ভরসা করা যেত না। জীবিকার সন্ধানে এলাকার মানুষ যে যেমন করে পারে বেরিয়ে পড়তেন। ঢাকা শহরের গা-ঘেঁষেই তো ছিল আমাদের এ বিক্রমপুর পরগনা; কিন্তু মুর্শিদাবাদের উত্থানের আঘাতে পরিত্যক্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত ওই শহরের সঙ্গে বিক্রমপুরবাসীর যোগাযোগ ছিল খুবই সীমিত। ১৯৪৮ সাল থেকে পারিবারিকভাবে আমাদের বসবাস অবশ্য ঢাকাতেই; তবে তার কারণ অন্যকিছু নয়, সাতচল্লিশের দেশভাগ বটে। তার আগে আমার বাবা ঢাকা শহরে একবার মাত্র এসেছিলেন; সেও চাকরি সূত্রে এবং অত্যন্ত অল্পসময়ের জন্য।

বিক্রমপুরে অনেক বিখ্যাত মানুষ জন্মগ্রহণ করেছেন। বিক্রমপুরের লোক নাকি পৃথিবীর হেন স্থান নেই যেখানে পাওয়া যায় না। দুয়ের পেছনে প্রধান কারণ ওই একটাই- কৃষির ওপর নির্ভর করতে না পারা। খুব বড়মাপের জমিদার বলতে গেলে তেমন একটা ছিলেনই না। আর যারা প্রচুর জমির মালিক হয়েছিলেন, শুরুতে তারাও জমিদার নন, ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসা, চাকরি, পেশা, লেখাপড়া, বাংলার বাইরে যাওয়া, সবকিছুর জন্যই কলকাতায় ছুটতে হতো। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তো অনেককাল আগের ঘটনা, ৯৮০-১০৫৩ সালের। সেন রাজারা যে এখানে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেছিলেন সেটাও অতীত ইতিহাসের ঘটনা বৈ নয়। ব্রিটিশ আমলে জগদীশচন্দ্র বসুর পক্ষে অতবড় বৈজ্ঞানিক হওয়া সম্ভব হতো না যদি তাকে বিক্রমপুরে আটকে থাকতে হতো। তার বাবা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর, যে জন্য বিভিন্ন শহরে থেকেছেন এবং পড়ালেখাও করেছেন কলকাতাতেই। চিত্তরঞ্জন বসু তো তার বাবার কাল থেকেই কলকাতাবাসী; তার বাবা ছিলেন হাইকোর্টের অ্যার্টনি। সরোজিনী নাইডু যে কবি এবং রাজনীতিক হিসেবে অমন যশস্বী হলেন তার কারণ তার বাবা ছিলেন হায়দ্রাবাদের নিজামের শিক্ষা উপদেষ্টা; নিজাম তাকে ডেকে নিয়েছিলেন শিক্ষার ব্যাপারে তার উচ্চখ্যাতির জন্য, যা তিনি অর্জন করেছিলেন কলকাতা হয়ে এডিনবরায় গিয়ে। সরোজিনী নাইডুর ছোট ভাই বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় যে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হতে পেরেছিলেন তার পেছনেও ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য হায়দ্রাবাদ থেকে তার ইংল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ। আসলে ব্রিটিশ আমলে আমাদের এলাকা দরিদ্রই ছিল। আর সেই দারিদ্র্য ঘোচানোর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাই এখানকার মানুষকে শিক্ষার দিকে তাড়িত করেছে, ফলে শিক্ষিতের হার তুলনামূলকভাবে উঁচুর দিকে উঠে গেছে। এবং শিক্ষায় এগিয়ে থাকার জন্য বিক্রমপুর খ্যাতি অর্জন করেছে।

তবে হ্যাঁ, শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহের এই এলাকার নিজস্ব একটি ঐতিহ্য রয়েছে। ক্ষীণ ধারায় হলেও সেটি অতীত থেকে বর্তমানে প্রবহমান। অবশ্য আরও একটি সামাজিক ব্যাপার ঘটেছিল; সেটা হলো স্কুলের সংখ্যাবৃদ্ধি। এত অধিক সংখ্যায় স্কুল প্রদেশের কম জায়গাতেই ছিল। এর পেছনেও কারণ ছিল। সেটা হলো ধনাঢ্য ব্যক্তিরা, যাদের সম্পদ অর্জিত হয়েছিল মূলত ব্যবসার মাধ্যমে, তারা সুখ্যাতি অর্জনের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে স্কুলের নামকরণ ঘটেছে পরিবারেরই কারও নামে। দ্বিতীয়ত, যারা জমির মালিক হয়েছিলেন তাদের বড় অংশটি কলকাতায় থাকলেও একাংশ গ্রামেই থাকত। প্রজাদের কাছ থেকে এরা জমির খাজনা আদায় করতেন, সেই সঙ্গে জমিজমার দেখাশোনাও কিছুটা করতেন; এদের সন্তানদের জন্য স্কুল দরকার পড়ত, সে স্কুলও এরাই প্রতিষ্ঠা করতেন। গ্রামে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবারের কেউ হয়তো হেডমাস্টারের দায়িত্বও নিতেন। পালাপার্বণে প্রবাসীরা জাঁকজমক করে যখন ‘দেশে’র বাড়িতে আসতেন, তখন বেশ একটা সাড়া পড়ে যেত। এ ছাড়া বিক্রমপুরে মেলা হতো, যাত্রার আয়োজন থাকত, নাট্যাভিনয়েরও প্রচলন ছিল; এসবে কলকাতা থেকে দেশে আসা জমিদারবাড়ির সহায়তায় ও অংশগ্রহণে ঘটত। স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধির তৃতীয় কারণ শিক্ষিত লোকেরা যারা বাইরে থাকতেন তারাও আগ্রহী হতেন স্কুল স্থাপনে। গ্রামে থাকতেন কিংবা আসা-যাওয়া করতেন এমন শিক্ষিতজনরাও উদ্যোগে যোগ দিতেন। উদ্যোগ বেশ ফলপ্রসূ হতো।

তবে স্কুলগুলো ছিল নির্দিষ্ট কিছু স্থানে। যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে তো অবশ্যই, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার জন্যও সাধারণ ঘরের ছেলেরা ওই সব স্কুলে যেতে পারত না। আর মেয়েদের জন্য আলাদা স্কুল রয়েছে এমন খবর পাওয়াই যায়নি। মেয়েদের মধ্যে তারাই শিক্ষিত হতে পারত কর্মসূত্রে যাদের পরিবার গ্রামের বাইরে বিভিন্ন শহরে থাকত; যেন সরোজিনী নাইডুরই ছোট ছোট সংস্করণ। গ্রামে-থাকা মেয়েরা ঘরে যেটুকু পাওয়া সম্ভব ছিল সেটুকু শিক্ষাই পেত। অতটুকুই ছিল সম্বল।

ধরা যাক, আমাদের মাছুমা খালার কথা। আমার মা ও মাছুমা খালা আপন বোন ছিলেন না, কিন্তু ছিলেন নিকটাত্মীয় এবং সমবয়সী। খালপাড়ে পাশাপাশি বাড়ি এবং দুজনেই খান গোষ্ঠীর। কিন্তু মাছুমা খালা যে উচ্চশিক্ষা পেয়েছেন, সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন, বই লিখেছেন কয়েকটি, একাকী বিলেত গেছেন ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্কলারশিপ নিয়ে, পোস্ট-গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা নিয়ে এসেছেন শিক্ষকতার; এসবই সম্ভব হয়েছে শৈশবে বাবার সঙ্গে শহরে থাকার কারণে। মেধা অবশ্যই ছিল। কিন্তু ওইভাবে তা কাজে লাগত না যদি গ্রামের বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করার পরিবেশটা না পেতেন। আমার মা যা শিখেছেন সবটাই নিজেদের ঘরে এবং আপনজনদের সান্নিধ্যে, কোনো বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ তিনি পাননি। ১৯৫০ সালে ঢাকার আজিমপুর এলাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য যে আবাসিক কলোনিটি তৈরি হয় তাতে মাছুমা খালার বাসা এবং আমাদের বাসা ছিল খুব কাছাকাছি। শৈশবে যেমন ছিল মা ও খালার বাড়ির নৈকট্য অনেকটা তেমনটি। কিন্তু কী বিস্তর পার্থক্য; আমার মা গৃহিণী, মাছুমা খালা সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। ইস্কাটনে একখণ্ড জায়গা কিনে মাছুমা খালা একতলা একটা বাড়িও তৈরি করেছিলেন। আমার মায়ের বাসাটা তার স্বামীর, মাছুমা খালার বাসার বরাদ্দটি তার স্বামীর নয়, ছিল তার নিজের নামে। যেন শহর ও গ্রামের দূরত্ব।

মোট কথা, অতীতে যেমনই থাকুক ইংরেজ আগমনের পরে আমাদের পরগনার অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। প্রান্তিক গ্রামগুলো ছিল ঝোপঝাড়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন। বর্ষার সময়ে কোনো কোনো গ্রামকে মনে হতো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। শিক্ষিত ও অবস্থাপন্ন মানুষ কেউ কেউ গ্রামে আসা-যাওয়া করতেন, অনেকেরই পরিবার-পরিজন থাকত গ্রামের বাড়িতেই। তাতে সামগ্রিক অন্ধকার ঘুচত না। তবে শিক্ষিতের হার যেহেতু তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল এবং শিক্ষিতদের একাংশ যেহেতু গ্রামে থাকতেন, শিক্ষকতাও করতেন এবং একদিন পরে হলেও খবরের কাগজও যেহেতু নিয়মিত আসত, তাই মানুষের রাজনৈতিক চেতনাও নেহায়েত গ্রাম্য ছিল না। বরং ছিল বেশ শহুরে ধরনের। রাজনৈতিক কাজকর্ম চালু ছিল; কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা ছিলেন, পরে মুসলিম লীগের তৎপরতাও শুরু হয়। গ্রামের বাইরে অন্যত্র, কলকাতায় এবং অন্যান্য শহরে কী ঘটছে না-ঘটছে তার খবর তারা রাখতেন। শিক্ষিত তরুণদের রাজনৈতিক অগ্রসরমানতা ছিল অনুভবযোগ্য। সর্বভারতীয় বড় মাপের রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই বিক্রমপুরে এসেছেন; জনসংযোগ তো অবশ্যই, জনসভাও করেছেন।

কিন্তু যা বলছিলাম, প্রান্তিক পূর্ববঙ্গের একটি প্রান্তিক এলাকা যে আমাদের ওই পরগনা সেটা যেমন ভৌগোলিকভাবে সত্য, তেমনি সত্য ছিল অর্থনৈতিক দিক থেকেও। নদীর ভাঙন ও গতির পরিবর্তন এ এলাকাকে অনেকবার এবং বহুভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগে ঢাকা নতুন একটি প্রদেশের রাজধানী হবে এমন সম্ভাবনায় শহরটি আড়মোড়া ভেঙে বুঝি-বা জেগে উঠছিল, কিন্তু রাজধানী হয়েও যে টিকল না এবং ১৯১১-এর শেষে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হচ্ছে দেখে অখণ্ড বাংলার ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের ওপর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্রিটিশ শাসকরা যে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে যায় তাতেও ঢাকার বাসিন্দাদের অধিকাংশের আশাভঙ্গ ঘটে।

যে জায়গাটিতে আমাদের নিজেদের বংশানুক্রমিক বসবাস সেটি প্রান্তিক বিক্রমপুরেরও প্রত্যন্ত একটি প্রান্ত। যেন সীমান্তরেখা। এর পরেই বিশাল আড়িয়ল। থানা সদর শ্রীনগরে; আমাদের বাড়ৈখালী গ্রাম তার শেষ সীমান্তে। স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন পারিবারিকভাবে আমাদের ভেতর উঠেছে; সেটা হলো এই বিরান মুলুকে আমাদের পূর্বপুরুষ বসতি গড়েছিলেন কোন বিবেচনায়? আমার প্রয়াত মেজো ভাই আমানুল ইসলাম চৌধুরী পেশায় ছিল প্রকৌশলী; এ বিষয়ে তার কিছুটা বৈজ্ঞানিক কৌতূহল ছিল। এনিয়ে জীবিতদের ভেতর যিনি বলতে পারতেন তিনি আমাদের বাবা। বাবার সঙ্গে আমাদের ওই ভাইটির ভালো আদান-প্রদান ছিল। তার কাছে সে শুনেছে অমন জায়গায় বসতি স্থাপনটা স্বেচ্ছায় ঘটেনি, ঘটেছে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূর্যাস্ত আইনের কারণে। আব্বার এ বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে শ্রী যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের লেখা বিক্রমপুরের বিবরণ নামের বইটিতে। এই লেখক বিক্রমপুরের বিষয়ে অসাধারণ কষ্টসাধ্য গবেষণা করেছেন এবং বিক্রমপুরের ইতিহাসসহ বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। বিক্রমপুরের বিবরণ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এবং গণবিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান খান, ইতিহাস বিষয়ে কৌতূহলের প্রেরণায় যিনি পুরোনো বই সংগ্রহ করতে ভালোবাসেন এবং ভারি খুশি হন আগ্রহীজনকে বইয়ের কপি উপহার দিতে পারলে; তার অনুগ্রহে বইটি এক কপি আমি পেয়েছি। তাতে জহুরুদ্দীন চৌধুরী নামে একজনের কথা আছে, যার সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ‘আঞ্চলিকভাবে পারিবারিক পরিচয়ে এরা খ্যাতিবান ছিলেন’, কিন্তু ‘ইহারা উপযুক্ত সময়ে খাজনা দিতে না পারায় সম্পত্তি নীলাম হইয়া যায়’; এবং গুরুপ্রসাদ রায় ও তার দুই ভাই ‘সেই সম্পত্তি বিশ হাজার টাকা দিয়া ক্রয় করেন।’ রায়রা ছিলেন ব্যবসায়ী। এরা ব্যবসা করতেন লবণ ও চালের। লবণ তখন বাইরে থেকে আমদানি করা হতো এবং বিক্রি হতো পাইকারি নিলামে। রায় ভ্রাতারা লবণ ক্রয়ে উদ্যোগী ছিলেন, নিলামে বিপুল পরিমাণ লবণ কিনে তারা মজুত করে রাখতেন এবং পরে তা উঁচু দরে বাজারে ছাড়তেন। [লবণের কারবারে মুনাফার বিষয়ে আমাদের প্রজন্মের মানুষদের স্মরণে থাকার কথা যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বিক্রমপুরেরই এক বিখ্যাত ব্যক্তি জনাব ফজলুর রহমান কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন এবং পেয়ে তার এক আত্মীয়কে লবণ আমদানির একচেটিয়া পারমিট পাইয়ে দিয়েছিলেন।

আত্মীয়টি অত্যাবশ্যকীয় ওই পণ্যটি মজুত করেন এবং তার দর সেরপ্রতি ষোলো টাকায় তোলেন, যেটি ছিল একটি কারণ, যে জন্য ১৯৫৪-এর প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ সরকারের পতন ঘটে। স্থানীয়ভাবে লবণ তৈরির ওপর ব্রিটিশ সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করায় গান্ধীজি ১৯৩২ সালে যে লবণ সত্যাগ্রহর মাধ্যমে বড় রকমের রাজনৈতিক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন সেটিও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।] শুধু লবণ নয়, চালের ব্যবসাতেও রায় ভ্রাতারা মজুতদারি করতেন। এরা জমিদার ছিলেন না, কিন্তু নিলামে জমি কিনে জমিদার হয়ে গেলেন। ব্যবসার সঙ্গে রায়দের জমিদারিও চলতে থাকল এবং তারা অতি দ্রুতবেগে সমৃদ্ধশালী হতে থাকলেন। এদেরই একজন পরে ইংরেজপ্রদত্ত রাজা উপাধিতে ভূষিত হন, তার আগে পেয়েছিলেন রায়বাহাদুর উপাধি।

গবেষক-লেখক যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত আরও যা জেনেছেন তা এই রকমের যে, রায় ও কুণ্ডুদের মধ্যে ব্যবসা নিয়ে প্রচণ্ড প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল; কিন্তু এক সময়ে সমীকরণ ঘটে, তারা এক হয়ে যান এবং রায়রাও কুণ্ডু নামেই পরিচিত হতে থাকেন। খাজনা দিতে না পারা জহুরুদ্দীন চৌধুরীর জমি ক্রয় বিষয়ে যোগেন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘এই সম্পত্তি ক্রয় ব্যাপারে গুরুপ্রসাদ ও তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতৃদ্বয় যে মহত্ত প্রদর্শন করিয়াছিলেন তাহা বিশেষ প্রশংসনীয়। সম্পত্তি বিক্রয় হইয়া গিয়াছে, মর্মপীড়িত বৃদ্ধ ভূম্যধিকারী জহুরুদ্দীন চৌধুরী সম্পত্তির নতুন মালিক গুরুপ্রসাদ ও তাহাদের ভ্রাতাদের সহিত নারায়ণগঞ্জে আসিয়া সাক্ষাৎ করিয়া জানাইলেন যে, যদি তিনি এক বৎসরের মধ্যে যে মূল্যে রায় ভ্রাতৃগণ সম্পত্তি ক্রয় করিয়াছেন তাহা দিতে পারেন তাহা হইলে তাঁহারা সম্পত্তি তাঁহাকে প্রত্যার্পণ করিবেন কি-না। ভ্রাতৃগণ বলিলেন যে, আপনি সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন আমরা এক বৎসরের মধ্যে সম্পত্তি দখল করিব না, আপনার নিকট আমরা সুদ চাহি না, কেবল মাত্র টাকাটা দিতে পারিলেই সম্পত্তিও প্রত্যার্পণ করিব। বৃদ্ধের আশা পূর্ণ হইল না। জহুরুদ্দীন চৌধুরী টাকা সংগ্রহ করিতে পারিলেন না। সম্পত্তি কুণ্ডুদেরই রহিয়া গেল।’ (বিক্রমপুর বিবরণী, পৃ-৭১)

চলবে...

বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি
বই

ছয় ঋতুর এই দেশে বর্ষাঋতু ছাড়াও যে ঝুম বৃষ্টির অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে তা এমরান কবিরের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থবৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনিনা পড়লে বোঝাই যেত না বর্ষার সময় ঝুম বৃষ্টিতে বারান্দায় বসে বই পড়লে যেমন অজান্তেই বৃষ্টির গতিময় ফোঁটা শরীরে পড়ে, শিহরণ জাগে আর নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয় মনএমরান কবিরের এই কাব্যপাঠে সে রকমই অভিজ্ঞতা হলো শব্দের মেঘেও যে বৃষ্টির ছটা থাকে তাও বুঝিয়ে দিল মেঘে গর্জন নেই তবে বর্ষণ আছে ফ্ল্যাপ থেকেই শুরু হয়েছে মেঘের ঘনঘটা, ‘তোমার ভূগোলে আসার পর/ ভেবে দেখ/ কীরূপ ছিল আমার জয়োল্লাস/ আজ ভূগোলের গোলে/ থামিয়ে রেখেছি গান/ ফেরার পথে নিয়ে যাব/ তোমার না-দেখানো-/ বৃষ্টির সোনালি আগুন/ যার জন্য অনেক আগেই আমি/ হয়েছিলাম খুন পুরো কাব্যে যেন এই শৈল্পিক খুনেরই প্রতিধ্বনি

এই বইয়ের উৎসমুখে একটি গদ্য শোভা পেয়েছে সেখানে লিখেছেন তিনি, ‘কোনো ঋতুই আমাদের কাছে পুরাতন হয়ে আসে না যতবারই আসে ততবারই যেন নতুন যেন ছন্দের সাথে ছন্দের সহবাস

কবিতায় বলেছেন তিনি, ‘বাতাস তখন আগুন আগুন,/ পলকে পলকে তার রমণীয় শিখা!’ বৃষ্টির আগে বাতাসের কাছে গ্রীষ্মের যে তীব্রতা তা কবি রমণীয় শিখার সঙ্গে তুলনা করেছেনমেঘ মেঘ গল্পকবিতাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে  মনে ভেসে ওঠে, ‘বনের ভেতর বন, তাহার ভেতর পালকের গান, উড়ন্ত উচ্ছল তার নয়নের আসমান’–কী শৈল্পিক ছোঁয়ায় তিনি বর্ষাকে জীবন্ত করে তুলেছেন

বাংলার প্রকৃতি, বাংলার মানুষ, বাংলার বর্ষাকে তিনি যেন শব্দের ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন এভাবে বাংলার মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়া, বর্ষার বৃষ্টি গায়ে মেখে বড় হওয়া এক জলময় চিরায়ত রোমাঞ্চকর বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছে, ‘বৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনি কবিতাগুলো

প্রায় প্রতিটি কবিতায় বর্ষার সঙ্গে এক রহস্যের চাঁদমুখ হয়ে ধরা পড়বে একটা চরিত্রঅধ্যাপিকা কে এই অধ্যাপিকা? তিনি বইটি উৎসর্গও করেছেন সেই অধ্যাপিকাকে অথচ তাকে সুনির্দিষ্ট করা দুরূহ বর্ষায় যেমন মেঘ থাকে, ঝড় থাকে, বৃষ্টি থাকে, বন্যা থাকে, বনের ভেতর হারিয়ে যাওয়া পথ থাকে, বৃক্ষের সঙ্গে বৃষ্টির অজ্ঞাত গল্প থাকে, ঠিক তেমনি কাব্যের বর্ণনায়, শব্দে, ভাবে চরিত্র বর্ষার মতোই রহস্য-রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে! কি জলকন্যা? একি বৃষ্টিবিলাসী নারী? কি কাব্যের পূর্ণতা? নাকি প্রকৃতির রূপক? নাকি কবির মনে সদা জেগে থাকা এক সৌন্দর্যের অনুপম মুখ? আবিষ্কারের জন্য পড়তে পড়তে বই শেষ হবে, রহস্যের শেষ হবে না, ‘অধ্যাপিকা,/ আপনি তো খুউব/ সরল অঙ্কের মতো/ তুমুল বৃষ্টিবাহিকা!’ কিংবাসবাই তো ছাত্র, রোদে রোদে থাকি বিস্মিত পাঠে/ তাপে তাপে বাষ্পীয় উত্তাপে, জানতে পারিনি একা/ আপনি এমন মেঘের মতোন উচ্ছল গায়িকা/ এমন ভেজা গান, গেয়ে যান/ ভিজে যায়/ সমস্ত অববাহিকা

মিথ মৈথুনকবিতায় তিনি আরও গাঢ় রহস্যের শ্যামল বনে বৃষ্টির ফোঁটার মতো করে বলে উঠলেন, ‘তার চেয়ে, অধ্যাপিকা/ সবুজ ঘাসের পাশে হাঁটতে থাকুন ধীরে/ আর তাকিয়ে দেখুন বারবার, কী যে অপরূপ রূপ বরষার

বর্ষার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বর্ষার জলে ভেজা ভেজা পথে চলতে থাকা এই নিগুঢ় প্রতীকী চরিত্রটি বর্ষাকে সবাই উপলব্ধি করলেও কবি এমরান কবিরের কাব্য যেন বর্ষার স্বচ্ছ আয়না; অতীত, বর্তমান, দেখা-অদেখা সব একসঙ্গে অধ্যাপিকার  প্রতিটি চরণে, শাড়ির ভাঁজে এসে পাঠক হৃদয়ে ভর করে

মাঠ-ঘাট, জলে ভরা নদী, দিঘি, কূলভাঙা নদী বেয়ে গেয়ে যাওয়া বর্ষার সুখের মাঝি, কাদাময় পথ, বৃষ্টির আলিঙ্গন, বর্ষায় অভাবি গৃহিণীর অনাহারে থাকা, জলে পাতিহাঁসের মতো অবাধ গোসল করা শিশুর দল, ঘরের কোনে নিভৃতে একাকি দুটো মনের এক শরীর হওয়ার রহস্যের খেলাসবই আছে কাব্যে

কাব্যে ছোট ছোট কবিতা থাকলেও শেষে আত্মমগ্ন বীজের প্রত্ন ধারাপাত শিরোনামীয় একটি দীর্ঘ কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে ৩০০ চরণেরও অধিক কবিতা পাঠককে এক অভূতপূর্ব শিল্পআস্বাদনের অভিজ্ঞতা দেবে, ‘একদম নিঃশব্দ একাকিনী/ একান্তে দাঁড়িয়ে, একান্তে শুধু/ তিনি শুদ্ধতম একাকিনী/ আঁচল কোমরে গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকেন মাঠে/ সেই সবুজ কৃষাণী

বর্ষার বিপুল, বিস্তৃত বহুমুখী চরিত্র অবদানের সঙ্গে যেমন বহুবিধ আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে তেমনি দীর্ঘ কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষাণীবাংলার চিরায়ত মাতৃরূপিণী অবয়ব তিনি মমতায় সংগ্রামে, শ্রমে শ্রান্তিতে, ত্যাগে তিতিক্ষায়, ভালোবাসায় রুক্ষতায় এক-একক-অদ্বিতীয় তিনি চির বিজয়িনী ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়া ইমারতের মতো হলেও বাইরে তার হাসির ছটাযেন পাকা ধান

আমরা জানি বৃষ্টি আমাদের এই অঞ্চলের কৃষি, সভ্যতা সংস্কৃতির কতটাজুড়ে রয়েছে দীর্ঘ কবিতাটিতে তা উঠে এসেছে দারুণভাবে কবিতাটিতে রয়েছে অদ্ভুত আত্মগীতি রয়েছে মায়া মোহনার কথা, নরম মাটি কৃষাণ-কৃষাণীর নরম হৃদয়ের কথা, রয়েছে ধান গানের কথা উৎপাদন আর জেগে উঠবার কথাও সবচেয়ে রয়েছে এক অপরূপ সম্ভাবনার কথা সব মিলয়ে বৃষ্টির সঙ্গে আমাদের রোমান্টিকতা আর চিরায়ত বাংলার সম্বন্ধসূত্র উঠে এসেছে যার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে আমাদের কৃষি, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংগ্রাম, প্রেম, কাম আর আর্থ-সামাজিক অবস্থা

কৃষাণী, নাকি অধ্যাপিকাকে বড় হয়ে বর্ষার চির ছায়া হয়ে থাকবে, মেঘের কোলে রহস্য হয়ে থাকবে তা অনুভব করতে এই কাব্য পাঠের বিকল্প নেই! বর্ষা আসবে বারবার কিন্তু কাব্যিক খুনির বিচার হবে না

সৈয়দ আলী আহসান প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২২ পিএম
প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

আমি তখন নবম বা দশম শ্রেণির ছাত্র আমাদেরলজিং টিচারকলেজে পড়েন একদিন তিনি জানালেন তাদের কলেজে একটি অনুষ্ঠান হবে, এতে যোগ দেবেন দেশের একজন বিখ্যাত কবি আমার মন খুব চাইছে কলেজের অনুষ্ঠানে যেতে

মাথার মধ্যে লেখালেখির পোকা নিঃশব্দে ওড়াউড়ি করে কাকপক্ষীও যেন টের না পায়, গোপনে কাগজকলম নিয়ে বসি লিখি কী লিখি জানি না একজন বিখ্যাত কবিকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা যায় নালজিং সারকে খুব করে ধরলাম সার রাজিতার সঙ্গে অনুষ্ঠানে যাব কিন্তু বাবার অনুমতি লাগবে আমার বাবা কড়া মানুষ এমনিতে কোথাও যেতে দেন না কিন্তু আমার আবদারে রজি হলেন আমার সে কী আনন্দ!

হলভর্তি লোক ছাত্রছারা তো আছেই অভিভাবক, স্থানীয় গন্যমান্য অনেকেই উপস্থিত ভাগ্য ভালো, মঞ্চের কাছাকাছি বসার জায়গা পেয়ে গেলাম অনুষ্ঠানের মধ্যমণি দেশের বিখ্যাত কবি সৈয়দ আলী আহসান মুখে চাপদাড়ি, পোশাকে পরিপাটি তিনি যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন, পুরো হল নীরব তিনি দীর্ঘ সময় বক্তৃতা করলেন কঠিন কঠিন বিষয় তার অনেক কথাই মাথায় ঢোকেনি ঢোকার কথাও নয় তার বাচনভঙ্গি খুবই আকর্ষণীয় বুঝি আর না বুঝি শুনতে ভালো লাগছে আমার মুগ্ধতাসামনাসামনি একজন কবিকে দেখছি খেয়াল করলাম, তিনি দুটি চশমা ব্যবহার করছেন একটা খুলে আর একটা পরছেন, সেটাও বদলাচ্ছেন কারণ কী! অনেক পরে জেনেছি, কাছে এবং দূরে দেখার জন্য আলাদা চশমা দরকার হয়

দীর্ঘ বক্তৃতা শেষে কবি নিজের লেখা কবিতা শোনালেন এই প্রথম মনে একটা খটকা লাগল, এটা আবার কেমন কবিতা!? পাঠ্যবইয়ে যে কবিতা পড়ি, এটা তো সেরকম না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালএদের কবিতা পড়লে বা শুনলে মনে কেমন দোলা লাগে, এই কবির কবিতায় তেমন দোলা নেই

যাই হোক, কবিতা বুঝতে না পারলেও কবিকে ভালো লেগেছে সব থেকে বড় কথা একজন কবিকে জীবনে প্রথম সামনাসামনি দেখা! কবি সেদিন যে কবিতাটি পড়েছিলেন, নামআমার পূর্ব বাংলা

পরবর্তীত, কলেজের পাঠ্যসূচিতে সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল পড়তে হয়েছে, ক্লাসে এটা নিয়ে স্যারের বক্তৃতা শুনতে হয়েছে, পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে হয়েছে আগে আমাদের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতায় ছিল ছন্দমিলের কবিতা আগেই উল্লেখ করেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, জসীমউদ্দীনের কবিতায় চরণান্তেমিল’-এর বিষয়টি প্রথম দেখলাম চরণান্তে মিল নেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায় ক্লাসে স্যার বললেন, এটা অমিত্রাক্ষর ছন্দ শিখলাম চরণান্তের মিল ছাড়াও কবিতা হয় স্যার আরও বললেন, মাইকেলের প্রায় কবিতাই ১৪ মাত্রার চরণে লেখা ১৪ মাত্রা মানে ১৪টি অক্ষর গুনে গুনে দেখলাম, তাই তো! প্রতি চরণে ১৪টি অক্ষরই তো আছে স্যার মাত্রা পর্ব সম্বন্ধেও বললেন ১৪ অক্ষর মানে ১৪ মাত্রা এই ১৪ মাত্রার চরণ আবার দুই ভাগে বিভক্ত প্রথম ভাগে মাত্রা, পরের ভাগে মাত্রা, এই হলো ১৪ শিখলাম মাত্রা আর পর্ব

এই সামান্য জ্ঞান নিয়ে সৈয়দ আলী আহসানের  আমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি দেখার চেষ্টা করলাম কবিতাটি এরকম

আমার পূর্ব বাংলা এক গুচ্ছ স্নিগ্ধ,

       অন্ধকারের তমাল

অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়,

      একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ

সন্ধ্যার উন্মেষের মতে

সরোবরে অতলের মতো

কালো-কেশ সঞ্চয়ের মতো

বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি

আমার পূর্ব বাংলা বর্ষার অন্ধকারে অনুরাগ

ঘুমের অলসতায় চোখ বুঁজে আসার মতো শান্তি

হৃদয় ছুঁয়ে-যাওয়া স্নিগ্ধ নীলাম্বরী

(অংশবিশেষ)

 কবিতার বিষয় দেশানুরাগ গভীর মুগ্ধ অনুভবে দেশকে দেখা গদ্য-ছন্দে লেখা অন্তমিল তো নেই-, নেই মাত্রা পর্ব-সমতা আঁটোসাঁটোভাবে কাব্যালংকার না মেনেও যে উল্লেখযোগ্য কবিতা হতে পারে, সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাএর একটি উদাহরণ

 

দুই.

লেখালেখির এই জীবনে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কারও সঙ্গে কালেভদ্রে, কারও সঙ্গে মাঝেমাঝে, কারও সঙ্গে প্রায় নিত্য দেখাসাক্ষাৎ হয় সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল মাঝেমাঝে, প্রয়োজনে কেউ কেউ যেমন করেন, বয়সের দেওয়াল তুলে অনুজদের একটু দূরেই রাখেন সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মানুষ অনুজদের তিনি সহজ আনন্দে গ্রহণ করতেন

একবার হলো কী, আমি রেডিওতে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম শাহবাগ তখন রেডিওর প্রধান কেন্দ্র উপস্থিত হয়ে দেখি আমি যাদের সঙ্গে কবিতা পড়ব, তারা সবাই দেশের খ্যাতিমান কবি, আমি একমাত্র কবিযশঃপ্রার্থী তরুণ এক-দুজন তো তাচ্ছিল্য করল আমি মেনে নিয়েছি কারও কারও খ্যাতির অহংকার তো থাকতেই পারে রেওয়াজ অনুযায়ী অনুষ্ঠানের শেষ পর্ব পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সৈয়দ আলী আহসান সেদিন আমার লেখার মৃদু প্রশংসাই করেছিলেন

বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দ আলী আহসানের গ্রন্থসংখ্যা অনেক শুধু সংখ্যা বিচারে নয়, বিষয়-বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ এর মধ্যে একটি বইয়ের কথা এখানে উল্লেখ করছি বইটির নামপ্রেম যেখানে সর্বস্ব উল্লেখ করার কারণ, এই বইটির আমিআঁতুড়-সাক্ষী

আমি তখন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় যুক্ত ওই কাগজে সৈয়দ আলী আহসানের আনেক লেখা ছাপা হয়েছে যখনই চেয়েছি, সৈয়দ আলী আহসান লেখা দিয়েছেন তবে লেখাটি তৈরি হতোশ্রুতিলিখনপদ্ধতিতে

প্রেম যখানে সর্বস্বএকটি সংকলন গ্রন্থ এই সংকলন গ্রন্থের প্রায় সবকটি লেখারই আমি ছিলামশ্রুতি লেখক নির্দিষ্ট সময়ে যেতাম সৈয়দ আলী আহসানের কলাবাগান এলাকার বাসায় তিনি আগে থেকেই যেন প্রস্তুত থাকতেন আমি খাতাকলম নিয়ে বসতাম তিনি চোখ বুঁজে বলতেনধীর গতি, স্পষ্ট উচ্চারণ হাতের কাছে কোনোরেফারেন্সনেই তিনি বলে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট সব তথ্যই তার মুখস্থ লেখার শেষ বাক্যটি বলে চোখ খুলতেন, বলতেন, চলবে তো? মননশীল আধুনিক কাব্যবোধ, চিত্রকলা, প্রেমানুভূতির বহুমাত্রিকতা ছিল লেখাগুলোর বিষয় ফরাসি সাহিত্যের আনুপূর্বিক খুঁটিনাটি, শিল্পকলার বাহ্যিক সৌন্দর্য অন্তর-ঐশ্বর্য তার ওইসব লেখায় বিস্তৃত চিত্রশিল্প বা ভাস্কর্য বিশ্লেষণেনারীবিষয়টি সৈয়দ আলী আহসানের লেখায় বিস্তৃত নতুন মাত্রা পেত বিশেষ করে নারীশরীরের সৌন্দর্য মাহাত্ম্য বর্ণনায় তার ভাষা-প্রাঞ্জলতায় শিল্পচেতনারূপ দ্যুতি ছড়াত

অসংকোচেই বলি, শ্রুতিলেখক হিসেবে আমি বেশ আনন্দই পেতাম

গ্রন্থকথা মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়
বই

একটি সুন্দর জাতি গঠন করতে হলে অবশ্যই বই পড়তে হবে বই মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায় আমেরিকান কবি জেমস রাসেল বলেছেন, ‘বই হলো এমন এক মৌমাছি যা অন্যদের সুন্দর মন থেকে মধু সংগ্রহ করে পাঠকের জন্য নিয়ে আসে প্রসঙ্গে দুঃখ করে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘আমাদের দেশের লোক বই পড়েন বটে, কিন্তু পয়সা খরচ করে কিনে পড়েন না’…

আশির দশকের শেষপ্রান্তের কবি শামীম আহমদের এগারোতম কবিতার বইটি এবারের বইমেলায় এসেছে গ্রন্থে ছাপ্পান্নটি কবিতার পাঠোদ্ধার করা গেল তবে, শামীম আহমদের কবিতা স্বপ্রণোদিতভাবে একটি ভিন্ন পরিচয় নিয়ে আসে, তার কবিতা যারা নিয়মিত পড়েন তাদের কাছে সেটা উন্মোচিত হয় তার কবিতায় অসংখ্য পাশ্চাত্য প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প ব্যবহার হয় এবং বেশ দক্ষভাবে তবে বর্তমান আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে এই স্বাভাবিক প্রবণতার স্বল্পতা লক্ষণীয় এবং কেন যেন কবি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে কবিতাগুলো লিখেছেন এবং বেশ সহজভাবে প্রকাশ করেছেনযেখানে শুধু বানিয়ার বাণিজ্য বিতানে/ বোধের বাণিজ্য হয় দেশাত্ববোধের মোড়কে,/ এই চটকদার বিজ্ঞাপনে/ আমি ভুলে যাই জন্মমূল মায়ের জঠরের সুতীব্র আর্তনাদ’ (আমি মাতৃভূমি: পৃ-৪৮)জংধরা জ্যোৎস্না দেখে প্রফুল্ল হওয়া নিরেট মূর্খতা/ এর চেয়ে মোমবৃক্ষের আলো নিষ্পাপ পবিত্র/ নিজকে পুড়িয়ে লীন হয়ে যায়/ আঁধারের যবনিকাপাতে’ (বর্তমান তারুণ্যের প্রতি: পৃ-৩৮) কবি universal true চাঁদের আলোকেও আজকের দেশ সমাজের অধোগতি দেখে পুরো ক্রোধে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেনরূপকের এই দেশে আমি বড্ড সন্দিহানপ্রতিকী আলখেল্লায়, দূর্যোধনের তীরের মতো/ চিকচিক করে দৃষ্টির ফলা/ কখন যে আঁচড়ে পড়ে মৃত্যুর সওদা নিয়ে কে জানে’ (সফেদ হাঙ্গর: পৃ-৪৬) চারপাশের অবক্ষয় দেখে কবি সন্দিহান কখন যে সমাজ, জনপদ কুজনের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তা কবি দিব্যদৃষ্টিতে foresee করতে পারছেন নিবেদিতপ্রাণ কবিই সমাজের এই অধঃপাত দেখতে পারেন কারণ কবি শিষ্টজন তিনি বলে ওঠেন, ‘হে বন্ধু আমার, তুমি কি দেখো নৈসর্গিক বিলাস?/ আমি সব দেখে চোখ বুজি/ নৈষ্ঠিক ঋষির মতো/ বুকের গভীরে পুঁতে রাখি আরাধনার বীজ’ (নৈষ্ঠিক ঋষি: পৃ-৪৭)ডানাভাঙা পায়রা/ হাওয়ায় খুঁজে ফেরে আঁততায়ীর মুখ.../ রোদের গায়ে কান্না, লেগেছিল রক্তের দাগ আজ মনে হয় সময়ের স্রোতে/ মিশে যাচ্ছে সব স্মৃতি’ (আঁততায়ীর মুখ: পৃ-৬২)

শামীম আহমদের কবিতার একজন নিয়মিত পাঠক হিসেবেই বলা যায়, তার কবিতায় থাকে প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি যা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তিনি প্রয়োগ করেন, যা অনেক বোদ্ধা কবির কাছেও ঈর্ষণীয় হয়ে দাঁড়ায় কিন্তু কাব্যের সামগ্রিক ছাপ্পান্নটি কবিতা পড়লে মনে হয় কবি চটজলদি কবিতাগুলো লিখে ফেলেছেন যার কাছে কবিতা লেখার সময় শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ, শহীদ কাদরী এসে টেবিলের চারধারে ঘিরে ধরেন, তার কাছ থেকে এত চটজলদি কবিতাগ্রন্থ পাঠক কামনা করে না এমনও হতে পারে দেশ সামাজিক পরিবেশের সাম্প্রতিক দৈনতা তাকে ক্রুদ্ধ করে তুলেছে তবুও তার কবিতা এক অনন্যতার জন্য আমাদের চিন্তাজগৎকে আচ্ছন্ন করে

সিলেটের ভাস্কর প্রকাশন মুদ্রণে রাজধানীর সেরা প্রকাশনকেও হার মানিয়েছে প্রচ্ছদ অত্যন্ত সুন্দর অঙ্কন করেছেন আল নোমান

কবিতা অনুবাদ হয় না মানুষের

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
অনুবাদ হয় না মানুষের

সব মানুষই পরিব্রাজক

পানিপথের যুদ্ধ থেকে

            বিসমিল্লাহ খাঁর সানাই পর্যন্ত

 

যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ছেড়ে

কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে

কার্তুজও জানে

            কখনো না কখনো জাগতে হবে

 

জন্মসূত্রেই মানুষ শিখেছে হানাহানি

প্রয়োগও করছে

            প্রেমে কিংবা রাষ্ট্রতন্ত্রে

 

            মানুষ কখনোই অনূদিত নয়...

কবিতা স্মৃতির ভেতর

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০১ পিএম
স্মৃতির ভেতর

যে ঢেউ ঘুমায় না সমুদ্রের মন্থর বুকে, পাশ ফিরে খোঁজে সমসূত্র-ছেঁড়া ফেরারি ঢেউ; তার মতো একাকী রাত জেগে আছি বুকের উঠোনে সুতীব্র বেদনার মাশরুম ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ে, চিতার কালো জোছনা ঝরে পড়ে নখরে নখরে

 

হরিণখোলা মুণ্ডেশ্বরীর জলে যে দেহাতি সন্ধ্যা বিসর্জন-বিসর্জন খেলে, তুমি তার মতো আমাকে বিসর্জন দিয়ে গেছ এই স্যাঁতসেঁতে শহরে কতকাল শাদা পালকের তারাদের কোন্ডর পাখিদের মতো ডানা মেলে নামতে দেখিনি শালিকদের চরাচরে

 

আহা, কী নিখুঁত পরিকল্পনা তোমার! তবুও আতপচালের গন্ধমাখা স্মৃতির ভেতর

সোনামুখী সুই দিয়ে সেলাই করে যাব ছেঁড়া ছেঁড়া মায়ার কাহন