ষষ্ঠ পর্ব
সিদ্দিক স্যার কেবল যে তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন তা নয়, হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধও গড়ে তুলেছিলেন। ইছামতী নদী দিয়ে লঞ্চে করে যাচ্ছিল হানাদারদের একটি দল; তার নেতৃত্বে গুলি ছুড়ে লঞ্চটিকে বিকল করে দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, নিজের এক পুত্রকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। দশম শ্রেণির ছাত্র তরুণ যোদ্ধাটি সম্মুখযুদ্ধে আহত হয়। পরে চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাকে ডেনমার্কে পাঠানো হয়েছিল।
আমরা যখন গ্রামে শহরে তখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। সে আন্দোলনের তরঙ্গ আমাদের ওই প্রান্তিক গ্রামেও এসে পৌঁছেছিল। আমাদেরই এক আত্মীয়, আবদুল জলিল খান, পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাকে আমরা অত্যন্ত সজ্জন ও পরোপকারী বলে জানতাম। অকৃতদার ছিলেন; সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন সামাজিক কাজে। কর্তব্যনিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের দিক থেকে তিনিও ছিলেন সিদ্দিক স্যারেরই সমতুল্য। স্যারের মতোই তিনিও ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতেন। গ্রামের ওই প্রাইমারি স্কুলটি স্থাপন মূলত তার উদ্যোগেই সম্ভব হয়েছিল। দৈনিক আজাদ পত্রিকার তিনি স্থানীয় সংবাদদাতা ছিলেন; পত্রিকার এক কপি তার কাছে আসত। গ্রামে তিনি মুকুল ফৌজের শাখা গড়েছিলেন। সিদ্দিক স্যারের মতোই আমাদের এ আত্মীয়টিও আমার চোখে একজন ‘বীর’ই ছিলেন।
কিন্তু হায়, জলিল ভাইয়ের (পারিবারিকভাবে তাকে আমরা ভাই বলেই জানতাম) সঙ্গে সিদ্দিক স্যারের দূরত্বটা বোঝা গেল একাত্তরে, মুক্তিযুদ্ধের সময়। হানাদাররা যখন গণহত্যা শুরু করল তখন নিজের বিবেকের পরিচালনায় এবং পাকিস্তানের বিমান বাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণে সিদ্দিক স্যারের পক্ষে মোটেই সময় লাগেনি এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে জাতি হিসেবে বাঙালির পক্ষে টিকে থাকাটা একেবারেই অসম্ভব। অতি দ্রুত তিনি যোগ দিলেন যুদ্ধে। আর আমাদের প্রিয় জলিল ভাই কী করলেন? তিনি করেছেন উল্টো কাজ। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদে সেই যে আস্থা স্থাপন করেছিলেন চল্লিশের দশকে সেখানেই তিনি অটল-অনড় রয়ে গেলেন। শোনা গেল তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন রাও ফরমান আলী-টিক্কা খানদের উদ্ভাবিত শান্তি কমিটি গঠনে। পরিণতিতে যা ঘটবার তাই ঘটল। ষোলোই ডিসেম্বরের আগেই মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা তার বাড়িতে তাঁকে খুঁজতে গেল। টের পেয়ে তিনি আগেভাগেই বাড়ি ছেড়েছিলেন এবং অন্য কোথাও আশ্রয় না পেয়ে নৌকা নিয়ে চলে গিয়েছিলেন আড়িয়ল বিলে। সেখানে তিনি ধৃত ও নিহত হন। দুষ্প্রাপ্য কর্মশক্তির অতি করুণ এক অপচয় ঘটল। আমাদের সবার জন্য অসামান্য রকমের উপকারী হতো ওই দুজন মানুষ যদি একসঙ্গে কাজ করতে পারতেন। কিন্তু সেই মিলন তো হওয়া সম্ভব ছিল না। রাষ্ট্র তা অসম্ভব করে তুলেছিল। ব্রিটিশের রাষ্ট্র তাদের বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা করেছে, সাম্প্রদায়িকতা তো ব্রিটিশেরই সৃষ্টি। রাষ্ট্র সাতচল্লিশে দেশভাগ ঘটিয়েছে। কিন্তু ওই রাষ্ট্র যা করতে পারেনি, পাকিস্তানি রাষ্ট্র সেটাই করল; জলিল ভাই এবং সিদ্দিক স্যারকে কেবল যে পৃথক করে দিল তা-ই নয়, ঘোরতর শত্রুও করে দিল পরস্পরের। রাষ্ট্রের হস্ত সত্যি প্রশস্ত।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধের মধ্যদিয়ে যে সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে বলে সিদ্দিক স্যার আশা করেছিলেন, সেটা ঘটেনি। কারণ রাষ্ট্র ভাঙলেও আসলে বদলায়নি এবং আগের চেয়েও নিষ্ঠুর রূপ নিয়েছে। আর আবদুল জলিল খানরা যে ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবার অঙ্গীকার করেছিলেন, সে ব্যবস্থাও টেকেনি; কারণ পাকিস্তানি রাষ্ট্র নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। পাকিস্তানি রাষ্ট্র ছিল জনবিরোধী, জনমুক্তির বিপক্ষ শক্তি। বাংলাদেশি রাষ্ট্রও অবশ্য ব্যর্থ হয়েছে জনমুক্তির শক্তি হতে।
মন্বন্তরে গ্রামে আত্মহত্যার ঘটনার কথা বলছিলাম। কেবল সেটি হবে কেন, নানা ধরনের অসংখ্য প্রতীক তখন ভাসমান ছিল। ১৯৪৩-এর পরে রাজশাহীতে থাকতে গিয়ে একটি জীবন্ত প্রতীকের মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা। প্রতীকটি একটি ছোট্ট মেয়ে। জঙ্গলের মতো একটা জায়গায় একাকী বসে ফ্রক পরা জীর্ণশীর্ণ মেয়েটি অঝোরে কাঁদছিল। চিৎকার করবে এমন শক্তিও তার অবশিষ্ট ছিল না। ওদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। আমার মাকে খণ্ডকালীন সাহায্য করতেন যে মহিলা শিশুটিকে তিনি দেখতে পান। দেখে তার ভারি মায়া হয়। নিজের ঘরে যে আশ্রয় দেবেন সে ক্ষমতা তার ছিল না। হাতে ধরে হাঁটিয়ে মেয়েটিকে তিনি নিয়ে এসেছিলেন আমার মায়ের কাছে। জানতে চেয়েছিলেন ওকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব কি না। মেয়েটি গুছিয়ে কিছুই বলতে পারছিল না। যেটুকু জানা গেল তা হলো অন্য কেউ নয়, তার নিজের বাবা-মা-ই তাকে ওখানে রেখে চলে গেছেন। অভাবের নিদারুণ তাড়নায়। স্বভাবতই আমার মা তাকে রেখে দিয়েছিলেন। এবং সেই যে রইল, তার পর থেকে সে আমাদের সঙ্গেই থেকেছে। আমরা বাসা বদল করেছি, শহর বদল করেছি, কিন্তু সে আমার মায়ের সঙ্গ ছাড়েনি। মা তার বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন, তার দুটি সন্তানও জন্ম নিয়েছে; কিন্তু স্বামীর বাড়িতে সে যায়নি, আমার মায়ের বাড়িকেই সে নিজের বাড়ি করে নিয়েছে। কুড়িয়ে পাওয়া গিয়েছিল বলে তাৎক্ষণিকভাবে তার নাম রাখা হয়েছিল কুড়ানি; ওই নামই রয়ে গেছে। আমার ছোট ভাইবোনরা তাকে ‘কুড়ানি বুজি’ বলত এবং আপন বোনের মতোই দেখত। আমার মা মারা গেলেন ২০০৯ সালে; কুড়ানি মারা গেছে মায়ের মৃত্যুর দুই বছর আগে। না, তার জন্মপরিচয় কেউ জানতে পারেনি। জানতে অবশ্য চায়ওনি, যেন পরিবারেই এক সদস্য সে। মন্বন্তর তাকে উৎপাটিত ও আশ্রয়হীন করেছে, যেমন করেছে লাখ লাখ মানুষকে। তার ক্রন্দন কোনো একটি মাত্র শিশুর ক্রন্দন ছিল না, ছিল তা লাখ লাখ শিশুর ক্রন্দন। ক্রন্দন তো থামেনি; ওই একই ক্রন্দন গাজার শিশুরা এখন কাঁদছে, জায়নবাদী ইসরায়েলের অতিনৃশংস অস্ত্রাঘাতে। কাঁদছে বাংলাদেশের অভুক্ত শিশুরাও।
তা কুড়ানির মতো আমার আব্বাও তো এতিম ছিলেন। কিন্তু তার অবস্থার সঙ্গে পরিত্যক্ত, পরিচয়বিহীন এই শিশুটির অনাথদশার তো কোনো তুলনা হয় না। মূল পার্থক্যটা অবশ্য শ্রেণিগত। শিশুটির বাবা-মা নিশ্চয় হতদরিদ্র ছিলেন; নিজেদের আহার জোটেনি, শিশুটিকে অভুক্ত রেখেছেন, ভয় পাচ্ছিলেন অনাহারে সে মারাই যাবে। তাকে জঙ্গলে রেখে গেছিলেন, দয়া করে কেউ যদি নিয়ে যায় তবে হয়তো বেঁচে যাবে। শিশুটি বেঁচে গিয়েছিল, তার বাবা-মা হয়তো বাঁচেননি। এটি তো কোনো রূপকথা নয়, লাখ লাখ বাস্তবিক সত্যের একটি মাত্র। বাস্তবে বাংলায় তখন যা ঘটেছিল তা দুর্ভিক্ষ নয়, ভয়াবহ এক মন্বন্তর। ওই রকমেরই একটি মন্বন্তর ঘটেছিল ইংরেজরা যখন বাংলা দখল করে তখন, ১৭৭০ সালে, যাতে দেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারায়। ঔপনিবেশিক ওই শাসকদের আগমনাগমন একইভাবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
চলবে...
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়