মেজর জামশেদ বাংলোর দখল নিয়েছে, ম্যানেজারকে বউ-বাচ্চাসমেত গুলি করে মেরেছে। চা-বাগানের শ্রমিকরা চেনে ভগবান নোয়াতিকে। এই মেজর এসে বুঝিয়ে দিচ্ছে, ভগবান না, পাকিস্তানি পালোয়ানের হাতেই দুনিয়ার সক্কল ক্ষমতা। ক্ষণে ক্ষণে হুংকার ছাড়ছে, ‘শালা কাফেরের বাচ্চা! কালা আদমি! সব শালাকো হামি...’
বাংলোর উঠোনে হাত-পা বাঁধা ১৩০ জন কামলা। বেশির ভাগই পাতিয়ালি মেয়েরা। বারো-তেরো বছর থেকে শুরু করে আশি-নব্বই পর্যন্ত। মনে মনে ছটফট করে এরা। উ শালা বলে কী! ভগবানের রং কি কালা নয়?
মেজর চোখ কুঁচকে তাকাচ্ছে এদের দিকে আর গোঁফে আদরের হাত বোলাচ্ছে। কালা লাড়কিদের কীভাবে ভোগে লাগাবে আর কাফেরের বাচ্চাগুলোকে কীভাবে মারবে, তা-ই ভাবছে। মেজরের খুব ক্লান্ত লাগছে এদের দেখে। এই নোংরা কালো মানুষগুলোকে গুলি করলে লাল রক্ত বেরোবে কি? পঁয়ষট্টি সালের দিকে একবার এদিকে এসেছিল সে। তখন শুনেছে এই কালোগুলো কী সব ঝাঁড়ফুঁকে বিশ্বাসী। আরও যেন কীসব শুনেছে... ঠিক আছে, ওসব দেখা যাবে। কথা বের করতে মেজর ওস্তাদ। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। আহা! যদি গরুর মাংসের সঙ্গে মোটা রুটি খাওয়া যেত! এই শুয়োরের বাচ্চাগুলো গরু পোষে না, শুয়োর পোষে, মুরগি পোষে। শুধু মুরগিতে তো খিদে মিটছে না। মুসলমান হয়ে কী করে শুয়োর খাবে মেজর? বাঙালরা সাচ্চা মুসলমান না, ভারতের দালাল, জ্যান্ত কাফের। আব্দুস সোবহানকে জিজ্ঞেস করে দেখা যাক্ বাঙালরা শুয়োর খায় কি না!
রাজাকার আব্দুস সোবহান বাংলা-উর্দুতে মিশিয়ে যা বলল, তাতে জামশেদ বুঝল, পেটুক বাঙালি শুয়োর খেলেও খেতে পারে। কিন্তু আব্দুস সোবহান ওসব হারাম জিনিস কখনো ছুঁয়েও দেখেনি।
ভাবনায় পড়ে মেজর। বাঙালিরা শুয়োর খায়! হতেও পারে। পঁয়ষট্টি সালে দেখেছে, বাঙালিরা হাজার রকমের খাবার খায়। ভারি চমৎকার রান্না রাঁধে এ দেশের মেয়েরা।
মেজরের সাত-পাঁচ ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল হঠাৎ করে। দূর থেকে ভেসে এল কী রকম এক তীক্ষ্ণ শিস। টানাটানা, কখনো করুণ কখনো ভয়ংকর। সন্ধ্যার আবছায়ার সঙ্গে মিশে শব্দটা যে কী ভৌতিক শোনাল! মেজরের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা পানির স্রোত নেমে গেল সরসর করে। আর এই যে আদিবাসীরা এতক্ষণ বসেছিল মাথা নিচু করে, হাঁটু ভেঙে কোনোমতে, এখন সবাই সজাগ। চোখ চকচক করছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে স্থির চোখে। সবার ফিসফিসানি মিলে মৌমাছির গুঞ্জনের মতো ঢেউ তুলল মেজরের কানে।
‘নোয়াতি!’
‘নোয়াতি!’
আব্দুস সোবহান বুঝিয়ে বলে নোয়াতি কে। চা-বাগানের দেবতা। পাহাড়ের কোনো একদিকে একটা গুহা আছে, যেটা এদের মন্দির। সেখানে রাখা কালো কষ্টিপাথরের নোয়াতির মূর্তি। মূর্তির মাথার মুকুটে নাকি মহামূল্যবান নীলাকান্ত পাথর আছে। লোকে বলে।
মেজর ভ্রু কুঁচকে ভাবে, শিস দেয় কে? নোয়াতি?
কালো মানুষগুলো ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে দূর পাহাড়ের দিকে। অনেক কাল আগে একবার মানুষ নোয়াতিকে পুজো দিতে ভুলে গিয়ে হাঁড়িয়া নিয়ে বসেছিল বলে নোয়াতি এভাবে শিস দিয়েছিল বলে বাপ-দাদাদের মুখে শুনেছে। ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল সবকিছু। নোয়াতি পরে আবার সব নতুন করে বানায়। নতুন মানুষ, নতুন পুজারি।
মানুষগুলো চেঁচিয়ে বলে, ‘ছেড়ে দে হামাদের! ছেড়ে দে!’
মেজর ভাবছে, ওই মূর্তিটা তার চাই। খোদ করাচিতে বাড়ি হবে, গাড়ি হবে, দেশ ছেড়ে বিদেশে এসে মশার কামড় খেয়ে মানুষ মারতে হবে না। কী শান্তির জীবন সামনে!
আব্দুস সোবহান ভাবছে, মূর্তির সঙ্গে আরও কিছু কি নেই? ওসব পেলেই আমার হবে। না হলে ম্যানেজারের পদটা তো পাব।
গোত্রের সব্বার পুজা চায় নোয়াতি। সব্বার! শিসের আওয়াজ আরও তীব্র হচ্ছে। কারও কথা ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। মানুষগুলো ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। হেঁচড়ে-পেঁচড়ে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে। দ্রুত হাতে জোগাড় করা গোটা পাঁচেক রক্তজবা, দুটো মিষ্টি- ব্যস, এই হচ্ছে নোয়াতির অর্ঘ্য। এরকম সামান্য উপহার নিয়ে এরা কখনোই যায় না নোয়াতির কাছে। দলের সবচেয়ে সামনে কুঁজো হয়ে হাঁটছেন গোত্র-প্রধান শুখ্যদা। বিড়বিড় করে জপছেন, ‘ভগবান নোয়াতি। রক্ষা করো! রক্ষা করো!’
ভরা পূর্ণিমার আভাস দিয়ে চাঁদ উঠেছে আকাশে। জ্যোৎস্নার আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে কালো কালো শরীর। সব মিলিয়ে কেমন যেন সবকিছু। মেজরের হঠাৎ ভয় লাগতে শুরু করে। এতক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল মানুষের এই অদ্ভুত শোভাযাত্রা। এক সময় দলবলসহ নিজেও হাঁটা দিয়েছে। মনের ভেতর শুধু নীলাকান্ত আর নীলাকান্ত।
সবাই সুশৃঙ্খলভাবে গুহার সামনে নত হয়ে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে বসলে শুখ্যদা পুরোহিত মতারার হাতে তুলে দিলেন অর্ঘ্য। মতারা সেগুলো নিয়ে গুহার অন্ধকারে ঢুকে যেতেই আবছায়া আঁধারের সুযোগ নিয়ে মেজরও ঢুকে পড়ল তার পেছন পেছন। মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে রাখা মানুষগুলো দেখল না। শুখ্যদা আশি বছর বয়সী চোখ দিয়ে এক গজ দূরের জিনিস ছাড়া আর কিছু কি দেখেন?
আব্দুস সোবহানও আল্লার নাম নিয়ে ঢুকে পড়ে। মেজরের অবর্তমানে হুকুমদারি করবে ক্যাপ্টেন রিসালাত মির্জা। তার মোটা গোঁফটা হেমন্তের হাওয়া লেগে উল্টেপাল্টে যায়। ওটা ঠিক করতে করতে সে ঠিক করল, এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনে তবে উপুড় হয়ে থাকা কাফেরদের ওপর গুলির প্র্যাকটিস করবে।
দূরে কোথাও ডেকে উঠল লক্ষ্মী পেঁচা। গুহার ভেতর সেই ডাক আছড়ে পড়ল আর মেজরও দেখল মূর্তিটাকে। দুই মিনিট পুরো বোবা হয়ে গেল। পাঞ্জাব-লাহোর-করাচির কোনো জাদুঘর এটা পেলে লুফে নেবে। ওদিকে পুরোহিত মতারা একফুট উঁচু মূর্তিটার পায়ের কাছে রাখল অর্ঘ্য। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো হালকা নীল আলো জ্বলে উঠল মুকুটের নীলাকান্ত পাথরে। আর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হলো শিস। কী আশ্চর্য!
মতারা নোয়াতির পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রার্থনা শুরু করেছে। মন্ত্রের সুরে বলছে, ‘হামাদের বাঁচা ভগবান! তোর দুনিয়াকে রক্ষা কর!’
মেজরের কঠিন এক লাথি খেয়ে উল্টে পড়ে গেল মতারা। যখন ফিরে তাকাল, মেজর দেখল শয়তান বুড়োটার কালো মুখে এক পাটি দাঁত বেরিয়ে আছে। দুনিয়ার সেরা আর্মির মেজরের সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে!
পুরোহিত হাসতে হাসতেই বলল, ‘নোয়াতিকে খ্যাপাস না সায়েব। ভালো হবেক লাই। আজ থেইকে হাজার চাঁদ আগে নোয়াতির ওপর লোভ করেছিল তোহার মতোই এক পাপী। নোয়াতি তাকে তার কাছে লিয়ে গেছে। তু তোর বাল-বাচ্চার কাছে ফিরে যা।’
মেজরের তখন কথা শোনার সময় নেই। সময় নেই আব্দুস সোবহানেরও। ফিসফিস করে বলল, ‘হুজুর, আপনি যা খুশি নিয়েন। তার পরে কিছু তো থাকবে পড়ে। সেটা কিন্তু আমার চাই।’
মতারা বলল, ‘ও বাঙালি বাবু! তু তো বেইমান আছিস! হামাদের অছুখবিছুখে এই দেশের গাছগাছালি হামাদের বাঁচায় না? বাঁচায় না তোকে? ভিনদেশিদের সঙ্গে হাত মিলায়ে তু তোর দেশের সর্বনাশ করছিস্! নোয়াতি তোকেও সাজা দিবে। সাবধান!’
আব্দুস সোবহান বকবক করে। ‘নিজের ভালো বুঝলে বেইমান হব কেন? কীসের দেশের সর্বনাশ! নোয়াতি তো একটা মূর্তি মাত্র। ওটা নিলে কি এই চা-বাগান গলে সমুদ্র হয়ে যাবে? যত্তসব!’
মতারার খ্যানখেনে হাসি প্রেতাত্মার আবির্ভাবের ঘোষণা বলে মনে হলো ওদের কাছে। সোবহান মারতে গেল বুড়োকে। মেজর বাধা দিয়ে বলল, ‘বাইরে গিয়ে দাঁড়াক। সব কটাকে একসঙ্গেই খতম করা যাবে। এখন শুধু নোয়াতিকে চাই।’
মতারা কিন্তু চলে গেল না। হাজার চাঁদ আগেও শাস্তি দিয়েছিল নোয়াতি। এখন আবার দেবে। শাস্তিটা দেখতে
গুহার মুখে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল। ওদিকে মেজর হামলে পড়েছে মূর্তির ওপর। মুকুট খুলে নিচ্ছিল, থেমে গেল মূর্তির মুখ থেকে বের হওয়া মৃদু গুঞ্জনের কারণে। মূর্তিটা দিব্যি যেন চোখের পাতা ফেলছে, ঠোঁট খুলে গুঞ্জনের মতো শব্দ বের করছে!
কয়েক সেকেন্ড মেজর সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে রইল মূর্তির খোলা ঠোঁটের দিকে। আব্দুস সোবহানের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে গেছে। শেয়ালের মতো বাঘের উচ্ছিষ্ট খাওয়ার লোভ মিটে গিয়ে আরও বড় লোভ এসেছে তার মনে। মূর্তিটা কেড়ে নিয়ে হুংকার দিল- ‘এটা আমি নেব। আমি! তুই পাবি না!’
একই স্থানে দুটি ঘটনা ডিঞ্জারের বেড়াল থিওরির মতো ঘটে গেল মনে হয়। কেননা, মূর্তি নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে মেজর আর সোবহান, আর পুরোহিত মতারা দেখেছিল নোয়াতিকে ছোঁয়া মাত্র মুকুটের নীল আলো তীব্র হলে ওদের দেহখানি গলে গলে পড়ল নোয়াতির পায়ে। নোয়াতি একটুও নড়েনি। চুপচাপ তাকিয়ে আছে মতারার দিকে।
একই সময়ে মেজর আর আব্দুস সোবহান কিন্তু দেখে, মূর্তি নেই, বেদি নেই, বেদির ওপর পড়ে থাকা রক্তজবা আর মিষ্টি নেই। ভয় জমিয়ে দেয় অতঃপর। হুড়মুড় করে গুহামুখের খোঁজে ছুটতে শুরু করে। পায় না। নিকষ আঁধারে ওরা কেবল ছুটছেই...
পুরোহিত মতারা বেরিয়ে এল বাইরে। বলল- ‘নোয়াতি কাজ দিয়েছে হামাদের। তার দুনিয়া দখলদার বিদেশি মুক্ত করতে হবেক্। যতদিন না পারবেক, নোয়াতি হামাদের পূজা নিবেক লাই। বুঝেছিস?’
ক্যাপ্টেন রিসালাত তখন টার্গেট প্র্যাকটিসের জন্য প্রস্তুত।
পূর্ণ চাঁদ অবাক হয়ে দেখেছিল, মুহূর্তের মধ্যে এক ঝাঁক কালো চিতা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রক্তের তৃষ্ণায়।