আনন্দবাজার পত্রিকায় কথাসাহিত্যিক জগদীশ গুপ্ত নিয়ে লিখেছেন, কথাসাহিত্যিক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পথিকৃতের সম্মান যার প্রাপ্য বলে মনে করেন অনেকে, তিনি মারা গেলেন অবহেলায়, কোনো স্বীকৃতি না পেয়ে, কঠোর দারিদ্র্যের মধ্যে। কিন্তু এ নিয়ে তার মনে কোনো অনুযোগ ছিল না। এক চিঠিতে লিখেছেন এই কথাগুলো, ‘নর-নারীর মনের গতির পরিচয় কিছু কিছু যদি এতদিন না দিয়া থাকি, তবে আমার লেখা বৃথা হইয়াছে।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জগদীশ গুপ্ত সম্বন্ধে বলেছেন, ‘জগদীশের রচনায় নৈপুণ্য আছে।’ সাহিত্য সমালোচক অনিল রায় জগদীশ গুপ্ত সম্বন্ধে মন্তব্য করেন যে: ‘তাঁর ছোটগল্পে যে ধারা প্রবর্তিত করিয়াছেন কী প্রাচ্য কী পাশ্চাত্য, কী প্রবীণ, কী আধুনিক কোথাও তাহার তুলনা নাই বললেই চলে।’ দ্বিজেন্দ্রনাথ বলেন, ‘জগদীশ গুপ্ত যত বড় লেখক, আসলে তার চেয়েও বড় লেখক ছিলেন।’
জগদীশ গুপ্ত কুষ্টিয়ার আমলাপাড়ায় ১৮৮৫ সালের ৬ জুলাই (২২ আষাঢ় ১২৯২ বঙ্গাব্দ) জন্মগ্রহণ করেন। কারও মতে জন্ম জুন ১৮৮৬। পিতা কৈলাশচন্দ্র গুপ্ত কুষ্টিয়া আদালতের বিশিষ্ট আইনজীবী এবং মাতা সৌদামিনী ছিলেন মমতাময়ী। অনেক আগে তার পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার খোর্দ মেঘচারমি গ্রামে। ১৯০৫ সালে কলকাতা সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। অতঃপর কলকাতা রিপন কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৭ সালে এফএ পরীক্ষা দিয়ে কলেজের পাঠ ত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে কলকাতা কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট থেকে শর্টহ্যান্ড ও টাইপরাইটিং শিক্ষা গ্রহণ করেন। কুষ্টিয়ার কথাসাহিত্যিক জগদীশ গুপ্ত (১৮৮৫-১৯৫৭) লেখনীর মাধ্যমে ভারতজুড়ে সুনাম অর্জন করেছিলেন। একসময় হয়ে ওঠেন ভারত উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার, লাভ করেন বাংলা সাহিত্যের স্থায়ী আসন। তিনি মূলত কথাসাহিত্যিক হলেও সাহিত্যিক জীবনের শুরুতে কবিতা লিখেছেন ও একটি কবিতা সংকলন প্রকাশ করেছেন। ‘বিজলী’, ‘কালিকলম’, ‘কল্লোল’ প্রভৃতি সেকালের নতুন ধরনের সব পত্রিকাতেই গল্প প্রকাশ করেছেন। গল্প ও উপন্যাসের ক্ষেত্রে প্রকাশভঙ্গির স্বাতন্ত্র্যের জন্য সাহিত্যিক মহলে বিশিষ্ট স্থান পেয়েছিলেন। গভীর জীবনবোধ, সুঠাম কাহিনিবিন্যাস ও চরিত্র চিত্রণের নৈপুণ্যে তার ছোটগল্প সমৃদ্ধ হয়েছে। মনোবৈকল্য ও মনোবিশ্লেষণ এবং দুঃখময়তার নিপুণ বর্ণনায় তার শিল্পকর্ম এক অসাধারণ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সামাজিক অন্যায়-অবিচারের চেয়ে অদৃষ্টলিপিই দুঃখময়তার কারণ বলে তার গল্পে বিশ্লেষিত। কথাসাহিত্যিকরূপে (কল্লোল যুগ) পরিচিত হলেও ১৯৩২ সালে ‘অক্ষরা’ গ্রন্থের মধ্যদিয়ে কবিরূপেই তার আত্মপ্রকাশ। কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের প্রকাশভঙ্গিতে তিনি সুগভীর জীবনবোধ, কাহিনি বিন্যাস ও চরিত্র চিত্রণে নৈপুণ্যের পরিচয় দেন।
খুব ছোটবেলায় জগদীশ গুপ্ত লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তেন বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস। স্ত্রী চারুবালা সেনগুপ্তের স্মৃতি থেকে জানা যায়, ‘তিন-চার বছর পর্যন্ত তিনি পতিতাদের বাড়িতে খেলাধূলা করতেন। বাড়ির জানালা দিয়ে এ পতিতাপল্লী দেখা যেত।’… জগদীশ গুপ্ত লিখেছিলেন, ‘মানুষের প্রেমের ট্র্যাজেডি মৃত্যুতে নয়, বিরহে নয়, অবসাদে আর ক্ষুদ্রতার পরিচয়ে, আর উদাসীনতায়।’
কুষ্টিয়া শহরের সিঙ্গার মোড় থেকে পূর্ব দিকে পঞ্চাশ গজ দূরে উত্তরের রাস্তায় গেলেই তার সান্নিধ্যের ছোঁয়া মিলবে। আমলাপাড়া, কুষ্টিয়ার উপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্ট্রিটের তিন রাস্তার মোড় ঘেঁষে নিরিবিলি দোতলা বাড়িটিতেই বসবাস করতেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভাবগুরু’ এবং ভারতবর্ষের বিখ্যাত লেখক ও ঔপন্যাসিক জগদীশ গুপ্ত। নব্য পাঠকসমাজ সৃষ্টিতে যিনি লেখনীকে সমকালীন সময়ে চালিত করেছিলেন মাটি ও মানুষঘেঁষা জীবনবন্দনার ভাবাবেগে ঋষির ধ্যানে মশগুল থেকে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার লেখনী ও চেতনা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সাহিত্যমঞ্চে সৃষ্টির মশাল প্রজ্বালন করেছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর সময়ে বিশ্ব যখন সমস্যাগ্রস্ত, দ্বিধাবিভক্ত জাতি যখন পরস্পর সীমাহীন অবিশ্বাসে রিক্ত, সেই সময়ে জগদীশের মেধা ও মননশীলতার স্ফুরণ ঘটে। তার ক্ষুরধার চিন্তাভাবনা, বিশ্বমানবতার সর্বজনীন শিক্ষা, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তথা সমাজভাবনাকে সমন্বিত করেছেন ঐতিহ্যিক ভাবধারার সমান্তরালে। তিনি কুষ্টিয়ার সংস্কৃতিচর্চায় সংগঠক হয়ে উঠেছিলেন। মফস্বলের অনেক পত্রিকায় তার লেখনী প্রধান আকর হয়ে প্রকাশ পেত। কর্মজীবনে বীরভূম জেলার সিউড়ি জজকোর্টে টাইপিস্টের চাকরি লাভ করেন ১৯০৮ সালে। পরবর্তীতে কুষ্টিয়ায় বাস করতে থাকেন এবং লেখালেখিতে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর কুষ্টিয়া ত্যাগ করে কলকাতায় গমন করেন ও সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাংলা সাহিত্যের এই অবহেলিত লেখক ১৯৫৭ সালের ১৫ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যুবরণ করেন। আনন্দবাজার পত্রিকায় কথাসাহিত্যিক জগদীশ গুপ্ত নিয়ে লিখেছেন, কথাসাহিত্যিক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পথিকৃতের সম্মান যার প্রাপ্য বলে মনে করেন অনেকে, তিনি মারা গেলেন অবহেলায়, কোনো স্বীকৃতি না পেয়ে, কঠোর দারিদ্র্যের মধ্যে। কিন্তু এ নিয়ে তার মনে কোনো অনুযোগ ছিল না। এক চিঠিতে লিখেছেন এই কথাগুলো, ‘নর-নারীর মনের গতির পরিচয় কিছু কিছু যদি এতদিন না দিয়া থাকি, তবে আমার লেখা বৃথা হইয়াছে।’