দ্বাদশ পর্ব
দৌড়ে তিনি যে সবাইকে ছাড়িয়ে যাবেন সেটা ছিল অবধারিত। পোল ভল্টেও তিনি ছিলেন সবার সেরা। তার ছোট ভাই একরামুল হক যে রাজনীতিমনা ছিলেন; সেটা রশীদ আলী দিবসের মিছিলে তার ভূমিকা দেখে টের পাওয়া গেছে। স্কুলের পাঠাগারটিকে সমৃদ্ধ করার ব্যাপারেও তার উদ্যোগ দেখেছি। পরবর্তীতে জেনেছি যে, ১৯৪৭ সালেই কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট যে তরুণরা গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠনে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, রাজশাহীতে তিনি ছিলেন তার সঙ্গে যুক্ত। আরও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাভোগ করেন। একরামুল হক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা হলের (পরবর্তী নাম ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল) আবাসিক ছাত্র ছিলেন বলে মনে হয়, কারণ কারামুক্তির পরে তাকে ওই হলে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। আমার ধারণা ছিল যে, তিনি বামপন্থি আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয় থাকবেন। কিন্তু আরও অনেকের মতো তিনিও শেষ পর্যন্ত থাকতে পারেননি। কারণটা হয়তো অর্থনৈতিক। শুনেছি রাজশাহীতে তিনি একটি আধুনিক ছাপাখানা খুলেছিলেন, যেটি থেকে সংস্কৃতিবান মানুষেরা পত্রপত্রিকা ও বই ছাপার ব্যাপারে সুবিধা পেতেন। পরবর্তীকালে সাতচল্লিশের পরে এনামুল হক-একরামুল হকের বোনের সঙ্গে আমার ভবিষ্যৎ-স্ত্রী নাজমা জেসমিনের নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। স্কুল-কলেজে তারা ছিল সহপাঠী। আরেকজন বামপন্থি ছাত্রের কথা শুনেছিলাম। নাম আবুল কাশেম চৌধুরী। স্কুলের ছাত্রাবস্থাতেই তিনি কারাভোগ করেছেন, বামপন্থি আন্দোলনে যুক্ত থাকার দরুন। পরে তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন।
রাজশাহীতে সরকারি কলেজিয়েট হাই স্কুলই যে ছিল সেরা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সে স্কুলে ভর্তি না করে আব্বা আমাদের দুই ভাইকে লোকনাথে কেন নিয়ে গেলেন এ প্রশ্ন আমার মনে দেখা দিয়েছে। এর পেছনে কারণ হতে পারে এটা যে, সরকারি স্কুলে আমাকে ক্লাস থ্রিতে নিত না, লোকনাথ হাই স্কুল নিয়েছে; আর দুই ভাইয়ের এক স্কুলে পড়াটাই বাস্তবসম্মত, তাই আমার ভাইটিরও ঠাঁই হয়েছে লোকনাথেই।
বলছিলাম আব্বা বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাটাকে সঠিকভাবেই চিনে ফেলেছিলেন, নিজের জীবনের দুঃসহ সব অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে। ব্যবস্থাটা যে পুঁজিবাদী ধরনের, সেটা তার জানা হয়ে গিয়েছিল; তার উপলব্ধি ছিল এর মধ্যে থেকেই এগিয়ে যাওয়া চাই। তিনি চেয়েছিলেন আমরা, তার ছেলেরা যেন এগিয়ে যাই। আর এগিয়ে যাওয়ার জন্য সম্ভাব্য একমাত্র পুঁজি হচ্ছে শিক্ষা। ওই পুঁজি বৃদ্ধির জন্যই তার ছিল সর্বাধিক আগ্রহ। তিনি চেয়েছেন আমরা দৈর্ঘ্যে বড় হই, এবং প্রস্থেও প্রসারিত হয়ে উঠি। সেজন্যই পাঠ্যবই পড়ার সঙ্গে অন্য বই পড়াতেও উৎসাহ দিতেন। তাদের অফিসের একজন বড় কর্তা, খান বাহাদুর আমিনুল হক (পূর্ববঙ্গের প্রথম মহিলা সাংবাদিক লায়লা সামাদের বাবা) কলকাতা থেকে ট্যুরে এসেছিলেন রাজশাহীতে। ক্রয়সূত্রে নাকি উপহার হিসেবে জানি না, টাইগার হিল নামে তার লেখা উপন্যাসের একটি কপি আব্বা পেয়েছিলেন; সেটি নেড়েচেড়ে দেখে অনুপযুক্ত নয় বিবেচনা করে আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। ক্লাস সেভেনে শয্যাশায়ী অবস্থাতেই সেটা আমি সাগ্রহে পড়েছিলাম। বস্তুত, ওই সময় থেকেই আমার প্রধান বিনোদন হয়ে দাঁড়ায় পত্রপত্রিকা ও বই পড়া।
পরীক্ষায় ভালো ফল করলে তিনি যে কত খুশি হতেন সেটা ভুলবার নয়। কোন প্রশ্নের কী উত্তর লিখেছি সেটা পরীক্ষা করে দেখতেন। একবার ইংলিশ ট্রানস্লেশনের জন্য একটি বাক্য দেওয়া হয়েছিল, ‘আজেবাজে কাজে সময় নষ্ট করো না’। আমি লিখেছিলাম ‘ডোন্ট হোয়াইল এওয়ে ইওর টাইম।’ আব্বা দুবার জিজ্ঞাসা করলেন, হোয়াইল এওয়ে লিখেছি না। শব্দটা আমি একটি ইংরেজি গল্পে পড়েছিলাম; আব্বার জিজ্ঞাসা দেখে ভয় হলো লেখাটা শুদ্ধ হয়েছে কি না। আব্বা ভারি খুশি হলেন, বললেন, ‘চমৎকার’। শুধু তাই নয়, পরের দিন সন্ধ্যায় যে পরিবারটি আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিল তার প্রধানকে বললেন, ‘জানেন সেলিম কী করেছে?’ ভদ্রলোক জিজ্ঞাসু হওয়াতে আব্বা বললেন, ‘সময় নষ্ট করার ইংরেজি লিখেছে ‘হোয়াইল এওয়ে টাইম’।’ তাঁর ভাবটা এমন যেন আমি কোনো পুরস্কার নিয়ে ঘরে ফিরেছি। লেখাপড়ার ব্যাপারটাতে এমনই ছিল তার আগ্রহ।
ভালো কথা, সেকালের মফস্বল শহরে সন্ধ্যার পরে এক পরিবার আরেক পরিবারের বাসায় বেড়াতে যেত। ছেলেমেয়েসহ গোটা পরিবারের আসা-যাওয়াটা ছিল অনেকটা পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ। যাতায়াত পায়ে হেঁটেই ঘটত। বড়রা সাংসারিক-সামাজিক নানা তথ্যের আদান-প্রদান করতেন, আমরা ছোট ছেলেমেয়েরা মশগুল হতাম নিজেদের হাসিখুশি আলাপচারিতায়।
আমার বাবার পিতৃতান্ত্রিকতা নানাভাবে প্রকাশ পেত। সংসারে বাবার অভাব কতটা দুঃসহ হতে পারে সেটা তো তিনি নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়েই জেনে-বুঝে নিয়েছিলেন। ব্যবস্থাটা যে পুঁজিবাদী স্বভাবের সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। ব্যবস্থাটিকে তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না, কিন্তু জানতেন যে, ওই ব্যবস্থার ভেতরেই জীবনপাত করতে হবে; গত্যন্তর নেই। আমার মা ছিলেন সম্পূর্ণ উল্টো ধরনের। তার সংসারে স্বামীই ছিলেন কর্তা। অবশ্যই। কিন্তু ভেতরের কর্তৃত্বটা ছিল আমার মায়েরই। তার দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বভাব ছিল পুরোমাত্রায় গণতান্ত্রিক। আব্বাকে আমরা আপনি বলে সম্বোধন করতাম, মাকে বলতাম তুমি। বাবাকে তুমি বলব, এটা ছিল কল্পনার বাইরে। সম্বোধনের ওই পার্থক্যটাতেই বোঝা যেত মা কতটা কাছের ছিলেন, বাবার তুলনায়। আমার মা আমার দাদির মতোই দায়িত্ববোধসম্পন্ন ও স্নেহপ্রাণ ছিলেন; কিন্তু দাদির ভেতরে যে কর্তৃত্বপ্রিয়তা ছিল সেটা আমার মায়ের ছিল না। থাকা যে সম্ভব ছিল তাও অবশ্য নয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে দাদি ছিলেন পিতৃতান্ত্রিক, আমার বাবার মতোই। রাজশাহীতে আব্বা যখন বাসা ভাড়া করে থাকা শুরু করলেন, তখন দাদিও ছিলেন সঙ্গে। কিন্তু অল্পদিন পরেই তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য। ব্যাপারটা তখন বুঝিনি, পরে বুঝেছি। তিনি বুঝে ফেলেছিলেন যে নতুন ব্যবস্থায় তার পুরোনো একচেটিয়া কর্তৃত্ব সংরক্ষণ করতে চাওয়াটা অন্যায় হবে; আর দ্বৈতশাসন যে তার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল তা মোটেই নয়। মা অবশ্য কর্তৃত্ব প্রকাশের কোনো আগ্রহই প্রকাশ করেননি; কিন্তু দাদির এ উপলব্ধিটা ছিল যে, নতুন সংসারটা তার পুত্রবধূরই; তার নয়, পুত্রবধূকে তাই তার ন্যায্য অধিকার দিতে হবে। আর এ কূল-ও কূল দু-কূল সামলাতে গেলে তার স্নেহের পুত্রটি যে পড়বে চাপের মুখে, সেটাও নিশ্চয়ই টের পেয়ে গিয়েছিলেন; সেজন্যই ঠিক করেছিলেন নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবেন, চলে যাবেন আপন গৃহে। একাকী সেখানে কীভাবে থাকবেন, অসুখ-বিসুখ হলে কে দেখবে, এসব বিষয় কিন্তু বিবেচনার মধ্যেই আনলেন না। আব্বা বিব্রত হয়েছেন, ছাড়তে চাননি, মা-ও অনুরোধ করেছেন, কিন্তু আমার যোদ্ধা দাদি, মহীয়সী নারী, চলে তিনি যাবেনই। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আব্বা বাধ্য হলেন তাকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে। আমরাও গেলাম সঙ্গে। তার পরে যা হওয়ার তাই হলো। বেশি সময় লাগল না দাদির অসুস্থ হয়ে পড়তে। আমরা তখন গ্রামেই ছিলাম। আব্বা শহরে। টেলিগ্রাম পেয়ে ছুটি নিয়ে আব্বা অতিদ্রুত ছুটে এলেন গ্রামের বাড়িতে। কয়েকদিন পরেই দাদি বিদায় নিলেন। ‘ছুটি’ গল্পের ফটিকের মতোই তারও ছুটি হয়েছে। এবার তিনি বিদায় নেবেন। দুঃসাধ্য যত কর্তব্য ছিল সবই পালন করেছেন, এবার তার অবসর নেওয়ার পালা।
চলবে...