পঞ্চম পর্ব
এমনকি করোনাও সব অধ্যায়ে নেই। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে কিশোর বা বাসন্তী সব জায়গায় না থাকলেও তিতাস নদী কিন্তু সর্বত্র বিরাজিত, প্রবাহিত, জীবনের সঙ্গে যুক্ত। ‘বিষাদ বসুধা’তে করোনা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সর্বত্র আছে। মোহিনী সর্বত্র নেই। মোহিনী সর্বক্ষেত্রে অনিবার্য হয়ে উঠলে আরও গুরুত্ববহ হতে পারত। শেষের দিকে মোহিনী ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। তার চরিত্র নির্মাণে বয়স ও অবস্থান বিবেচনায় থাকলে ভালো হতো। যদিও বহুবিধ বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত মোহিনী। তবুও এর ভেতর দিয়েই মোহিনী মানসিক শক্তি অর্জন করে আরও তেজস্বী শক্তিমত্তায় বৃহৎ কল্যাণে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। ব্রত ধারণ করতে পারতেন আরও ব্যাপক বৃহৎ মানবসেবা, যেহেতু তিনি আরেফিনের বাইরে ব্যক্তিগত নতুনজীবন গ্রহণ করেননি, করতে আগ্রহীও নন। সে ক্ষেত্রে মোহিনীর আত্মনিবেদন হতে পারত আরও বৃহৎ কল্যাণে, সক্রিয় ভূমিকায়। তিনি সে-পথেরই অগ্রগামী পথিক ছিলেন। সেটাকে আরও ব্যাপক বিস্তৃত করে অনন্য এক চরিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। লেখক সে ক্ষেত্রে আর একটু ভাবতেই পারতেন।
আসিফ আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। একজন সৎ ও আদর্শবান সাংবাদিকের প্রতীক। তিনি কখনো নিজের স্বার্থ ভাবেননি। আত্মমর্যাদা ও সম্মানে আঘাত লাগে, এরকম কাজ তিনি কখনোই করেননি। তিনি সবসময়ই ব্যক্তিত্বে মেরুদণ্ড শক্ত রেখে পেশাদারত্বে নিয়োজিত থাকতে চেষ্টা করেছেন।
আসিফ আহমেদের চরিত্রের ভেতর দিয়েই এ দেশের সাংবাদিকতার ভেতর-বাইরের প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। সাংবাদিকতার ভালো দিক এবং কদর্য দিক- দুটো বিষয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একশ্রেণির শিল্পপতিরা তাদের হীনস্বার্থে মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে নিজের মেরুদণ্ড বিক্রি করে সাংবাদিকরা যুক্ত হয়। শিল্পপতিরা তাদের মিডিয়ায় নিয়োগকৃত সম্পাদক থেকে শুরু করে সাংবাদিক-কর্মচারী- এদের সঙ্গে যে জঘন্য আচরণ করেন, দুর্ব্যবহার করেন, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন, বিশ্রি ভাষায় গালিগালাজ করেন, অথচ এরা অনেকেই নামিদামি লেখক-টকশোবিদ, এরা যে মেরুদণ্ডহীন সুবিধাবাদী তৈল মিলন ও তেলবাজ তুষার- তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করছে। করোনার সময়ে শিল্পোদ্যোক্তারা তাদের প্রতিষ্ঠিত মিডিয়ায় নিযুক্ত সাংবাদিকদের ওপর অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে স্বৈরনির্যাতন করে। এসবের প্রতিবাদ করেছেন আসিফ আহমেদ। দেশ যখন করোনায় বিপর্যস্ত সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মালিকপক্ষ সাংবাদিকদের ছাঁটাই করতে বলেছেন, আসিফ আহমেদ তা করেননি। বরং নিজেই চাকরি ছেড়েছেন। অনিশ্চিত জীবন বেছে নিয়েছেন। মাথা নিচু করেননি। মেরুদণ্ড বিক্রি করেননি।
সবসময়ই সাংবাদিকদের কল্যাণে পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাকে সম্পাদক করে পত্রিকা করতে চেয়েছেন। তাকে ফোন করেছেন। ডেকেছেন। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান দুর্নাম-বদনামের সঙ্গে যুক্ত, অসততার সঙ্গে যুক্ত, আদর্শহীনতা ও অমানবিকতার সঙ্গে যুক্ত। তিনি সেসব প্রতিষ্ঠানের পত্রিকার দায়িত্ব গ্রহণে কখনোই সম্মত হননি। এ ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তার স্ত্রী মুনমুন আহমেদ। তিনি সাহস দিয়ে, শক্তি দিয়ে, প্রেরণা দিয়ে স্বামী আসিফ আহমেদের পাশে থেকেছেন। মুনমুন আহমেদ আসিফ আহমেদের জীবনে বড় শক্তি। লেখালেখি করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করার সাহস জুগিয়েছেন, নিজেও চাকরি করেন- সেই শক্তিও তার সামনে দাঁড় করিয়েছেন। লেখক সযত্ন রেখায় মুনমুন আহমেদ চরিত্রটি সৃষ্টি করেছেন।
প্রেরণাদায়িনী অসাধারণ এক নারী তিনি। তবে আসিফ আহমেদের একটা বিষয় প্রশ্ন তৈরি করে। তিনি ‘ঢাকাপ্রকাশ’ করার জন্য অন্যদের কাছ থেকে বিনিয়োগ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু মোহিনীর কাছ থেকে কোনো বিনিয়োগ গ্রহণ করেননি। এমনকি তাকে কখনো বলেনওনি। বিনিয়োগকারীরা যে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাও নয়। তাহলে মোহিনীর সঙ্গে এ বিষয়ে কেন আলোচনা করেননি তিনি! মোহিনী নিজেও একপর্যায়ে তাকে বলেছেন সহযোগিতার কথা। তাকে যে বলেননি, এজন্য অভিমান অভিযোগও প্রকাশ করেছেন মোহিনী। তাকে জানাতে বা তাকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে আসিফ আহমেদের কোথায় অসুবিধে ছিল! মোহিনী তো তার কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং অধিকার খাটানোর শক্ত জায়গা। কিন্তু আসিফ আহমেদ অর্থসংকটে পত্রিকা করতে পারছেন না। ঢাকাপ্রকাশেও অর্থ সমস্যা। মোহিনী তার এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তবুও আসিফ আহমেদ তাকে কিছুই জানান না, বলেন না। মোহিনীর বাড়িতে গেছেন, গল্প করেছেন। এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। আসিফ আহমেদের কী মোহিনীকে নিয়ে মানসিক কোনো দুর্বলতা ছিল, যা কখনোই প্রকাশ করতে পারেননি! নিজের সমস্যা সংকটে থেকেও তার কাছে আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে দেননি।
বিষয়টি ভাবায়। মোহিনীর নিরেট বন্ধুত্ব সত্ত্বেও আসিফ আহমেদের প্রতি তার অপ্রকাশ্য একটা মুগ্ধতা বা টান ছিল, তা তার গভীর আন্তরিকতা, আচরণে ও কথায় অনুভূত হয়। কিন্তু তার প্রকাশ কখনোই ঘটেনি। আসিফ আহমেদ এ ক্ষেত্রে আরও নীরব পথের পথিক। কেন তিনি এত সংকটে থেকে অন্যদের বিনিয়োগে পত্রিকা করলেও মোহিনীকে কেন তিনি বলেননি! স্বাভাবিকভাবেই তাদের মানসিক সম্পর্ক নিয়ে ভাবায়, ভাবতে বাধ্য করে। আসিফ আহমেদ এ ক্ষেত্রে খানিকটা রহস্যের ভেতর থেকে যান। আসিফ আহমেদের এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোহিনী। কিন্তু মোহিনীর সঙ্গে মুনমুন আহমেদের কোনো সম্পর্ক এখানে উল্লেখ নেই। তাদের মধ্যে কোনো আলাপচারিতা বা যোগাযোগ কিছুই নেই। পারিবারিক সম্পর্ক নেই। আসিফ আহমেদ কেন মোহিনী ও মুনমুন আহমেদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করেননি! আসিফ আহমেদকে নিয়ে প্রশ্ন তো থাকেই, থাকছেই।
আসিফ আহমেদের চরিত্র লেখক মোস্তফা কামালের মানসস্বরূপ বলেই অনুভূত হয়। তিনি সাংবাদিক বলেই আসিফ আহমেদকে নির্মাণ করতে পেরেছেন এ ধারণা অমূলক নয়। সাংবাদিকতার ভয়াবহ কদর্য নানাদিক সম্পর্কে তিনি শুধু অবগত নন, তার জীবনাভিজ্ঞতার ঝুলিতে সাংবাদিকতার বহু বিষয় রয়েছে। সে কারণে তিনি সাংবাদিকতার সর্বদিক অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য করে শিল্পিত আঙ্গিকে তুলে ধরতে সক্ষমতা দেখাতে পেরেছেন। মূলত আসিফ আহমেদ লেখক মোস্তফা কামালের মানসস্বরূপ।
শাহবাজ খান এ উপন্যাসের অতীব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। পিতা বৈরম খানের শিল্পসাম্রাজ্যের মালিক। অর্থের ক্ষমতার দাপটে তিনি যা ইচ্ছে তাই করেন। নারী আর মদ তার প্রিয় সঙ্গ। তার ইচ্ছের বাইরে কিছু হলে তিনি হিংস্র ও উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। তখন ভয়ানক এক রূপের প্রকাশ ঘটে। চাকরিচ্যুত থেকে খুন- সবকিছুই তিনি অনায়াসে করতে পারেন। তার ধারণা দেশের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা এসবই অর্থের কাছে বিক্রি হয়।
তার অর্থ আছে। বস্তা বস্তা টাকা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা ও বিচারিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের তার অধিনস্থ করে রাখতে পারেন এবং করেনও। সৎ আদর্শবান পুলিশ অফিসার থাকলেও তারা পরাজিত হন অর্থের কাছে বিক্রি হওয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনৈতিকতার কারণে। তিনি খুব কৌশলে মোহিনীকেও প্রেমের ফাঁদে বাঁধতে চেষ্টা করেছেন। বিয়ে করার কথাও বলেছেন। কিন্তু মোহিনীর অতি সচেতনতার কারণে শাহবাজ সফল হননি। তিনি বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে রুবিনাকে অভিজাত এলাকায় নিজের অর্থব্যয়ে বাসা ভাড়া করে সেখানে মাসের পর মাস রেখেছে। নিয়মিত তাকে সম্ভোগ করেছে। রুবিনা অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে।
চলবে...