নাইজেরিয়ায় যেমন বড় বড় পাহাড় আছে তেমনি বাংলাদেশের মতো নদীও আছে। এখানকার খাবারগুলো ভাত-মাছ-মাংস সবকিছুই বাংলাদেশের মতোই। পৃথিবীর সবচেয়ে কম টাকায় মনে হয় আমি এই পাঁচ বছরে কোথাও গেলাম, তা হচ্ছে নাইজেরিয়া। মাত্র ১৩ ডলারে সুইমিং পুলওয়ালা হোটেলে থাকা চিন্তা করা যায় না, সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা এসি। আবুজায় তো মাত্র ১৭ ডলারে ছিল তিন তারকা হোটেল সুইমিং পুল উইথ ব্রেকফাস্ট।
লেগোসে অনেক পার্টি করা হয়েছে। আর সবচেয়ে খারাপ লেগেছে এটিএম থেকে মাত্র ৪০ হাজার নাইরা উঠানো যায়, যার মূল্য মাত্র ২৩ ডলার। কিন্তু আমার অস্ট্রেলিয়ান ব্যাংক এই ২৩ ডলার উঠাতে খরচ নেয় ১২ ডলার। তাই এখানে টাকা নিয়ে আমি বেশ ঝামেলায় পড়েছিলাম এবং নাইজেরিয়াতে পাঁচ তারকা হোটেল এবং বিদেশি রেস্টুরেন্টগুলো ছাড়া কোথাও বিদেশি কার্ড কাজ চলে না। যদিও নাইজেরিয়া টাকা-পয়সাবিহীন। সেখানে অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে সবকিছু হয়। বেশ ঝামেলা ক্যাশ টাকা নিয়ে, আবার খুচরা করার বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে সেখানে।

নাইজেরিয়ায় বড় বাস চলে না। এখানে ছোট ছোট মাইক্রোবাসকে স্থানীয়রা ভিআইপি বাস বলে। তবে সেখানকার প্রতিটি স্টেটে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা রয়েছে। খাবার এবং বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মাবলম্বীর মানুষজন বসবাস করে। যেমন কানু এবং ওই সাইট দিয়ে বাউছি এসব এলাকায় মুসলিম। আর অন্যান্য এরিয়ায় খ্রিষ্টান ও আফ্রিকান গোত্রীয় লোকজনের বাস। আফ্রিকার মধ্যে নাইজেরিয়ান ছেলেদের পোশাকে বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে সঙ্গে ভিন্ন ধরনের পাগড়ি।
বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের মতোই ওরা পাঞ্জাবি পরে, কিন্তু তার ওপর একটা কোট পরে। যেটা শুধু এই ওয়েস্ট আফ্রিকার সম্প্রদায়ের লোকজনই পরে থাকে। লেগোসে প্রায় আট দিন ছিলাম ফরাসি বন্ধুর বাসায়। ওর বাসা ভিআইপি এলাকাতে, ওই এরিয়ায় যেতে হলে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন অ্যাক্সেস কোড নিয়ে যেতে হয়। একদিন রাতে প্রায় ৪৫ মিনিট রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, কোড ভুলে গিয়েছি তাই। তারপর ওর বাসার দারোয়ান আমাকে কোড টেক্সট করে পাঠালে যেতে পেরেছি।
লেগোসের মধ্যে ভিক্টোরিয়া আইল্যান্ড সবচেয়ে ধনীদের বসবাস। তবে আফ্রিকার মধ্যে কেপটাউনের পরে লেগোসের অবস্থান যদিও। কেপটাউন অনেক সুন্দর। এখানে রয়েছে মিডিয়া হাউস, মিউজিয়াম, থিয়েটার, আর্ট গ্যালারি সবই। নাইজেরিয়াতে রাস্তায় গাড়ি খুব দ্রুত চলে এবং সবাই আগে যেতে চায়, সেজন্য এখানে অ্যাক্সিডেন্টের পরিমাণ অনেক বেশি।
নাইজেরিয়ার বেনিং সিটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। সেই সঙ্গে খাবারদাবার। বেনিং সিটিতে বেনিং রাজা থেকে শুরু করে অনেক কিছুই দেখার আছে, ওখানে প্রায় চারটি মিউজিয়াম রয়েছে। বেনিং সিটি থেকে আমি চলে গিয়েছিলাম বাসে আবুজাতে। এখানে মানুষের সময়-জ্ঞান এত কম যে চিন্তা করা যায় না, তারা ফোন করে জিজ্ঞেস করে আসছি। তারপর দু-এক ঘণ্টা পরে তারা রওনা দেয়। বিউটি পিজেন্টে অনারেবল বিচারক হিসেবে গিয়েছিলাম ঈদের দিন। বিকেল ৩টায় প্রোগ্রাম শুরু করার কথা থাকলেও তারা রাত ৯টায় প্রোগ্রাম স্টার্ট করে। চমৎকার প্রোগ্রাম ছিল কালো সুন্দরীদের মেলা বসেছিল। সেখান থেকে মুশকিল ছিল বুদ্ধি আর সৌন্দর্য সবকিছু নিয়ে নির্বাচন করা বেস্ট সুন্দরীকে। আবুজাতে বন্ধু রোটারিয়ান আগে থেকেই সবকিছু আয়োজন করেছিল।

সেজন্য ওখানে বেশ কিছু রোটারি ক্লাব ভিজিট করার সৌভাগ্য হয়েছিল। স্পেশালি ইবি ও তার ক্লাব প্রেসিডেন্ট টন্ডি অনেক সাহায্য করেছে। বিভিন্ন ক্লাব ভিজিটে সহায়তা করেছে এবং আমার যাওয়া উপলক্ষে স্পেশাল মিটিংও তারা ডেকেছিল। আবুজাতে চাঁদের ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করেছিলাম। সেখান থেকে দুদিন পরেই চাঁদের ভিসা পেয়েছিলাম কিন্তু অনলাইনে ক্যামেরুন ভিসা করার পরে আবারও সেই ভিসার Stickers নিতে অ্যাপে Had to wait a long time. অপেক্ষা করতে হয়েছে বেশ কত দিন। তবে সময়টা খুব সুন্দর কেটেছে। কয়েকটা মিউজিয়াম আর মিলেনিয়াম পার্ক ঘুরেছি। আমি প্রতিদিন হিল্টান আর ইন্টার্ন কনটেইনারের লাঞ্চ ও ডিনার করেছি।
.jpg)
১১ এপ্রিল আবুজা থেকে সেই স্পেশাল শেয়ার ট্যাক্সিতে করে কানু শহরে পৌঁছায়। আগেই বলেছি যে, শহর মুসলিম ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত এবং এখানে আমির প্রথা রয়েছে। ওখানে লেবাননের একটি চমৎকার তাহির প্যালেস গেস্ট হোটেল। সেখানে দুদিন ছিলাম। এরপর প্রায় চার ঘণ্টা শেয়ারট্যাক্সি স্ট্যান্ডে বসে থেকে রাত ৩টায় পৌঁছালাম ইয়ালা শহরে। সেখান থেকে পরের দিন রওনা দিই ক্যামেরুনের উদ্দেশে। সত্যি কথা বলতে আমি জানি না বর্ডারের নাম কী এবং কোন শহরে যাচ্ছি। ট্যাক্সিতে করে নদীর তীরে পৌঁছাই। সেখানে এক নাইজেরিয়ান পাকিস্তানির সঙ্গে পরিচয় হয়। তার সঙ্গে চার ঘণ্টা নৌকায় করে পৌঁছালাম ক্যামেরুনের ডাঙ্গায়। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় বর্ডার বন্ধ ছিল বলে ইমিগ্রেশনের সিল নিতে পারিনি।

পরে ওখান থেকে মাটির রাস্তায় ট্যাক্সি ভাড়া করে ওই ভদ্রলোক ও আমরা চারজন মিলে একসঙ্গে গারোয়া নামে ক্যামেরুনের শহরে পৌঁছাই রাত সাড়ে ১০টায় দিকে। হোটেল তো খুবই খারাপ আর খুবই দামি। বেসিন ভালো থাকলে এসি চলে না, এ এক বিশাল সমস্যা। তারপর সেই গারুয়া থেকে পরের দিন অনেক কষ্টে কয়েকটা ব্যাংক চেষ্টা করার পরে সোসালিক নামের একটি ব্যাংক টাকা নিলাম। ওই দিন ৪টার দিকে মারুয়ার শহরে যাই। মারুয়া শহরে গিয়ে দেখি কুচারি বর্ডার শহরে কোনো বাস কিংবা ট্যাক্সি নেই। তারপরে ঐদিন রাত্রে বাস স্টেশনের পাশেই হোটেল শাহিদে ছিলাম প্রায় ৪০ ডলার দিয়ে।
হোটেলের দশা খুবই খারাপ যদিও সুইমিং পুল আছে, তবে কোনো কিছুর ঠিক নেই। পরের দিন সকালে উঠে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শুনি টিকিট ফুল হয়ে গেছে। তারপরে বাস স্টেশনের চিল্লাপাল্লা করার পরে স্টেশন মাস্টার শেয়ার ট্যাক্সিওয়ালান কাছে নিয়ে যায়। সেই শেয়ার ট্যাক্সিতে করে কুচারিতে আসি। রাস্তা বলতে কোনো রাস্তায় নেই এখানে। মরুভূমির ওপরে দিয়ে কোথাও একসময় এখানে খাল বিল ছিল, তার ওপর দিয়ে গাড়ি চলেছে। আর আমার সেই গাড়ি তো সেই রকম দেখার মতো। মাত্র রাস্তায় তিনবার নষ্ট হয়। গাড়িতে পরিমাণে লাগেজ বহন করে যে চিন্তা করা যায় না। তারপর সন্ধ্যা ৬টায় পৌঁছাই অনেক কষ্টে কুচারি শহরে, সেখান থেকে মোটরসাইকেলে অনেক কষ্টে দুটি লাগে লাগেজ নিয়ে বর্ডারে পৌঁছাই।

দুজন কুলিকে ভাড়া করি। তারা সাহায্য করে। ইমিগ্রেশন পার করি অনেক কষ্টে ক্যামেরুনে। ক্যামেরুন আর চাঁদের মাঝখানে বাঙ্গি নদীর একটি ছোট ব্রিজ আছে যেটা হেঁটে পার হতে হয়। সেই ব্রিজ পার হয়ে অর্ধেক পথ আসার পরেই দেখি রাস্তায় শুধু গরু। গরুর জন্য রাস্তা পার হওয়া যাচ্ছিল না। সেই গরুগুলোর শিং দেখলে ভয়ংকর রকমের বড়। যদি একবার গুঁতা দেয় একেবারে পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে, I have moved here with great difficulty। অনেক কষ্ট করে বর্ডার পাড়ি দেওয়ার সময় দুজন লেবারসহ হঠাৎ দেখি আমার বন্ধু এসে ম্যারি বলে ডাকছে, In the kingdom of corruption মনে হলো দেবদূতের মতো এসে হাজির হয়েছে। আসবে জানতাম কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যে আসবে জানতাম না। তারপর ও এসে ফ্রান্স ভাষাভাষীদের সঙ্গে কথা বলে ইমিগ্রেশনে প্রায় তিন ঘণ্টা কথা বলে আমাকে বের করেছে।

ইমিগ্রেশন অফিসার তো আমার পাসপোর্ট রেখে দিয়েছিল টাকা না দিলে দেবে না। খুবই চিল্লাচিল্লি শুরু করেছি যে ২৫০ ডলার দিয়ে ভিসা করেছি কি ওকে টাকা দেওয়ার জন্য। তারপর অনেক কষ্টে রাত সাড়ে ৯টায় এসে হোটেলে পৌঁছাই। হোটেল দেখে তো মন খুবই খারাপ, ৬০ ডলারে কী সুন্দর হোটেল দেখিয়েছে ছবিতে। আসার পরে দেখি পুরোনো যেখানেই দাঁড়াই সেখান থেকে মনে হয় ইট সুরকি ঝরে পড়ে। যাই হোক মন অনেক খারাপ হওয়ার পরও এখানেই থাকতে হবে কয়েকদিন।

অনেক কষ্টে ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ১৫৪তম দেশ চাদে পৌঁছায়। চাঁদ বলে কথা, সহজেই হাতে পাওয়া যায় না। প্রায় চার দিন লেগেছে মাত্র ৬০০ কিলোমিটারের এই রাস্তাটি অতিক্রম করতে। খুবই ভালো লাগছে, চাদ ছিল স্বপ্নে পাওয়া একটি দেশ যেখানে আসতে পেরে অনেক ভালো লাগছে।
চাদের বুকে পা রাখলাম অনেক কষ্টের – নাইজেরিয়া থেকে চাদ পর্যন্ত এক দুর্ধর্ষ যাত্রা এই গল্পটা শুধু একটা ভ্রমণের না, এটা একটা বাস্তব জীবনের অ্যাডভেঞ্চার। নাইজেরিয়ার টানা রোড জার্নি থেকে শুরু করে ক্যামেরুন পার হয়ে অবশেষে চাদের বুকে পা রাখা– প্রতিটি মুহূর্ত ছিল নতুন, চ্যালেঞ্জিং আর শেখার মতো।
কলি

.jpg)