নাগরিক সভ্যতায় যাচ্ছে দিন কমছে আয়ু। আর এর মাঝেই সবুজ পরিবেশে নিজেকে একাত্ম করলে মনের যেমন খোরাক মেটায় ঠিক সেভাবে বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্রহণের ফলে এই ধরাধামে কিছুটা দিন বেশি থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বেশ কিছুদিন ধরে সিলেটের নতুন স্থান ভ্রমণপিপাসুদের জন্য পাম বাগানের নাম শুনছিলাম কিন্তু সময়ের অভাবে কাছের দূরত্ব হওয়ার পরও ওই দিকে পা বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
গত সপ্তাহে মনে মনে ছক কষেছিলাম আসছে সপ্তাহে বের হব পাম বাগানের পানে। যাই হোক দেখতে দেখতে কাঙ্ক্ষিত দিন চলে এল। শুক্রবার ঘুম থেকে উঠেই হাতের কাজ শেষ করার চেষ্টা করছিলাম। এদিকে মাকে বললাম দ্রুত ঘরের কাজ শেষ করো। মধ্যাহ্নের আহার শেষে আমরা বেরিয়ে পড়ব কিন্তু নতুন গন্তব্য পানে। যেই বলা সেই কাজ দুপুরে পেট পূজা শেষ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম গন্তব্য পানে। আমাদের পাইলট মহাশয় এগিয়ে নিয়ে চলছেন আমাদের গন্তব্য পানে।
বন্দরবাজার, মিরাবাজার, শিবগঞ্জ, টিলাগড় পেরিয়ে আমরা মেজরটিলার দিকে ধাবিত হচ্ছি। দিনান্তে সূর্য দেবের প্রখরতায় বেশ কাবু করে ফেলেছে জনজীবন কে। এরপরও জীবিকার টানে ক্লান্তি বিহীন পথ সবাই এগিয়ে চলছে। আমরা এসে পৌঁছালাম খাদিম পাড়ার মুখে।
এবার কোন দিকে যাব পথের ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, পরে নিরুপায় হয়ে এলাকাবাসীর কাছে জানতে চাইলাম পাম বাগানটা কোন দিকে। প্রত্যুত্তরে বলা হলো সামনের পথ ধরে কিছুদূর এগিয়ে গেলেই দেখা পাব পাম বাগানের। তবে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হবে। যাই হোক আমরা চললাম এগিয়ে। এসে পৌঁছালাম গন্তব্য স্থানে কিন্তু প্রবেশদ্বার তো বন্ধ।
মনে মনে ভাবতে লাগলাম কী করা যায়। আশপাশে কাউকে দেখাও যাচ্ছে না। কিছু সময় পর এক বয়োজ্যেষ্ঠ লোকের দেখা পেলাম। তার কাছেই জানতে চাইলাম কীভাবে প্রবেশ করব পাম বাগানে। তিনি বললেন, আগে নিয়মিত গেট খোলা থাকত কিন্তু বেশি মানুষের আগমনের ফলে পরিবেশের বিপর্যয় হতে পারে বিধায় এখন থেকে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। আমি বললাম আমরা তো কাউকে চিনি না, অনুমতি নেব কীভাবে? বয়োজ্যেষ্ঠ বললেন, কিছু সময় অপেক্ষা করুন দারোয়ান সামনে হয়তো কোথাও গেছে, সে আসলে তাকে বলেই ঢুকতে পারবেন। স্বল্প সময়ের মাঝে দারোয়ান সাহেব এসে উপস্থিত। আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন এই নতুন স্থান ঘুরে দেখার জন্য। সবাই দাঁড়িয়ে আছেন অনুমতি নেওয়ার জন্য।
মানুষের আধিক্য দেখে প্রথমে ঢুকতে দিতে চাইছিলেন না দারোয়ান সাহেব। পরে সবাই অনুরোধ করার পর একটি শর্তে প্রবেশ করতে দিলেন সবাইকে। সবাই খুশি মনে সম্মুখ পানে এগিয়ে যেতে লাগলেন। ও বলাই হলো না দারওয়ান সাহেবের একটাই শর্ত ছিল তা হলো কোনোভাবেই পরিবেশ দূষিত করা যাবে না। চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, বাদামের খোসা যত্রতত্র ফেলা যাবে না এবং উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা যাবে না। আমরা এগিয়ে চললাম পদব্রজে। সামনে ছোট একটি পোলের দেখা পেলাম।
নিচে দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দ করে প্রবাহিত হচ্ছে জলধারা। এই জলধারাগুলো সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ছরা বলে। বেশ ভালোই লাগল, অনেক দিন পর ছরার দেখা পেলাম। আমরা এগিয়ে চললাম পাম বাগানের দিকে। দুটি পথ আছে সামনে দিকে যাওয়ার জন্য একটি সমতল ভূমি আরেকটি অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় মানুষের জন্য টিলা বেয়ে যাওয়া। আমি ভাবলাম সমতল ভূমি দিয়ে ফেরার পথে যাব এখন কিছু অ্যাডভেঞ্চারের ছোঁয়াও নিই। মাকে বললাম তুমি সমতল ভূমি দিয়ে যাও আমি ওই দিকটার পথ দিয়ে যাই।
মা তো প্রথমে ওই পথে যেতেই দেবেন না শেষ পর্যন্ত মাকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে এগিয়ে চললাম পাম বাগানে ভেতরে প্রবেশের লক্ষ্যে। আমার সঙ্গে আরেকটি গ্রুপ ও টিলা বেয়ে যেতে লাগল পাম বাগানের পথে। বেশ ভালোই লাগছিল পথে বেয়ে চলতে। দূর থেকেই পাম বাগানের দৃশ্য দেখতে পারছিলাম। টিলা থেকে অসাধারণ লাগছিল পাম বাগানকে। বিশাল বিস্তৃত পাম বাগানটির যতদূর চোখ যায় শুধু পাম গাছের সারি। আমরা এসে পৌঁছালাম বাগানের পথে।
পাশেই দেখা পেলাম একটি চা বাগানের। চা গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে তাই সজীব পাতা আলোকিত করছে চারপাশ। উপরে চমৎকার নীল আকাশ আর নিচে বিশাল সবুজ এই বাগান দেখলে মনে হয় যেন হাতে কোনো ছবি। কথায় কথায় জানতে পারলাম এই পাম বাগানটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। আরেকটু সামনে এগিয়েই দেখা পেলাম জলাশয়ের। সেই জলাশয়ের আবদ্ধ পানিতে পাম বাগানের প্রতিচ্ছবি এক কথায় অপূর্ব। আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম বাগানের ভেতর পানে। সারি সারি পাম গাছের ফাঁকে সূর্যদেবের লুকোচুরি খেলা। গাছে গাছে পাম ফল ধরেছে। বলে রাখা ভালো পাম গাছের ফল প্রক্রিয়াজাত করে যে তেল পাওয়া যায় তাকে পাম ওয়েল বলে। পাম ফলের মাংসল ও বীজ থেকে তেল পাওয়া যায়।
পাম তেলের আদি উৎস পশ্চিম আফ্রিকা। মালয়েশিয়ায় ১৯১০ সালে Scotsman William Sime এবং Henry Darby নামের দুই ভদ্রলোক পাম চাষের প্রবর্তন করেন। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম দফা পাম বীজ মালয়েশিয়া থেকে আনা হয় এবং পলিথিন ব্যাগে ঢাকা বোটানিক্যাল গার্ডেনে চারা উৎপাদন করা হয়। ১৯৭৯ সালে মালয়েশিয়া ও নাইজেরিয়া থেকে আনা চারার মাধ্যমে প্রথম পাম চাষ শুরু হয়। সদ্য আহরিত পাম তেল বিটা ক্যারোটিনের সমৃদ্ধতম উৎস।
পাম তেলে টোকোফেরল ও টোকোট্রায়েনল নামক দুই ধরনের ভিটামিন-ই অধিক পরিমাণে থাকে। অন্যান্য উদ্ভিজ্জ ভোজ্যতেলের মতো পাম তেলও কোলেস্টেরলমুক্ত। কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো খাদ্যে পাম তেল ব্যবহার করলে রক্তে মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ে না।
আমরা বাগানের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় ঘুরে দেখতে লাগলাম। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করেছে। মুগ্ধতার শেষ এখানেই নয়। আরেকটু সামনে এগোলেই দেখতে পেলাম বালুর পাহাড়। নানান রঙের বালুর একটি টিলা এটি। গোলাপি, হলুদ, বাদামি, কমলা, সাদা নানান রঙের বালু স্তরে স্তরে সেজে জন্ম দিয়েছে এই টিলার। আমরা একের পর এক আমরা ছবি তুলতে লাগলাম। দেখতে দেখতে গোধূলি বেলা চলে এল এবার আমাদের বাড়ি ফেরার পালা। আমরা ফিরে চললাম আমাদের ডেরার পানে।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার সরাসরি বাস রয়েছে। কিছুক্ষণ পরপরই ছাড়ে বাসগুলো। ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ আর মহাখালী থেকে বাস পাবেন। ট্রেনে আসতে চাইলে কমলাপুর থেকে আসতে পারেন। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টা ৪০ মিনিটে পারাবত আর দুপুর ২টায় জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ছেড়ে যায় সিলেটের উদ্দেশ্যে। বুধবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। এরপর সিএনজি করে চলে যান খাদিম নগরে। খাদিম নগরের ২ নম্বর গেটের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে ৪-৫ মিনিট হাঁটলেই পেয়ে যাবেন। তাছাড়া সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পেরিয়ে টিলাগড় ইকোপার্কের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেলেই পাম বাগান যাওয়ার রাস্তা।
/রোদসী

.jpg)