ঢাকা ৪ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় ইইউর ১.৪ কোটি ইউরো অনুদান বিশ্বকাপে বড় ধাক্কা খেল আইভরি কোস্ট, কানাডার ভিসা পেলেন না ওয়াহি মাগুরায় নবজাতককে বিক্রি করলেন বাবা পরীমনিকাণ্ডে এডিসি সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসর এসএসসি ফল ঘোষণা ২০ জুলাই, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী কুড়িগ্রামে ১২ ঘণ্টা পর রেলযোগাযোগ স্বাভাবিক চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে জাবির কর্মচারীদের অবস্থান মানিকগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষ, নিহত ২ সিলেটে ৩৬ ঘণ্টায় ১২২.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড সংসদে মামুনুল হক প্রসঙ্গে দেওয়া বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করলেন স্পিকার টঙ্গীতে ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার নেপালের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি চায় বাংলাদেশ চুয়াডাঙ্গায় ট্রেন-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২ সামরিক জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার আহ্বান সেনাপ্রধানের উখিয়ায় আইওএমের গাড়ির চাপায় অজ্ঞাত শিশুর মৃত্যু ভার্চুয়াল জুয়ার ফাঁদে সমাজ এসএসএফকে জনগণের সঙ্গে সংযোগ অটুট রাখার নির্দেশ তারেক রহমানের গানেই লিজার ব্যস্ততা প্রয়াত বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানের নামে আমন্ত্রণপত্র আধ্যাত্মিক ধনী হওয়ার সহজ সমীকরণ আবার জ্বলে ওঠো জার্মানি চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০০ জাতের আম নিয়ে মেলা শুরু পাহাড়, বন আর নীল জলের অপূর্ব মিলন ৪টি চলচ্চিত্র নিয়ে ‘সামার বাংলা হিট ফেস্ট’ তিন নাটকে প্রশংসিত হিমি পুশ-ইন সমস্যা সমাধানের দাবিতে সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের প্রবাসী নিহত তপ্ত গরমে পশুপাখির প্রতি সদয় হোন সিনচিয়াংয়ে সংস্কৃতি ও পর্যটন উন্নয়ন সম্মেলন অনুষ্ঠিত সংঘাত নয়, হোক সম্প্রীতির উদযাপন

পাম বাগানে একদিন

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:২৩ পিএম
আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:২৪ পিএম
পাম বাগানে একদিন

নাগরিক সভ্যতায় যাচ্ছে দিন কমছে আয়ু। আর এর মাঝেই সবুজ পরিবেশে নিজেকে একাত্ম করলে মনের যেমন খোরাক মেটায় ঠিক সেভাবে বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্রহণের ফলে এই ধরাধামে কিছুটা দিন বেশি থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বেশ কিছুদিন ধরে সিলেটের নতুন স্থান ভ্রমণপিপাসুদের জন্য পাম বাগানের নাম শুনছিলাম কিন্তু সময়ের অভাবে কাছের দূরত্ব হওয়ার পরও ওই দিকে পা বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

গত সপ্তাহে মনে মনে ছক কষেছিলাম আসছে সপ্তাহে বের হব পাম বাগানের পানে। যাই হোক দেখতে দেখতে কাঙ্ক্ষিত দিন চলে এল। শুক্রবার ঘুম থেকে উঠেই হাতের কাজ শেষ করার চেষ্টা করছিলাম। এদিকে মাকে বললাম দ্রুত ঘরের কাজ শেষ করো। মধ্যাহ্নের আহার শেষে আমরা বেরিয়ে পড়ব কিন্তু নতুন গন্তব্য পানে। যেই বলা সেই কাজ দুপুরে পেট পূজা শেষ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম গন্তব্য পানে। আমাদের পাইলট মহাশয় এগিয়ে নিয়ে চলছেন আমাদের গন্তব্য পানে।

বন্দরবাজার, মিরাবাজার, শিবগঞ্জ, টিলাগড় পেরিয়ে আমরা মেজরটিলার দিকে ধাবিত হচ্ছি। দিনান্তে সূর্য দেবের প্রখরতায় বেশ কাবু করে ফেলেছে জনজীবন কে। এরপরও জীবিকার টানে ক্লান্তি বিহীন পথ সবাই এগিয়ে চলছে। আমরা এসে পৌঁছালাম খাদিম পাড়ার মুখে। 

এবার কোন দিকে যাব পথের ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, পরে নিরুপায় হয়ে এলাকাবাসীর কাছে জানতে চাইলাম পাম বাগানটা কোন দিকে। প্রত্যুত্তরে বলা হলো সামনের পথ ধরে কিছুদূর এগিয়ে গেলেই দেখা পাব পাম বাগানের। তবে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হবে। যাই হোক আমরা চললাম এগিয়ে। এসে পৌঁছালাম গন্তব্য স্থানে কিন্তু প্রবেশদ্বার তো বন্ধ।

মনে মনে ভাবতে লাগলাম কী করা যায়। আশপাশে কাউকে দেখাও যাচ্ছে না। কিছু সময় পর এক বয়োজ্যেষ্ঠ লোকের দেখা পেলাম। তার কাছেই জানতে চাইলাম কীভাবে প্রবেশ করব পাম বাগানে। তিনি বললেন, আগে নিয়মিত গেট খোলা থাকত কিন্তু বেশি মানুষের আগমনের ফলে পরিবেশের বিপর্যয় হতে পারে বিধায় এখন থেকে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। আমি বললাম আমরা তো কাউকে চিনি না, অনুমতি নেব কীভাবে? বয়োজ্যেষ্ঠ বললেন, কিছু সময় অপেক্ষা করুন দারোয়ান সামনে হয়তো কোথাও গেছে, সে আসলে তাকে বলেই ঢুকতে পারবেন। স্বল্প সময়ের মাঝে দারোয়ান সাহেব এসে উপস্থিত। আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন এই নতুন স্থান ঘুরে দেখার জন্য। সবাই দাঁড়িয়ে আছেন অনুমতি নেওয়ার জন্য।

মানুষের আধিক্য দেখে প্রথমে ঢুকতে দিতে চাইছিলেন না দারোয়ান সাহেব। পরে সবাই অনুরোধ করার পর একটি শর্তে প্রবেশ করতে দিলেন সবাইকে। সবাই খুশি মনে সম্মুখ পানে এগিয়ে যেতে লাগলেন। ও বলাই হলো না দারওয়ান সাহেবের একটাই শর্ত ছিল তা হলো কোনোভাবেই পরিবেশ দূষিত করা যাবে না। চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, বাদামের খোসা যত্রতত্র ফেলা যাবে না এবং উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা যাবে না। আমরা এগিয়ে চললাম পদব্রজে। সামনে ছোট একটি পোলের দেখা পেলাম।

নিচে দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দ করে প্রবাহিত হচ্ছে জলধারা। এই জলধারাগুলো সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ছরা বলে। বেশ ভালোই লাগল, অনেক দিন পর ছরার দেখা পেলাম। আমরা এগিয়ে চললাম পাম বাগানের দিকে। দুটি পথ আছে সামনে দিকে যাওয়ার জন্য একটি সমতল ভূমি আরেকটি অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় মানুষের জন্য টিলা বেয়ে যাওয়া। আমি ভাবলাম সমতল ভূমি দিয়ে ফেরার পথে যাব এখন কিছু অ্যাডভেঞ্চারের ছোঁয়াও নিই। মাকে বললাম তুমি সমতল ভূমি দিয়ে যাও আমি ওই দিকটার পথ দিয়ে যাই।

মা তো প্রথমে ওই পথে যেতেই দেবেন না শেষ পর্যন্ত মাকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে এগিয়ে চললাম পাম বাগানে ভেতরে প্রবেশের লক্ষ্যে। আমার সঙ্গে আরেকটি গ্রুপ ও টিলা বেয়ে যেতে লাগল পাম বাগানের পথে। বেশ ভালোই লাগছিল পথে বেয়ে চলতে। দূর থেকেই পাম বাগানের দৃশ্য দেখতে পারছিলাম। টিলা থেকে অসাধারণ লাগছিল পাম বাগানকে। বিশাল বিস্তৃত পাম বাগানটির যতদূর চোখ যায় শুধু পাম গাছের সারি। আমরা এসে পৌঁছালাম বাগানের পথে।

পাশেই দেখা পেলাম একটি চা বাগানের। চা গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে তাই সজীব পাতা আলোকিত করছে চারপাশ। উপরে চমৎকার নীল আকাশ আর নিচে বিশাল সবুজ এই বাগান দেখলে মনে হয় যেন হাতে কোনো ছবি। কথায় কথায় জানতে পারলাম এই পাম বাগানটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। আরেকটু সামনে এগিয়েই দেখা পেলাম জলাশয়ের। সেই জলাশয়ের আবদ্ধ পানিতে পাম বাগানের প্রতিচ্ছবি এক কথায় অপূর্ব। আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম বাগানের ভেতর পানে। সারি সারি পাম গাছের ফাঁকে সূর্যদেবের লুকোচুরি খেলা। গাছে গাছে পাম ফল ধরেছে। বলে রাখা ভালো পাম গাছের ফল প্রক্রিয়াজাত করে যে তেল পাওয়া যায় তাকে পাম ওয়েল বলে। পাম ফলের মাংসল ও বীজ থেকে তেল পাওয়া যায়।

পাম তেলের আদি উৎস পশ্চিম আফ্রিকা। মালয়েশিয়ায় ১৯১০ সালে Scotsman William Sime এবং Henry Darby নামের দুই ভদ্রলোক পাম চাষের প্রবর্তন করেন। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম দফা পাম বীজ মালয়েশিয়া থেকে আনা হয় এবং পলিথিন ব্যাগে ঢাকা বোটানিক্যাল গার্ডেনে চারা উৎপাদন করা হয়। ১৯৭৯ সালে মালয়েশিয়া ও নাইজেরিয়া থেকে আনা চারার মাধ্যমে প্রথম পাম চাষ শুরু হয়। সদ্য আহরিত পাম তেল বিটা ক্যারোটিনের সমৃদ্ধতম উৎস।

পাম তেলে টোকোফেরল ও টোকোট্রায়েনল নামক দুই ধরনের ভিটামিন-ই অধিক পরিমাণে থাকে। অন্যান্য উদ্ভিজ্জ ভোজ্যতেলের মতো পাম তেলও কোলেস্টেরলমুক্ত। কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো খাদ্যে পাম তেল ব্যবহার করলে রক্তে মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ে না। 

আমরা বাগানের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় ঘুরে দেখতে লাগলাম। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করেছে। মুগ্ধতার শেষ এখানেই নয়। আরেকটু সামনে এগোলেই দেখতে পেলাম বালুর পাহাড়। নানান রঙের বালুর একটি টিলা এটি। গোলাপি, হলুদ, বাদামি, কমলা, সাদা নানান রঙের বালু স্তরে স্তরে সেজে জন্ম দিয়েছে এই টিলার। আমরা একের পর এক আমরা ছবি তুলতে লাগলাম। দেখতে দেখতে গোধূলি বেলা চলে এল এবার আমাদের বাড়ি ফেরার পালা। আমরা ফিরে চললাম আমাদের ডেরার পানে।  

কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার সরাসরি বাস রয়েছে। কিছুক্ষণ পরপরই ছাড়ে বাসগুলো। ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ আর মহাখালী থেকে বাস পাবেন। ট্রেনে আসতে চাইলে কমলাপুর থেকে আসতে পারেন। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টা ৪০ মিনিটে পারাবত আর দুপুর ২টায় জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ছেড়ে যায় সিলেটের উদ্দেশ্যে। বুধবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। এরপর সিএনজি করে চলে যান খাদিম নগরে। খাদিম নগরের ২ নম্বর গেটের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে ৪-৫ মিনিট হাঁটলেই পেয়ে যাবেন। তাছাড়া সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পেরিয়ে টিলাগড় ইকোপার্কের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেলেই পাম বাগান যাওয়ার রাস্তা।

/রোদসী 

বিমানবাহিনী জাদুঘরে

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০২:৩২ পিএম
বিমানবাহিনী জাদুঘরে

আকাশে ওড়ার স্বপ্ন কমবেশি আমাদের সবারই আছে। পাখির মতো আকাশে ভেসে বেড়াতে না পারলেও এখন উড়োজাহাজে করে মানুষ আকাশে উড়তে পারে। স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন দেখতে কার না ভালো লাগে। সেটা যদি হয় ‘যুদ্ধবিমান’ বিষয়ক কোনো নিদর্শন–তাহলে কৌতূহলের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তেমনই কৌতূহলের এক জাদুঘর ‘বাংলাদেশ বিমান জাদুঘর’। 

যেখানে রয়েছে ডাকোটা বিমানসহ অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। অনেক দিন ধরে শুধু পরিকল্পনাই করে যাচ্ছিলাম বিমান বাহিনী জাদুঘর ঘুরতে যাব। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে হয়ে উঠছিল না। শেষ পর্যন্ত আমি আর পৃথু বের হলাম ভ্রমণ গন্তব্যের পানে। শুক্রবার বলে রাস্তায় তেমন যানজট নেই বললেই চলে। 

প্রায় ৩৯ মিনিটেই আমরা এসে উপস্থিত হলাম জাদুঘরের প্রবেশদ্বারে। শুরুতেই কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নিলাম। জাদুঘরের বাইরে দিকটা দেখে আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ছোটখাটো একটি পরিসরের মধ্যে এটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করার পর বুঝতে পারলাম এটি আয়তনের দিক থেকে বেশ বড়।

জাদুঘরটি বিশাল জায়গাজুড়ে অবস্থিত এবং এখানে একটি ছোটখাটো বিনোদনকেন্দ্রও আছে। নরম ঘাসের ওপর দিয়ে পদব্রজে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। অন্য সব জাদুঘর থেকে এ জাদুঘরটি আলাদা। এটি কোনো বদ্ধ ঘরে নয়। 

খোলামেলা সবুজ প্রান্তরে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে এ ঐতিহাসিক জাদুঘর। জাদুঘরের মধ্যে প্রবেশ করলে চোখে পড়ল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বিমান বাহিনীর গৌরবের জঙ্গিবিমান, হেলিকপ্টার ও রাডার। আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। আমরা দর্শনীর বিনিময়ে চেপে বসলাম হেলিকপ্টারে। ছোটবেলায় খুব আগ্রহ ছিল কীভাবে বিমান আকাশে ঘুরে বেড়ায়। 

একজন আমাদের বলছিলেন কীভাবে হেলিকপ্টার আকাশে ডানা মেলে। আজ নিজের চোখে দেখতে পেলাম। মোট ১৯টি বিমান এবং ৩টি রাডার রয়েছে এ জাদুঘরে। যুদ্ধবিমান ডাকোটার পাশাপাশি রয়েছে ‘অ্যালিউট’ হেলিকপ্টার। এটি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনীর সেনানিবাসে আঘাত হানা হয়েছিল। মূল গেট থেকে খানিক এগোলে চোখে পড়ল বিশাল একটি বিমান।

 

বাংলাদেশের প্রথম পরিবহন উড়োজাহাজ এটি। রাশিয়ার তৈরি এন-২৪ বিমানটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে ১৯৭৩ সালে ‘বলাকা’ নামে সংযোজিত হয়। বিমানটির যাত্রী ধারণক্ষমতা ৪৪ জন। বলাকায় দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগও রয়েছে। বলাকা ছাড়াও আরও তিনটি বিমানে দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। বিমানগুলোয় প্রবেশের জন্য টিকিট মূল্য ৩০ টাকা। বিমানগুলোয় প্রবেশ করলে প্রদর্শন করা হয় বিমান বাহিনীর ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র। দেখা পেলাম হান্টার বিমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিমানটি দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের ওপর হামলা চালানো হতো। ওই সময়ে এটি খুবই শক্তিশালী এবং নির্ভরশীল বিমান ছিল। 

বিমান বাহিনীতে ১৯৮৯ সালে চীনের তৈরি ‘এফটি-৭ বিমান’ যুদ্ধবিমান হিসেবে প্রথম সংযোজিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৮৬ যুদ্ধবিমানটি ব্যবহার করে। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়ে বিমানটিকে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। পরে বিমান বাহিনীর প্রকৌশল কর্মকর্তা ও টেকনিশিয়ানরা বিমানটি মেরামত করেন এবং ১৯৭২ সালে সফলভাবে উড্ডয়ন করান। বিমানটি ১৯৪৭ সালের তৈরি। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় ৪ ডিসেম্বর বিমান বাহিনীর বৈমানিকরা কানাডায় নির্মিত অটার-৭২১ বিমান দিয়ে হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে আঘাত হানে। সেটিও আছে এই জাদুঘরে। রয়েছে মিগ-২১ এফএল বিমান। বিমানটি প্রধানত আকাশ প্রতিরক্ষা ও ভূমি পাহারার জন্য ব্যবহৃত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এ বিমানটি আকাশ প্রতিরক্ষা ও আকাশ থেকে ভূমিতে আক্রমণের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখে। ‘ন্যাট-৯১৬ বিমান’ জঙ্গিবিমানগুলোর মধ্যে সর্বাধিক হালকা এবং আয়তনে ছোট।

১৯৫০ সালে ভারতীয় বিমান বাহিনীতে এটি অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। সে সময়ে ন্যাট বিমান আকাশযুদ্ধে অত্যন্ত চৌকস বিমান হিসেবে পরিচিতি ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে তিনটি ন্যাট বিমান পাকিস্তানের তিনটি স্যাবর জেট (এফ-৮৬) ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর বগুড়ায় আকাশযুদ্ধে এ বিমানটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে। জাদুঘরে স্থাপিত প্রতিটি নিদর্শনের সঙ্গে আছে তথ্যাবলি। আগ্রহীরা তা থেকে জেনে নিতে পারেন প্রয়োজনীয় তথ্য। 

মুক্তিযুদ্ধে বিমান বাহিনীর শহিদদের স্মরণ করতে তৈরি করা হয়েছে শহিদ কর্নার। জাদুঘরে দর্শনার্থীদের খাবারের সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রাঙ্গণের দক্ষিণ দিকে নির্মাণ করা হয়েছে একটি ফুড কোর্ট। এছাড়া বিমান বাহিনীর বিভিন্ন দ্রব্যাদি দিয়ে সজ্জিত হয়েছে স্যুভেনির শপ ‘নীলাদ্রি’। শিশুদের মনোরঞ্জন ও উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য শিশু পার্কের পাশাপাশি ফুটপাথের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে জিরাফ, শিম্পাঞ্জি, হরিণ ইত্যাদি নানা রকম পশুপাখির প্রতিকৃতি। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘চিলড্রেন হেভেন’। রয়েছে পানির ফোয়ারাও। এছাড়া পাহাড়ের আদলে তৈরি হচ্ছে ‘থিম পার্ক’।

বিমান জাদুঘরের সময়সূচি
বিমান বাহিনী জাদুঘর সোম থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং শুক্র থেকে শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি।


বিমান জাদুঘরের টিকিট মূল্য
৫০ টাকা মূল্যের টিকিট সংগ্রহ করে জাদুঘরে প্রবেশ করা যায়। মাত্র ৩০ টাকায় বিমান ভ্রমণ! এখানে ৩০-১০০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে ভেতরের হেলিকপ্টার বা বিমানে ওঠা যায়।

কীভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে আগারগাঁও চলে আসুন। রাজধানীর গুলিস্তান থেকে বিহঙ্গ, হিমাচল, স্বাধীন, হাজি ট্রান্সপোর্ট, ইটিসি ট্রান্সপোর্টসহ অনেক বাসে আগারগাঁও যেতে পারবেন। বিমান বাহিনী জাদুঘর বললেই নামিয়ে দেবে। এছাড়া রামপুরা থেকে হিমাচল, আলিফ পরিবহনেও যেতে পারবেন। কিংবা নিজস্ব পরিবহন বা সিএনজি নিয়ে ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে সহজে যেতে পারবেন।

/এমটি

পদ্মার জলের হাতছানি...

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০২:২২ পিএম
আপডেট: ২৩ মে ২০২৬, ০২:২২ পিএম
পদ্মার জলের হাতছানি...

রাজধানীর কোলাহল ছেড়ে একদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে যেতে চাইলে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। সেখানে গেলে পদ্মার সৌন্দর্য যেমন আপনাকে মোহিত করবে, তেমনি খেতে পাবেন পদ্মার তাজা ইলিশ। আমরা সাধারণত পরিচিত জায়গা ছাড়া ঘুরতে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি না। নিরাপত্তার কারণেও আমরা অনেক জায়গায় যেতে চাই না। 

যান্ত্রিক নগরী ঢাকার আশপাশে ঘোরার জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেকে ছুটির দিনগুলো ঘুমিয়েই কাটান। অনেকের আবার ঘুরতে যাওয়ার আগে কত কিছু চিন্তা করতে হয়! সময়, পর্যাপ্ত অর্থ এবং ভালো ভ্রমণ সঙ্গী নিয়ে একটা চিন্তা থেকেই যায়।

হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ও সময় নেই দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার, অথচ নিজেকে প্রাণবন্ত করার জন্য একটু নান্দনিক এবং মনোরম পরিবেশের প্রয়োজন। তাই হন্যে হয়ে খুঁজছেন ঢাকার আশপাশেই কোনো মনোরম পরিবেশ।

এমন সবকিছুর সমাধান দিতে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। আমি খুব ঘুমপ্রিয় মানুষ, তাই শুক্রবার এলেই দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। কয়েক দিন ধরে চিন্টু কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছিল ওকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। 

গত শুক্রবারও ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ার জন্য কোথাও যেতে পারিনি আর সেই ধারাবাহিকতায় আজও দেরি করে উঠেছি ঘুম থেকে। এদিকে চিন্টুর মন খুব খারাপ, আজও যেতে পারল না কোথাও। 

আমি মনে মনে ভাবলাম ছোট মানুষ বেশ কিছুদিন ধরে বায়না ধরেছে ঘুরতে যাবে, তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া উচিত। এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুকের কল্যাণে মৈনট ঘাটের নাম শুনছিলাম। তাই ভাবলাম দূরত্ব কম যেহেতু তাই বিকেল বেলাতেই চিন্টুকে নিয়ে বের হব। এখন আর কিছু না বলে চিন্টুকে সারপ্রাইজে দেব। 

কাল বেলা ব্যাংকের কিছু কাজ ছিল তা শেষ করলাম দুপুর হতেই চিন্টুকে বললাম বিকেল ৩টার মধ্যে রেডি থাকিস। ঠিক বিকেল ৩টায় আমরা গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের সামনে থেকে মৈনট ঘাটের উদ্দেশে বাসে রওনা হলাম।

শুক্রবার তাই যান্ত্রিক শহরের কোলাহল কিছুটা হলেও কম আমাদের ফিটনেসবিহীন বাস এগিয়ে চলছে গন্তব্যস্থলে। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছালাম মৈনট ঘাটে। চিন্টু তো মৈনট ঘাটে এসে খুব খুশি দোহারের কার্তিকপুরের যে জায়গাটি পদ্মাপাড়ে গিয়ে মিশেছে তার নাম মৈনট ঘাট। এখানে ডানে-বাঁয়ে বালু চিকচিক করা স্থলভূমি থাকলেও সামনে শুধু রুপার মতো চকচকে পানি।

মৈনট পদ্মাপাড়ের একটি খেয়াঘাট। এখান থেকে প্রতিদিন ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল করে। খেয়া পারাপারের জন্য জায়গাটির পরিচিতি আগে থেকেই ছিল। তবে এখন সেটা জনপ্রিয় বেড়ানোর জায়গা হিসেবেও।

এত দিন অনেকটা আড়ালে থাকলেও ঢাকার কাছে বেড়ানোর ‘হটস্পট’ এখন এই মৈনট ঘাট। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া মৈনট ঘাটের নতুন নাম হলো–মিনি কক্সবাজার! বিস্তীর্ণ জলরাশির ঢেউ আর সঙ্গে শরতের নির্মল আকাশ–এ এক অনবদ্য কাব্য। ছুটির দিন তাই অনেক মানুষের পদচারণে মুখর মৈনট ঘাট। জন মানবের পদচারণা দেখে মনে হলো নগরবাসীর কাছে নতুন এক নির্মল বিনোদনের স্থান। 

মিনি কক্সবাজারের তীরে আমরা হেঁটে বেড়াচ্ছি। খানিক পরপর মাছ ধরার ট্রলার ছুটে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ মাছ ধরার নৌকা দেখে মাছ কেনার জন্য এগোচ্ছেন। দরদাম ঠিক থাকলে অনেক ভ্রমণপিপাসু মাছ কিনে নিচ্ছেন। পুরো নদীর তীর ও তার আশপাশের এলাকা সমুদ্রসৈকতের মতো করে সাজানো। হঠাৎ চিপসের প্যাকেট পড়ে আছে দেখে খুব খারাপ লাগল, আমরাই আমাদের পরিবেশকে দূষিত করছি। 

পদ্মা এত বিশাল যে, ওপারের কিছুই দেখা যায় না, দেখা যায় না ডান-বাঁয়ের কোনো বসতি। নদীর পারে ট্রলার ও স্পিডবোটের মহাজনদের মেলা। আপনি চাইলে ট্রলারে চেপে ওপারের চরভদ্রাসন থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। আবার ঘণ্টা চুক্তিতে ট্রলার বা স্পিডবোট ভাড়া করে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়াতে পারেন। 

যা-ই করেন এখানে সময়টা কিন্তু বেশ কাটবে। আমরা ট্রলারে চেপে বসলাম ঘুরে বেড়ালাম প্রমত্ত পদ্মায়। আমাদের ট্রলারের মাঝি রহিম মিয়া বললেন এখানে সকালবেলাটা খুব ভালো কাটে, দুপুর কিছুটা মন্থর, তবে বিকেলবেলা অনেক বেশি জমজমাট। 

সোনা রোদের গোধূলিবেলার তো কোনো তুলনাই চলে না। নদীতে পাল তোলা নৌকার ঘুরে বেড়ানো আবার কখন উথাল-পাতাল ঢেউ–এ এক অন্য রকম অনুভূতি। দেখতে দেখতে সূর্য দেবের বিদায়বেলা চলে এল, সূর্য দেবের বিদায়বেলায় প্রকৃতি অসাধারণ রূপ ধারণ করেছে। নদীতে ভ্রমণ শেষে চিন্টু ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়ার বায়না ধরল। তাই তাকে নিয়ে ঘাটে অবস্থিত একটি হোটেলে গেলাম। সেখানে ইলিশ মাছ ভাজা খেলাম—কী অসাধারণ স্বাদ। এখানে ইলিশ ১৩০ থেকে ১৯০ টাকা। বড় সাইজের ইলিশ খেতে চাইলে আগেই অর্ডার দিতে হবে আপনাকে। 

কীভাবে আসবেন
ঢাকা থেকে মৈনট ঘাটে আসার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়টি হচ্ছে গুলিস্তানের গোলাপ শাহের মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাস। 
৯০ টাকা ভাড়া আর দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আপনি পৌঁছে যাবেন মৈনট ঘাট। মৈনট থেকে ঢাকার উদ্দেশে শেষ বাসটি ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬টায়। যারা প্রাইভেট কার অথবা বাইক নিয়ে আসতে চাচ্ছেন, তারা এই বাসের রুটটাকে ব্যবহার করতে পারেন। আসতে সুবিধা হবে।
 
সচেতনতা 
মৈনট ঘাটে সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যদি আশপাশে ময়লা দেখতে পান তাহলে নিশ্চয় আপনার ভালো লাগবে না। তাই পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে। যেখানে-সেখানে পানির বোতল, চিপস-বিস্কুটের প্যাকেটসহ কোনো ময়লা ফেলা যাবে না। আপনি নিজে যেমন ফেলবেন না, তেমনি কাউকে ফেলতে দেখলে তাকে নিরুৎসাহিত করাটাও আপনার দায়িত্ব। আরেকটি কথা সাঁতার না জানলে গোসল করার সময় পদ্মার বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো।

/এমটি

ঐতিহ্যের খোঁজে গ্রিনিচ শহরে

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০১:০৮ পিএম
ঐতিহ্যের খোঁজে গ্রিনিচ শহরে

বেরিয়ে পড়েছি কেন্টের উদ্দেশে। কেন্ট হাসপাতালের প্রথিতযশা চিকিৎসক ডা. শাহাদত হোসেন ও ভাবির আমন্ত্রণে আমরা ছয়জন ছুটছি লন্ডন ছেড়ে কেন্টের উদ্দেশে। সম্পর্কে চিকিৎসক সাহেব আমার ভাসুর। গাড়ি চালাচ্ছে আমার সহোদর ব্যারিস্টার মুয়ীদ খান, আইন পেশায় সেন্ট্রাল লন্ডনে তার দীর্ঘ প্রবাসজীবনে দুবার নিজের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করেছেন লন্ডন ও ওয়েলসের ২০ হাজার আইনজীবীর মধ্যে নির্বাচিত ‘বেস্ট হিউম্যান রাইটস ল’ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। আগেই পরিকল্পনা করা হয়, আমরা গ্রিনিচ শহর দেখতে দেখতে কেন্ট শহরে ঢুকব। 

ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি শহরের নাম গ্রিনিচ। এটি লন্ডনের চেয়ারিং ক্রস জাংকশন থেকে ৫ দশমিক ৫ মাইল পূর্ব-দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত। কয়েক শ’ বছর ধরে এটি কেন্ট প্রদেশের একটি শহর ছিল এবং প্রদেশটি ভেঙে গেলে পরবর্তী সময়ে গ্রেটার লন্ডনের অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চল হয়। গ্রিনিচের সমুদ্রের সঙ্গে জড়িত ইতিহাস, অসংখ্য ‘টিউডর’ রাজবংশের জন্মস্থান এবং গ্রিনিচ মানমন্দিরের জন্য এ শহরটি বিখ্যাত। ১৮ শতকে এটি ভ্রমণকারীদের জন্য একটি জনপ্রিয় স্থানে পরিণত হওয়ায় এখানে অনেকগুলো ম্যানসনের মতো বড় বড় বাড়ি, প্রাসাদ ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রিনিচের সঙ্গে সম্পর্কিত সমুদ্র সংযোগগুলো বিংশ শতাব্দীতে উদযাপিত হয়। এই স্থানের ওপর দিয়ে মূল মধ্য রেখা অতিক্রম করেছে। এখানে পৃথিবীর স্ট্যান্ডার্ড সময় গণনা করার মান মন্দির অবস্থিত।

আমরা নামলাম হক্সমুরের নকশায় সেন্ট আলফেজ চার্চটি দেখতে। ঐতিহাসিক স্থাপনা এটি। গ্রিনিচের টাউন সেন্টারের পশ্চিমে যা ১৭১৪ সালে নির্মাণ করা শুরু হয়ে ১৭১৮ সালে সম্পন্ন হয়। একটি নারকীয় ও জঘন্যতম হত্যার শিকার হন সেন্ট আলফেজ। জানা যায়, অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিখ্যাত একটি জাতির নাম ভাইকিং যারা দক্ষিণ স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আগত এবং সমগ্র ইউরোপ থেকে শুরু করে পশ্চিমের আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড, ভিনল্যান্ড পর্যন্ত এরা জলদস্যুতা, লুটতরাজ ও কিছু কিছু সময় ব্যবসা-বাণিজ্য চালনা করত।

সামরিক শাসনামলে কেন্ট প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এই ভাইকিং বাহিনীর বিশাল শিবির স্থাপিত হয় এবং এ বাহিনী এক সময় কেন্ট আক্রমণ করে। ১০১২ সালে তারা কান্টারবেরি শহর দখল করে এবং অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতের কান্টারবেরির একজন বিখ্যাত বিশপ আলফেজকে বন্দি করে নিয়ে যায় যাকে গ্রিনিচের সেনাশিবিরে প্রায় সাত মাস ধরে বন্দি করে রাখা হয় (সে সময় গ্রিনিচ কেন্ট প্রদেশের অংশ ছিল)। আলফেজের কাছ থেকে তারা মুক্তিপণ হিসেবে বিরাট অঙ্কের পাউন্ড দাবি করে কিন্তু আলফেজ তা দিতে রাজি হননি।

ফলে ইস্টার সানডের যে আট দিনব্যাপী ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় তাদের মধ্যে একটি শনিবারে মৃত্যুদণ্ড হিসেবে আলফেজের গায়ে তারা পশুর হাড় ও মাথা নিক্ষেপ করতে শুরু করে, একপর্যায়ে কুঁড়ালে গাঁথা এরকম একটি হাড় তার মাথার খুলি ফুটো করে ঢুকে যায় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করার পরও শেষ হাড়টি তার রক্তে না ভেজা পর্যন্ত তারা তাকে আঘাত করে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর আলফেজকে সেন্ট উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং ১২ শতকে প্যারিশ চার্চ তার নামে উৎসর্গ করা হয়।

গ্রিনিচ ও এর আশপাশের নদীগুলো বেশ গভীর। গ্রিনিচের দক্ষিণ দিকের অঞ্চলটি গ্রিনিচ পার্ক থেকে ব্ল্যাকহেথ পর্যন্ত খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে গেছে, যার সর্বোচ্চ উচ্চতা ১০০ ফিট। দেখতে পাচ্ছি এখানকার উচ্চতর এলাকাগুলো এক ধরনের পাথুরে পাললিক মাটির স্তর দিয়ে গঠিত। এই মাটিকে ব্ল্যাকহেথ বেড বলা হয়। আসলে টেমস নদীর অববাহিকার দক্ষিণদিকের একটি প্রশস্ত প্ল্যাটফর্মের ওপর গ্রিনিচ অবস্থিত। গ্রিনিচ মূলত শীতপ্রধান এলাকা।

গ্রিনিচ মানমন্দির (Royal Observatory, Greenwich) ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। রয়্যাল অবজারভেটরি গ্রিনিচ পার্কের চূড়ায় অবস্থিত। এটি একটি ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এটির দ্রাঘিমাগত মান ০° অর্থাৎ এর ওপর মূলমধ্যরেখা গেছে। দিক নির্ণয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও স্থান। গ্রিনিচ মানমন্দির শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি সময় এবং স্থানের বৈজ্ঞানিক নির্ণয়ের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু। গ্রিনিচের মান মন্দির (রয়্যাল অবজারভেটরি), ন্যাশনাল মেরিটাইম জাদুঘর, রানির বাড়ি ও ক্যাটি সার্ক একত্রে রয়্যাল মিউজিয়াম গ্রিনিচ নামে পরিচিত। 

প্রাইম মেরিডিয়ান ও জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ পৃথিবীর সময় অঞ্চল এবং মানচিত্র তৈরিতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। এটির সময়কে প্রমাণ ধরে অন্যান্য জায়গার সময় নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা যায়। এটির সাহায্যে অন্যান্য স্থানের দ্রাঘিমাগত মান নির্ণয় করা যায়। ১৬৭৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রিনিচ মানমন্দিরটি জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং সময় গণনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এখান থেকেই পৃথিবীর সময় অঞ্চলগুলোর জন্য আদর্শ সময় বা গ্রিনিচ মান সময় (Greenwich Mean Time - GMT) নির্ধারণ করা হয়।

এই মানমন্দিরের মধ্যে প্রাইম মেরিডিয়ান অবস্থিত, যা পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধে ভাগ করেছে। জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ হিসেবে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই স্থানটি বর্তমানে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত এবং এখানে বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞানের সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়। গ্রিনিচ মান ০° অবস্থিত ধরে বাংলাদেশের অবস্থান ৯০° পূর্বে অর্থাৎ বাংলাদেশের সময় ৯০×৪ = ৩৬০ মিনিট বা ৬ ঘণ্টা আগে। তাই বলা যায় গ্রিনিচ সময়ের সঙ্গে ছয় ঘণ্টা যোগ করলে বাংলাদেশের সময় হয়।

প্রাইম মেরিডিয়ান পৃথিবীর দ্রাঘিমাংশের (longitude) জন্য জিরো ডিগ্রি রেখা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৃথিবীর ভূভাগকে পূর্ব গোলার্ধ ও পশ্চিম গোলার্ধ এই দুই ভাগে ভাগ করে। গ্রিনিচ মেরিডিয়ানকে ১৮৮৪ সালে আন্তর্জাতিকভাবে প্রাইম মেরিডিয়ান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি লন্ডনের গ্রিনিচ মানমন্দিরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। মজার বিষয় হলো, মেরিডিয়ান রেখা একটি সরলরেখা হলেও প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে পাঠানোর সময় কিছুটা ঝিকঝাক রয়েছে। এর মূল কারণ, সময় অঞ্চলের পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার (International Date Line) সংযোগ নিশ্চিত করা।

প্রাইম মেরিডিয়ানের বিপরীত দিকে ১৮০° দ্রাঘিমাংশে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা অবস্থিত। এটি দিন এবং সময়ের হিসাব নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারিখ রেখা অতিক্রম করলে সময় এক দিন যোগ বা বিয়োগ হয়। পৃথিবী ঘুরতে ২৪ ঘণ্টা সময় নেয় এবং এই ২৪ ঘণ্টা ৩৬০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ডিগ্রি অতিক্রম করতে সময় লাগে চার মিনিট। তাই, পৃথিবীর নির্দিষ্ট স্থানে সূর্য ওঠা এবং অস্ত যাওয়ার সময় আলাদা হয়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরে প্রবেশ করতেই দেখতে পাই একটি সুন্দর বাগান। বাগানের কেন্দ্রে দুটো ডলফিনের মূর্তি রয়েছে, যা একটি সূর্য ঘড়ি। এই সূর্য ঘড়ির সাহায্যে প্রাকৃতিক সূর্যালোকের ভিত্তিতে সময় নির্ণয় করা হয়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর টেলিস্কোপ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের সরঞ্জাম। এখানে দুটি প্রাথমিক টেলিস্কোপ রয়েছে, যা ১৭ ও ১৮ শতকে ব্যবহৃত হতো। এই টেলিস্কোপগুলো বসিয়েছিলেন প্রথম জ্যোতির্বিদ জন ফ্ল্যামস্টিড। গ্রিনিচ মানমন্দিরে একটি ক্যামেরা অবস্কিওরা রয়েছে, যা প্রথম দিকের জ্যোতির্বিদ্যার এক অনন্য উদ্ভাবন। এটি সূর্যের প্রতিবিম্ব এবং কুইন্স হাউসের পিলারগুলোর প্রতিফলন পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো।

প্রাইম মেরিডিয়ানে দাঁড়ানো একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। মাটিতে তামার পাতের মাধ্যমে চিহ্নিত জিরো ডিগ্রি রেখা পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়। কেউ যদি ডান পা তামার পাতের পূর্ব দিকে এবং বাম পা তামার পাতের পশ্চিম দিকে রাখেন, তাহলে একসঙ্গে দুই গোলার্ধে দাঁড়িয়ে থাকার এক অনন্য অসাধারণ অভিজ্ঞতা লাভ করবেন। আমার দুই ছেলে খুব মজা পেল এই অভিজ্ঞতা নিতে গিয়ে। পা পাল্টে পাল্টে তারা মজা নেয় এবং ছবি তুলে স্মৃতিবন্দি করে আনন্দমুহূর্তগুলো। 

এই স্থান ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাজা প্রথম উইলিয়ামের সময়কাল থেকে। গ্রিনিচ প্রাসাদ, যেটি বর্তমানে মেরিটাইম জাদুঘর; রাজা অষ্টম হেনরি ও তার কন্যা প্রথম মেরির জন্মস্থান। প্রথম এলিজাবেথ ও ট্যুডররা গ্রিনিচ প্রাসাদ তাদের হান্টিং লজ হিসেবে ব্যবহার  করতেন। গ্রিনিচের এই প্রাসাদ দুর্গটি রাজা অষ্টম হেনরির বিশেষ প্রিয় ছিল। তার উপপত্নীদের আবাসস্থল ছিল এটি। মূল প্রাসাদ থেকে এখানে তিনি সহজেই যাতায়াত করতে পারতেন বলে এটি তার বিশেষ প্রিয় জায়গা ছিল।

১৮৮৪ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে গ্রিনিচ মেরিডিয়ানকে প্রাইম মেরিডিয়ান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এতে ২৫টি দেশের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন এবং আন্তর্জাতিক আলোচনা স্থলে স্থির হয়ে যে লন্ডনের গ্রিনিচ মানমন্দিরের ওপর দিয়ে যে দ্রাঘিমা রেখা গেছে সেটাই হবে মূল দ্রাঘিমারেখা মূল মধ্যরেখা। তৎকালীন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বৈশ্বিক প্রভাব ছিল। পৃথিবীর অধিকাংশ নাবিক এবং মানচিত্র গ্রিনিচকে সময়ের জন্য ব্যবহার করছিল।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নত কেন্দ্র হিসেবে গ্রিনিচের ভূমিকা অপরিসীম। গ্রিনিচ পরিদর্শনের একটি আকর্ষণীয় উপায় হলো লন্ডনের ক্যাবল কারে চড়া। এটি টেমস নদীর ওপর দিয়ে চলে এবং দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে। নদী পারাপারের সময় লন্ডনের নানা মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরের উপরিভাগ থেকে লন্ডনের স্কাইলাইন অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। এখান থেকে ক্যানারি ওয়ার্ফ, লন্ডন আই এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গ্রিনিচ মানমন্দির শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি সময় এবং স্থানের বৈজ্ঞানিক নির্ণয়ের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু। ভবনটিকে সহসাই ‘ফ্ল্যামস্টিড হাউস’ নামেই ডাকা হতো। বর্তমান সময়ে সায়েন্টিফিক কাজকর্মগুলো অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তাই গ্রিনিচের এই ভবনটি এখন মূলত জাদুঘর হিসেবেই বিবেচ্য হচ্ছে। স্থানটি ভ্রমণপিপাসীদের জন্য একটি দর্শনীয় স্থান বটে। হাজার হাজার মানুষ এখানে ঘুরতে ও দেখতে আসেন। মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক বিবেচনায় এটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। পর্যটকদের জন্য গ্রিনিচ একটি অনন্য গন্তব্য, যেখানে ঐতিহ্য, বিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধন ঘটে।

/এস লুপিন

বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভিসা ছাড়াই দেশ ভ্রমণের সুযোগ

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম
আপডেট: ০৯ মে ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভিসা ছাড়াই দেশ ভ্রমণের সুযোগ
ছবি: সংগৃহীত

সেশেলেস (Seychelles) বিশ্ব ভ্রমণে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে আমার ১৫৯তম দেশ। সেশেলস–১১৫টি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দেশ। প্রথমে আমি এই দেশের নাম শুনে ভেবেছিলাম, এটা বুঝি কোনো বড় ফ্রেঞ্চ কলোনি। কিন্তু পরে জানতে পারি, এটি ১৯৭৬ সালের ২৯ জুন ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। যদিও তার আগে বহু বছর ফরাসিদের শাসনে ছিল। তাই এখানকার প্রধানত ভাষা ফরাসি, পাশাপাশি ইংরেজি ও ক্রেওলও প্রচলিত।

বাংলাদেশ থেকে যখন বের হয়েছিলাম তখনই ইচ্ছা ছিল আলজেরিয়ায় যাব, কিন্তু হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়ায় মার্চ মাসে থাকার সময় ইরান যুদ্ধ বেধে গেল, সেজন্য ইমিরেটস কিংবা কাতার এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করা দুষ্কর হয়ে গেল। 

তখনই মাথায় এল সেশেলেস দেশটি, যা বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন। যখনই চিন্তা সঙ্গে সঙ্গেই টিকিট কাটব, তারপর হঠাৎ মনে পড়ল আমাদের বাংলাদেশ থেকে এর আগে কে ভ্রমণ করেছে? ফেসবুক ঘেঁটে দেখলাম, Flyer ট্রাভেল এক্সপ্রেসের সুমন বাহাদুর ভাই বেড়াতে গিয়েছিলেন। তার কাছ ফোন করলেই টিকিট কাটার আগেই তিনি বললেন, ১০ ইউরোতে একটি অন অ্যারাইভাল পারমিট নিতে হয়। 

তারপর আমি অনলাইনে টিকিট কেটে ব্যাংকক থেকে ইন্ডিগোয় চেপে বসলাম এই নতুন দেশের উদ্দেশে। ফ্লাইটে ভাড়া অবশ্য খুব বেশি নয়, আফ্রিকার কোনো দেশে যাওয়ার জন্য। 

তারপর ২৪ মার্চ চলে এলাম এই দেশে। এয়ারপোর্টে নেমেই অন্য রকম একটা ভালো লাগা কাজ করল। সিকিউরিটির লোকরা হোটেলগুলো একটু যাচাই-বাছাই করে নিল। তারপর সহজেই চলে গেলাম মাহি এয়ারপোর্ট দিয়ে। হোটেল থেকে আগে থেকেই ট্রান্সপোর্ট বলা ছিল ৭৫ ইউরো, যা আমার জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। নীল সমুদ্রের সুন্দর রিসোর্টে চলে গেলাম। থাকা হলো প্রায় ১১ দিন।

এই দেশটি আফ্রিকার অনেক দেশের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত নয়–এটি আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি। এখানকার ট্যুরিজম মন্ত্রণালয় ও লেবার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ হয়েছিল এবং তাদের আন্তরিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়।

দেশটি আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য–নীল সমুদ্র, বিশাল পাথরের গঠন, সবুজ পাহাড়ে ঘেরা সাদা বালুর সৈকত আর সারি সারি পাম গাছ চোখধাঁধিয়ে দেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কচ্ছপগুলোরও দেখা মেলে এখানে, যা সত্যিই অসাধারণ।

সেশেলসের রাজধানী ভিক্টোরিয়া–বিশ্বের সবচেয়ে ছোট রাজধানীগুলোর একটি। মাহে (Mahé) দ্বীপে এয়ারপোর্টটি অবস্থিত, যদিও এটি আকারে ছোট। আমি যতগুলো আফ্রিকার দেশ ভ্রমণ করেছি, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে ধনী বলে মনে হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য যাচাই করেও দেখা যায়, এটি আফ্রিকার অন্যতম ধনী দেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে উন্নত। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার স্থানীয় এবং বাকিরা প্রবাসী কর্মী।

এখানকার গড় বেতন প্রায় ৬২০ ইউরো, যা ইউরোপের কিছু দেশের সমতুল্য। মজার বিষয় হলো, এখানে নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি, একটি পুরুষ ও তিনটি নারী এবং তারা আধুনিক, আত্মনির্ভরশীল ও শিক্ষিত। তারা খুবই উদার, আনন্দপ্রিয় ও সহজ-সরল। অনেক সময় মনে হয় না যে আমি আফ্রিকায় আছি—বরং ইউরোপের কোনো দ্বীপে আছি।

এখানকার প্রায় সব পণ্যই আমদানি করা হয়, তাই জীবনযাত্রার খরচ একটু বেশি। যেমন–একটি টমেটোর দামই প্রায় ১৪০ টাকা! শ্রমিকের সংকট থাকায় সবকিছুর দামই তুলনামূলক বেশি। তবু দেশের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত এবং নিয়ম-শৃঙ্খলা খুব ভালো।

বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে এখানে শ্রমবাজারে ভালো সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর হানিমুনের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম সুন্দর একটি গন্তব্য। অনেকেই মালদ্বীপ ঘুরে ফেলেছেন–তাদের জন্য সেশেলস হতে পারে চমৎকার বিকল্প।

এখানে বেশির ভাগ হোটেলে সেলফ-ক্যাটারিং সুবিধা আছে, অর্থাৎ আপনি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে নিজেই রান্না করতে পারেন। অনেক হোটেলেই হালাল খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা লাগে না–শুধু হোটেল বুকিং, রিটার্ন টিকিট এবং অনলাইনে আগমনী কার্ড পূরণ করলেই হয়।

তবে বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য এটি সাশ্রয়ী নয়। সেলফ-ক্যাটারিং হোটেলের খরচ প্রতিদিন ১২০ থেকে ২০০ ইউরো (দুজনের জন্য)। আর বিলাসবহুল হোটেলগুলোর দাম ৪৫০ ইউরো থেকে শুরু করে ৪০০০ ইউরোরও বেশি হতে পারে। খাবারে প্রায় ২৫ ইউরো (প্রতি ব্যক্তি) খরচ হয়।

আমি এখানে কয়েকটি দ্বীপে ঘুরেছি–প্রাসলিন আইল্যান্ড ছিল দারুণ সুন্দর। Les Ducs Resort এবং Paradise Sun হোটেলগুলো বেশ ভালো লেগেছে, তুলনামূলক কম খরচে ভালো সেবা দেয়। প্রথমে আমি থেকেছিলাম টাকামাকা বিচে, মাহে দ্বীপে–সেটিও অসাধারণ। বোভালন সৈকত খুবই আকর্ষণীয়, যেখানে বিচ শ্যাক ও বোট হাউস রেস্টুরেন্টে ভালো খাবার পাওয়া যায় এবং সন্ধ্যাটা খুব সুন্দরভাবে কাটানো যায়। এখানে জাতীয় ফল কিংবা জাতীয় প্রতীক কোকো।

যে গাছটি চমৎকার, ছেলে ও মেয়ে দুটি গাছের সমন্বয় এখানে ফল ধারণ করে। মেয়ে গাছটির ফলের গঠন মেয়েদের শরীরের নিম্নাংশের মতো, যা একটি নারী গোপন অংশের মতো দেখতে আর ছেলে গাছটির লিঙ্গটি দেখতে ঠিক পুরুষের লিঙ্গের মতো। এই গাছটির ফল ধরে সবুজ রঙের একটি লেজার আছে, তার মাধ্যমে সে ছেলে গাছটির কাছ থেকে এক ধরনের সাদা পাউডার খেয়ে মেয়ে গাছটির কাছে গিয়ে তার গোপন অংশের চেটে পাউডার ছড়ায়, তারপর সেখানে ফল ধরে। এই গাছটি পৃথিবীতে অনন্য হওয়ায় একে তাদের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।

এখানে বেশ কিছু ক্যাসিনো রয়েছে, যেখানে তুলনামূলক কম খরচে ভালো খাবার পাওয়া যায় এবং পরিবেশও উপভোগ্য–খেলার জন্য নয়, বরং সময় কাটানোর জন্য। তবে অবাক হয়েছি ক্যাসিনোগুলোয় বাংলাদেশি শ্রমিকে ভর্তি, বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবার রাতে। তাছাড়া মাছ ধরার বড় বড় ট্যুর রয়েছে, যারা সমুদ্রে বড় মাছ ধরতে চান তাদের জন্য এটি চমৎকার অভিজ্ঞতা হতে পারে। সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা ছিল ফ্রুট ব্যাট খাওয়া–৪৫ ইউরো দিয়ে খেয়েছিলাম। মাংসের স্বাদটা একটু মিষ্টি, আর রান্নাটাও ছিল চমৎকার। যারা ভিন্নধর্মী খাবার পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি দারুণ অভিজ্ঞতা হতে পারে।

এখানে বড় কোনো শপিং মল নেই, তাই শপিংয়ের ঝামেলা ছাড়া নিরিবিলিতে হানিমুন বা পারিবারিক সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ। আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই অসাধারণ যে ছবি তুলতে তুলতে হাতই ব্যথা হয়ে যেতে পারে! সব মিলিয়ে, যারা বাংলাদেশি পাসপোর্টে সহজে ভ্রমণ করতে চান, তাদের জন্য সেশেলস একটি অসাধারণ গন্তব্য হতে পারে। আমার এই দুই সপ্তাহের ভ্রমণ ছিল সত্যিই স্মরণীয়।

/এমটি

প্রশান্তির খোঁজে ক্যামেলিয়া লেক

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০০ পিএম
প্রশান্তির খোঁজে ক্যামেলিয়া লেক

আমাদের রাহাত ভাইয়ের পঙ্খীরাজে করে এগিয়ে চলছি নতুন গন্তব্য পানে। বাগানের রাস্তা কোথাও পিচঢালা, কোথাও মাটির। চা বাগানের চা গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। রাহাত ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের। 

তিনি বললেন গেলে পরে দেখবেন। আমরা চলছি নতুন পথে সূর্যদেব গাছের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছেন। কিছু সময় পর আঁকাবাঁকা পথ আমাদের শরীরের কলকব্জা অচল করে দেওয়ার উপক্রম। ও বলাই হলো না আমরা আজ আছি সিলেটের শমসেরনগরে। 

সঙ্গে আছেন সহধর্মিণী সানন্দা গুপ্ত আর সিএনজি চালক রাহাত ভাই। যাইহোক অনেক চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছালাম অসাধারণ এক লেকের ধারে। দেখে মন জুড়িয়ে গেল। নাম জানতে চাইলে রুহেল ভাই বললেন চা বাগানের শ্রমিকদের কাছে এই লেকের নাম বিসলার বান। তবে প্রকৃত নাম ক্যামেলিয়া লেক। 

তিনি আরও বললেন, এই জায়গায় আসতে হলে অনেক আগেই নেমে পদব্রজে আসতে হয়। কিন্তু তিনি এই এলাকার লোক তাই এই চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন। আমি মনে মনে ভাবলাম মা আজ ভ্রমণ সঙ্গী থাকলে এই পথ পাড়ি দিতে চাইতেন না। 

তবে এই কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে যে প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখের সামনে ধরা দেয় তা সব ক্লান্তি দূর করে দেবে যে কারও। চারপাশে যত দূর চোখ যায় ছোট-বড় পাহাড়ি টিলাঢাকা চা বাগান। মাথার ওপরে নীল আকাশ। 

আকাশে আর লেকের পানিতে ঝাঁকবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাখি। এরই মধ্যে টলটলে পানির অপরূপ লেক। আমরা পদব্রজে এগিয়ে চলছি সম্মুখ পানে। চারপাশে বিশাল বিশাল গাছ ছায়া দিচ্ছে। আর ওপরে উদাস আকাশ। পাশেই টিলার মাঝে চা গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। চা গাছের ছায়া পড়েছে লেকের জলে। 

দেখে মনে হয় লেকের পানির সঙ্গে মিতালি গড়েছে চা গাছগুলো। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখতে পেলাম লেকের পাশে বসার জন্য ছাউনি আছে। 

আমরা গিয়ে কিছু সময় বসলাম। চারপাশে পাখির কলতান আমাদের নিয়ে গিয়েছিল মুগ্ধতার রাজ্যে। আমরা লেকে পা ভেজালাম। 
রাহাত ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম এই লেকের উৎপত্তিস্থল।

তিনি বললেন, এই বাগানের আয়তন প্রায় ৪ হাজার ৩২৬ দশমিক ৪৭ একর। আমাদের দেশের চা বাগানগুলোয় সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য বাগানের মধ্যে ছোট-বড় লেক দেখতে পাওয়া যায়। এই লেকগুলো সাধারণত চা বাগানের নিচু জমিতে বা পাহাড়ি টিলার পাদদেশে থাকে। কিন্তু ক্যামেলিয়া লেকের বৈশিষ্ট্য হলো এই লেক বাগানের প্রায় শেষ প্রান্ত টিলার ওপর অংশ জুড়ে। 

ডানকান ব্রাদার্সের মাদার কোম্পানি ক্যামেলিয়া পিএলসির নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়। ক্যামেলিয়া পিএলসি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীজুড়ে তাদের কর্মীর সংখ্যা ৭৩ হাজারের অধিক। আর বাংলাদেশে আছে ১৮ হাজার কর্মী। 
সহধর্মিণী বায়না ধরলেন চা বাগানে ভেতরে গিয়ে ছবি তুলবেন, নিতান্ত নিরুপায় হয়ে এগিয়ে গেলাম চা বাগানের দিকে। হঠাৎ দেখা পেলাম একদল বানর এই গাছ থেকে অন্য গাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সুনছড়া চা বাগান থেকে ক্যামেলিয়া লেকের সৌন্দর্য মুগ্ধতা জাগানিয়া। যদিও চা বাগান কর্তৃপক্ষ প্রাকৃতিক এ লেকটিতে কিছুটা কৃত্রিমতা জুড়ে দিয়েছেন। ইট-সিমেন্টের কিছু কৃত্রিম কাজ লেকটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। লেকের ওপরে একটি পাটাতন তৈরি করা হয়েছে। 

এখন ‘বিসলার বান’ বা ‘ক্যামেলিয়া লেক’ হয়ে উঠেছে অসাধারণ এক পর্যটন স্পট। লেকটির পাশে রয়েছে একটি ঘর। যেটি স্থানীয় চা শ্রমিকদের কাছে ‘ক্লাব ঘর’ নামে পরিচিত। এ ঘরে বা গাছের ছায়ায় পর্যাপ্ত সময় কাটানো সম্ভব। পাইলট আমাদের দুজনের ছবিও তুলে দিলেন। 

ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে এই জায়গাটি এখনো অজানা, তাই লোকসমাগম নেই বললেই চলে। তাই পরিবেশ তার আপন ধারায় প্রবহমান। এর প্রকৃতির রূপ বিচিত্র যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

কীভাবে যাবেন
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানযোগে মৌলভীবাজার যাওয়া যাবে। রেলপথে এলে ঢাকা থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনে করে নামতে হবে শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ বা শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে। সব আন্তঃনগর ট্রেন শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি করলেও ভানুগাছ ও শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে সব আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। ফলে আগেই জেনে নিতে হবে

কোথায় নামতে হবে 
শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে নামলে সেখান থেকে বাস ও সিএনজি অটোরিকশা পাওয়া যায়। শমসেরনগর পর্যন্ত বাসে যাওয়ার পর সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে সহজেই লেকটিতে পৌঁছানো সম্ভব। যাদের প্রচুর হাঁটার অভ্যাস আছে তারা শমসেরনগর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হেঁটেও যেতে পারেন। 

আর ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাসে আসতে চাইলে মৌলভীবাজারগামী বাসে ওঠে নামতে হবে শ্রীমঙ্গলে। সেখান থেকে একইভাবে লেকটিতে যাওয়া যায়। এছাড়া বিমানে এলে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে নেমে বাস বা ট্রেনে আসা যাবে শমসেরনগর।