টিং টিং শব্দে ঘুম ভাঙল। ঘুমাতুর চোখে হাত বাড়িয়ে ঘড়ির অ্যালার্ম বন্ধ করলাম। ঠিক তখনই হঠাৎ মনে পড়ে গেল—আজ তো আমাদের বাইরে বের হওয়ার কথা। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছাই করছে না। ঠিক তখনই খুরশেদ ভাইয়ের ফোন— স্যার, ঘুম থেকে উঠেছেন তো? যাবেন না? বেশ কিছু দিন হলো কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। তবে আগের থেকে কোথাও যে যাব তার প্ল্যানও করা হয়নি। কারণ আমার প্ল্যান করে কোথাও যাওয়ার ইতিহাস খুব বিরল।
বারে শুক্রবার, তাই আর দেরি না করে ঝটপট ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে নিলাম। আগের দিন ব্যাংকের পার্টিতে খুরশেদ আলম ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল—কোথায় যাওয়া যায়। অফিসের কাজের খুব চাপ গেছে, তাই ঘরে বসে থাকতে মন চাইছিল না। তখন খুরশেদ ভাই বললেন, চলুন, আমাদের এখানে জাফলংয়ে যাই।
আমি বললাম, অনেকবারই তো জাফলংয়ে গিয়েছি। তিনি বললেন, জাফলংয়ে যাওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আপনাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে গেলে কাজের সব চাপ ভুলে যাবেন। এরপর আর না বললাম না। বেশ কিছুদিন ধরেই তো ওই দিকে যাওয়া হয়নি।
সকাল ৭টায় আমরা গাড়িতে চেপে বসেছি। সিলেট শহরের বন্দরবাজার হয়ে মিরাবাজার, শিবগঞ্জ, এমসি কলেজ, সরকারি কলেজ পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। এদিকে পেটে রাম-রাবণের যুদ্ধ শুরু হয়েছে, কারণ সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি।
রাশেদ ভাইকে বললাম, ভাই পেটে তো পেট্রোল দিতে হয়। খুরশেদ ভাই বললেন, আর একটু সামনে যাই, আপনাকে একটা স্পেশাল রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাব। সেখানে এমন খাবার পাবেন, যা ঢাকাতেও খুঁজে পাবেন না। ঢাকার মানুষ নাকি বিশেষ করে এখানে আসে শুধু খাবার খেতেই। মনে মনে ভাবলাম, এমন কী খাবার হতে পারে যা ঢাকায় পাওয়া যায় না—সবই তো আজাইরা মন ভোলানো কথা। আর সামনে এগোতে এগোতে যখনই কোনো রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ছিল, তখনই মনে হচ্ছিল—কখন যে খুরশেদ ভাইয়ের সেই স্পেশাল রেস্টুরেন্ট আসবে।
আমরা হরিপুর বাজারে এসে পড়েছি এদিকে ক্ষুধায় বাঁধ ভাঙার পথে। জিজ্ঞেস করলাম আর কত দূর? খুরশেদ ভাই বললেন আর দুই মিনিট। আমাদের গাড়ি থামল মূল রাস্তা থেকে নিচে একটা খুপরি ঘর।
আমি মনে মনে ভাবলাম এই বুঝি খুরশেদ ভাইয়ের স্পেশাল রেস্টুরেন্ট। আমার অবস্থা বুঝতে পেরে খুরশেদ ভাই বললেন, আগে নাশতা করুন, তারপর দেখুন আপনার জন্য কী খাবার আছে। একবার খেলেই বুঝবেন—এই খাবার খাওয়ার পর বারবার খেতে ইচ্ছা করবে। আমরা দোকানে গিয়ে বসলাম দেখলাম একজন বৃদ্ধ নারী কী যেন রান্না করছিলেন আর বেশ সুন্দর গন্ধ বের হয়েছে। একটু পরে আমাদের টেবিলে খাবার এসে হাজির হলো। আমরা হোটেলের সামনে ডিপ টিউবওয়েলে হাত ধুয়ে বসে পড়লাম খেতে। চালের গুঁড়ার রুটি, মুরগির মাংস সঙ্গে হরিপুরের প্রখ্যাত লেবু।
প্রথমে একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে খারাপ লাগছিল। পরে খাবার মুখে দিয়ে সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হোল। অসাধারণ স্বাদ। দেশি মুরগির মাংস আর এতে ব্যবহার করা হয়েছে বাটা মসলা। আমরা যারা শহুরে মানুষ, তারা সাধারণত গুঁড়া মসলার ওপরই নির্ভরশীল। কবে যে শেষবার বাটা মসলায় রান্না করা খাবার খেয়েছিলাম, তা আর মনেই করতে পারি না।
নাশতা শেষ করে রওনা হলাম আমাদের গন্তব্যের দিকে। জাফলংয়ের কাছে পৌঁছাতেই দেখা মিলল পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলছে ঝরনা। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়।
পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি। বৃষ্টির সময় তাই পার্শ্ববর্তী ভারতের মেঘালয় রাজ্যের আকাশছোঁয়া খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়গুলো এ সময় সবুজে ভরে উঠেছে। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে ভারতের সীমান্তঘেঁষা দেশের উত্তরপূর্ব অঞ্চলের এই জনপদকে। আমরা জাফলং বল্লাঘাটে এসে পৌঁছালাম। তারপর নৌকা দিয়ে নদী পার হয়ে এগিয়ে চললাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। নদী পার হলেই খাসিয়াপুঞ্জি।
খাসিয়াদের গ্রামকে বলা হয় পুঞ্জি। এই পুঞ্জিগুলোতে গেলে দেখা যাবে তিন থেকে চার ফুট উঁচুতে বিশেষভাবে তৈরি খাসিয়াদের ঘর। প্রতিটি বাড়িতে সৃজিত পানবরজ। মাতৃতান্ত্রিক খাসিয়া সম্প্রদায়ের পুরুষরা গাছ বেয়ে বরজ থেকে পান পাতা সংগ্রহ করেন। আর বাড়ির উঠানে বসে নারী সদস্যরা পানপাতা ভাঁজ করে খাঁচা ভর্তি করেন বিক্রির জন্য। পানপাতা সংগ্রহ ও খাঁচা ভর্তি করার অভিনব দৃশ্য সবারই নজর কাড়ে।
আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। খুরশেদ ভাই বললেন, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের উংশিং পুঞ্জির পাশ দিয়ে অঝোর ধারায় ঝরছে এই ঝরনা ধারা।
যেখানে মাথার ওপর চেপে ধরা আকাশটা অনেক উঁচুতে। ছাই বরণ মেঘমালা খানিকটা পরপর রং বদলাচ্ছে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তারা ছুটতে চলেছে অজানা গন্তব্যের দিকে। বইছে বাতাস সঙ্গে চলছে রৌদ্র ছায়ার খেলা।
নীল আকাশে সাদা সাদা মেঘে সূর্যের আলো ঠিকরে তৈরি করছে অপূর্ব আলোকচ্ছটা। উজ্জ্বল আলোয় ভড়িয়ে থাকা দিনে মৃদু বাতাস। আমরা ঝরনার একদম কাছে গিয়ে মনের তৃষ্ণা মেটাতে থাকলাম। বেশ পর্যটকের আনাগোনা দেখলাম আমরা। প্রকৃতির সুনিপুণ হাতের তৈরি ছায়া সুনিবিড় শান্তিময় তরুচ্ছায়া ঘন, গাঢ়, চির সবুজের পাহাড়ের বুক থেকে স্বচ্ছ জলরাশির ঝরনাধারা ভ্রমণপিপাসুদের মনের তৃষ্ণা আরও বাড়িয়ে দেয়।
প্রকৃতির আপন মহিমায় গড়ে উঠা এই জায়গায় আসলে বোধ করি শত পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত ও বিষাদে ভরা মন প্রাণ নিমিষেই জুড়িয়ে যাবে। তবে বলে রাখা ভালো সাহস দেখিয়ে অনেকেই ঝরনার শেষ সীমানা পর্যন্ত যেতে চান, যা খুবই বিপজ্জনক।
কারণ, চারপাশে বড় বড় পাথরের ওপর থেকে পরলে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে। আরেকটা কথা, পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। তাই দয়া করে পানির বোতল, প্লাস্টিকের প্যাকেট যত্রতত্র ফেলবেন না।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস-ট্রেনে সিলেট, ভাড়া ২৫০ থেকে ১২০০ টাকা। সিলেট থেকে লোকাল বাসে জাফলং মামার বাজার, ভাড়া ৬০ টাকা অথবা গাড়ি রিজার্ভ করে ভাড়া নেবে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। জাফলং বল্লাঘাট থেকে ১০ টাকা দিয়ে পিয়াইন নদী পাড় হয়ে খাসিয়াপুঞ্জি সেখান থেকে রিকশা বা শ্যালো ইঞ্জিনচালিত গাড়ি করে সংগ্রামপুঞ্জির অপর প্রান্তে নামলেই মেঘালয় পাহাড় দেখতে পাবেন।
সেখান থেকে আধা কিলোমিটার হাঁটলেই শুনতে পাবেন ঝরনার গর্জন, দেখতে পাবেন মায়াবী ঝরনার হাতছানি। অথবা জাফলং বল্লাঘাট থেকে ট্যুরিস্ট নৌকা করে যেতে পারেন। ইতোমধ্যে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা ভিড় করছেন এই ঝরনায়।
/রোদসী

.jpg)