ময়মনসিংহে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সংগ্রাহক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন রেজাউল করিম আসলাম। যুবক থাকতেই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করছেন তিনি। সতেরো থেকে উনিশ শতাব্দীর দুর্লভ বাদ্যযন্ত্র রয়েছে তার কাছে। বিলুপ্তপ্রায় এসব বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘এশিয়ান মিউজিক মিউজিয়াম’ নামের জাদুঘর। নতুন প্রজন্মের অনেকেই দেশীয় এসব বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে জানতে পারছেন। জাদুঘরটির অবস্থান নগরীর আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠের বিপরীতে কাচিঝুলি রোডের ব্যাপ্টিস্ট চার্চ গির্জার নিচতলায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাদ্যযন্ত্রগুলো দেয়ালে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন বয়সী মানুষ আসছেন এগুলো দেখতে। কাছে এগিয়ে এসে রেজাউল করিম আসলাম একে একে জানাচ্ছেন বাদ্যযন্ত্রের নাম। বিলুপ্তপ্রায় এসব বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে কেউ ছবি তুলছেন।
জানা যায়, ২০২০ সাল থেকে জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। পাশাপাশি নগরীর বড় বাজার এলাকায় ‘নবাব অ্যান্ড কোং’ নামের একটি বাদ্যযন্ত্রের দোকান রয়েছে নগরীর আকুয়ার বাসিন্দা রেজাউল করিম আসলামের। বংশপরম্পরায় সেটি পেয়েছেন তিনি।
১৯৪৪ সালে রেজাউল করিম আসলামের দাদা মরহুম নবাব আলী বড় বাজারে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নবাব অ্যান্ড কোং’ নামের বাদ্যযন্ত্রের দোকানটি। দাদার মৃত্যুর পর তার বাবা জালাল উদ্দিন ব্যবসাটি চালাচ্ছিলেন। স্কুলজীবন শেষ করে বাবাকে সহযোগিতা করতে দোকানে আসেন তিনি। দোকানে অনেক পুরাতন বেহালা, সেতার ও তানপুড়া পড়ে থাকতে দেখে সেগুলোর যত্ন নিতে শুরু করেন তিনি। একসময় এসব ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের প্রেমে পড়ে যান এবং সংগ্রহের প্রতি আসক্তি তৈরি হয়। আর এই আসক্তি থেকেই দেশীয় বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের দিকে গভীর মনোযোগ দেন আসলাম। বর্তমানে বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি রেডিও, রেকর্ড প্লেয়ার, গ্রামোফোন, এলপি রেকর্ড ও গানের বইসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য জিনিসও সংগ্রহে রয়েছে তার। এ ছাড়া জলসাঘরের তৈজসপত্রও সংগ্রহে রয়েছে। সংগ্রহের পাশাপাশি এসব নিয়ে গবেষণাও করছেন রেজাউল করিম আসলাম। যে যন্ত্রগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, আধুনিক কারিগরদের দিয়ে ওই যন্ত্রের আদলে নতুন করে আবার বাদ্যযন্ত্র তৈরি করছেন তিনি।
২০০৬ সাল থেকে শুরু করেন বিরল বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ। পাটগ্রাম, বুড়িমারি, কুড়িগ্রামের রহমান ফকির থেকে ৩৬৫ বছরের পুরোনো সারিন্দা সংগ্রহ করেছেন আসলাম। কালীরহাট, লালমনিরহাটের গুনধর বাবুর কাছ থেকে ৩০০ বছরের পুরোনো সারিন্দা, দেবীরপাট, দুর্গাপুর, লালমনিরহাটের মনা সাধুর কাছ থেকে ২৫০ বছরের পুরোনো সারিন্দা, ময়মনসিংহের গৌরীপুরের নাওভাঙার চরের মোক্তার হোসেন ফকিরের কাছ থেকে চার প্রজন্মের ব্যবহৃত ২০০ বছরের পুরোনো সারিন্দা, হালুয়াঘাট থেকে কীর্তিনিয়া মনীন্দ্র ওস্তাদজির ব্যবহৃত ১৫০ বছরে পুরোনো সারিন্দাও সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার সংগ্রহে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায়, বিলুপ্ত ও চলমান ৬০০ বাদ্যযন্ত্র।
স্থানীয় অনসাম্বল থিয়েটারের সভাপতি মো. আবুল মুনসুর বলেন, ‘একসময় যাদের সংগীতে হাতেখড়ি হয়েছিল হারমোনিয়াম কিংবা তবলায়, তাদের উত্তরসূরিরা বেছে নিচ্ছেন গিটার কিংবা কিবোর্ড। দেশীয় অন্য বাদ্যযন্ত্রগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে রয়েছে। বাদ্যযন্ত্র সংগ্রাহক রেজাউল করিম আসলামের উদ্যোগ প্রশংসনীয়।’
রেজাউল করিম আসলাম জানান, প্রথমে দেখা, তারপর আগ্রহ আর ভালোবাসা, সেই থেকেই বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের আসক্তি আজ অবধি চলছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে নষ্ট, ভাঙা, পুরাতন সব বাদ্যযন্ত্রসহ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করেছেন। কেউ আবার নিজ উদ্যোগে সস্তা কিংবা বিনামূল্যে দিয়ে যায় পছন্দের বাদ্যযন্ত্রটি। হারানোর বা নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বিলুপ্ত, বিলুপ্তপ্রায় ও চলমান বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের এই উদ্যোগ। কারও গবেষণায় বা কারও শেখার আগ্রহে কাজে লাগছে যন্ত্রগুলো। নতুন প্রজন্মের অনেকেই দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলো চিনতে পারছে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা কালচারাল অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের জাদুঘরটি গড়ে তুলে রেজাউল করিম আসলাম প্রশংসা পাচ্ছেন। আমাদের কাছে লিখিত আবেদন করলে জাদুঘরটি সম্প্রসারণ কিংবা পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’