১৯৫২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। এদিন ঢাকার রাজপথ ছিল উত্তাল, আকাশে-বাতাসে কেবল একটিই ধ্বনি–‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। জানুয়ারির শেষ দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার পর থেকে পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতার মনে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, ৫ ফেব্রুয়ারি তা এক নতুন সাংগঠনিক মাত্রা পায়।
ইতিহাসের পাতা ও সমসাময়িক দলিল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দিনটি ছিল মূলত ২১ ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত বিস্ফোরণের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির ক্ষণ। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের তৎপরতায় ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। এর পরদিন ৫ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় ৪ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচির সাফল্য পর্যালোচনা করা হয় এবং আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে দীর্ঘ আলোচনা চলে।
এই দিনে ছাত্রনেতারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ঢাকার পাড়া-মহল্লায় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জনসংযোগ চালান। উদ্দেশ্য ছিল একটাই–রাষ্ট্রভাষার দাবিকে কেবল ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি গণদাবিতে রূপ দেওয়া।
৫ ফেব্রুয়ারির সেই সভাতেই ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট এবং ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালনের কর্মসূচিকে সফল করার জন্য স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন ও অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। ছাত্র ও তরুণ সমাজ এই দিনটিতে নিজেদের মধ্যে সংহতি আরও দৃঢ় করেন। তৎকালীন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারাবন্দি থাকলেও তার অনুপ্রেরণা ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন এই আন্দোলনকে বেগবান করে তুলেছিল।
প্রশাসনের কড়াকড়ি ও গোয়েন্দা নজরদারি আন্দোলনের এই প্রস্তুতির খবর পাকিস্তান সরকারের অগোচরে ছিল না। ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশের টহল বৃদ্ধি পায় এবং ছাত্রনেতাদের গতিবিধির ওপর গোয়েন্দা নজরদারি তীব্র করা হয়। তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার আন্দোলন দমনে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত ২১ ফেব্রুয়ারিতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দিকে মোড় নেয়।