এ যেন গল্পের ‘লিলিপুট’! ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে যত্রতত্র পাথর উত্তোলন ও লুটপাট এবং জমি দখলের মধ্য দিয়ে ‘লিলিপুট’ আকার ধারণ করেছে একসময়ের বিশাল রাজবাড়ি। এখন যেন ইতিহাস খুঁড়ে খাওয়া আরেক ইতিহাস। বিশালতা হারিয়ে ক্ষুদ্রতায় নেমে আসা জাফলং রাজবাড়িটি প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো।
জাফলং রাজবাড়িটির অবস্থান সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায়। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে ঐতিহাসিক এ স্থাপনার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পিয়াইন নদ। বাড়িটির ১০ বিঘা জমির পরিমাপ নেমে এসেছে শতকের কোঠায়। ১৬ শতক জায়গা দেবোত্তর সম্পত্তির হিসেবে উল্লিখিত রয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী স্থানটি চেনার উপায়ও প্রায় বিলুপ্ত। অথচ একসময় পাহাড়-নদীঘেরা মনোরম এই রাজধানী ছিল খাসিয়া ‘মালনিয়াং রাজ্য’-এর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। রাজ্য বিলুপ্তির পর দীর্ঘদিনের অবহেলা, পাথরখেকো চক্রের লুটপাটে সেটি প্রায় বিলীন হতে চলেছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ ২০১৭ সালে একটি সরেজমিন প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে সংরক্ষণ সচেতনতার আহ্বান জানানো হয়। এর আট বছর পর দেখা গেছে, রাজবাড়ির বেশির ভাগ অংশই আর নেই। কেবল কিছু দেয়াল ও ফটকের অবশিষ্টাংশ দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রাহক ও গবেষকদের মতে, ১৮৩৫ সালে জৈন্তিয়া রাজ্যের পতনের পর থেকেই শুরু হয় লুটপাট, যা এখনো চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাথরখেকো চক্র সক্রিয় থাকায় রাজবাড়ির অবস্থানও গোপন রাখা হচ্ছে। পরিবেশ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট একটি পরিদর্শক দল সম্প্রতি রাজবাড়িটি ঘুরে দেখে জানায়—আগের সেই চিহ্নগুলোর প্রায় কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। বন-ঝোপ-গাছগাছালি কর্তন করা। কেবল ফটকসমেত কিছু দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে।
‘সিলেট ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার’সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য সূত্রে জানা যায়, সিন্টেং রাজবংশের পূর্বে জৈন্তিয়া রাজ্য কয়েকটি খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল, যার একটি ছিল জাফলং। ১৪৫০ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে এসব খণ্ডরাজ্য একত্রিত হলে জৈন্তা রাজধানী হলেও জাফলং টিকে থাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে। পাহাড়-নদীঘেরা মনোরম এ রাজধানী দীর্ঘ সময় অক্ষত ছিল। ধারণা করা হয়, জৈন্তিয়া রাজারা এখানে মাঝেমধ্যে অবস্থান করতেন এবং স্থাপনাগুলোর সংস্কার করতেন।
‘সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সমন্বয়কারী আব্দুল হাই আল হাদী তার ২০১৭ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, জাফলং শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, ঐতিহাসিক গুরুত্বেও অনন্য। খাসিয়াদের প্রাচীন ‘মালনিয়াং রাজ্য’র রাজধানী ছিল জাফলংয়ের বল্লাপুঞ্জি। এখানকার ‘মন্দিরের জুম’-এ অবস্থিত রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ সেই গৌরবময় অতীতের সাক্ষ্য বহন করে। জাফলংয়ের প্রাচীন খাসিয়া বসতির নাম ‘বল্লাপুঞ্জি’। বন-বাদাড় ও পান-সুপারির জুমের মধ্যে রাজবাড়িটির অবস্থান। স্থানীয়ভাবে এটি ‘মন্দিরের জুম’ নামে পরিচিত। জায়গাটির কিছু অংশে গাছপালায় আচ্ছাদিত এবং কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা—সম্ভবত পাথরখেকোদের হাত থেকে রক্ষার জন্য।
স্থানীয় প্রবীণদের তথ্য অনুযায়ী, এখানে আগে পাকা বৈঠকখানা ছিল, যা ১৯৮৮ সালের বন্যায় বিলীন হয়। এ ছাড়া উত্তর দিকে নদের সঙ্গে যুক্ত একটি পুকুর ছিল, এখন তা ভরাট করে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও জায়গাটি বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে, সরকারি রেকর্ডে এখনো ‘মন্দিরের ভূমি’ হিসেবে চিহ্নিত। মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১০ বিঘা।
আব্দুল হাই আল হাদী বলেছেন, খাসিয়াদের ‘মুখিয়াতন্ত্র’ বা ‘সিয়েম’ পদ্ধতিতে ছোট-বড় বহু রাজ্য গড়ে উঠেছিল। খাসিয়া প্রবাদে এগুলোকে বলা হয় ‘ত্রিশ রাজা বার দলইর দেশ’। জাফলং ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল সুপ্রাচীনকাল থেকেই খাসিয়াদের আবাসভূমি। তবে রাজত্ব হারানোর পর থেকেই লুটপাটে এসব স্থাপনা ধ্বংস হতে থাকে।
প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন সংগ্রাহক ও গবেষক আসিফ আযহার জানান, ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, লুটের সূচনা হয় ১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে জৈন্তিয়া রাজ্যের পতনের পর। তাদের শাসনামলে কোনো উন্নয়ন হয়নি; বরং স্থাপনাগুলো ধ্বংসের পথে যায়। ১৯৪৭ সালের পরও লুটপাট বন্ধ হয়নি।
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি বলেন, জাফলং রাজ্যের মূল অংশ পাথর ও বালু উত্তোলনে নদের গর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে কেবল দক্ষিণের দেয়াল ও রাজকীয় ফটক নাজুক অবস্থায় টিকে আছে। পূর্ব দেয়ালের কিছু অংশ অবশিষ্ট থাকলেও পশ্চিম ও উত্তর দিক পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
পাথরমহাল-সংশ্লিষ্ট স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এখানে লুটপাটে দুই রকমের তথ্য পাওয়া গেছে। এক পক্ষ বলেছে, মাটির তলদেশে সেকালে রাজার আমলের কোনো গুপ্তধন থাকতে পারে, এমন ধারণা বা মিথ নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে। এখনকার খোঁড়াখুঁড়ির অবশ্য একটাই লক্ষ্য, তা হচ্ছে পাথর। মাটির নিচে বড় বড় বোল্ডার পাথর মিলছে। এসব পাথরের সঙ্গে সেকালের স্থাপনার নানা রকম দ্রব্যাদিও পাওয়া যায়। এর মধ্যে পাহাড়ের ভেতরকার প্লেট-জাতীয় দ্রব্য টাইলস তৈরিতেও ব্যবহার হয়। সেকাল-একাল মিলিয়ে রাজবাড়িটিতে লুটের ধারা ১৯১ বছরের পুরোনো।
‘লিলিপুট’ আকার ধারণ করা রাজবাড়িটির সম্পর্কে আগন্তুক কেউ জানতে চাইলে স্থানীয়রা কেউ আর দেখিয়ে দেয় না বলে জানিয়েছেন প্রকৃতি ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) সদস্যসচিব আব্দুল করিম চৌধুরী কিম।
সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শন করে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, এখন আর কেউ জাফলং রাজবাড়ির অবস্থান দেখাতে চায় না। হয়তো দেখানোর মতো কিছু নেই, নয়তো পাথরখেকো চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে স্থানটি আড়াল করছে। তার আশঙ্কা, এবারের বর্ষার পর হয়তো আর কোনো চিহ্নই থাকবে না।
চিহ্ন-নিশ্চিহ্নের এমন আশঙ্কার বাস্তবতাও দেখা গেছে। আগামী বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে জাফলং রাজবাড়ির ফটকের ওপাশে বারকি নৌকা জড়ো করে রাখা হয়েছে। পাহাড়ি ঢল নামার সুযোগে পাথর লুটের প্রস্তুতির এ অবস্থায় রাজবাড়ির নিদর্শন সংরক্ষণ সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, এখানে এখন থেকেই প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন।