২৭ বছরের গুজরাটি তরুণী পুজা আমেরিকায় দ্বিতীয় প্রজন্মের ভারতীয়-মার্কিনি অভিবাসী। তার বাবা এদেশের একজন উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী। ‘লা সাঁল’ ইউনিভার্সিটি থেকে স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট হিসেবে পাস করে পুজা এখন বাক-প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য থেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। সদ্য বিবাহি পুজা এবারের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে ভোট দেবেন। ‘দুই প্রার্থীর একজন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছেন, অন্যজন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছেন,’ এমনটাই ধারণা পুজার।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৪ সালের নির্বাচনে পুজার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো হলো গণতন্ত্র, অর্থনীতি, বৈশ্বিক সংঘাত, অভিবাসন, নারী অধিকার ও জলবায়ু পরিবর্তন। এই তরুণীর মতে, কমলা যেখানে আরও শক্তিশালী আমেরিকা গড়ে তুলতে চান, ট্রাম্প সেখানে বর্ণবাদ, লিঙ্গবাদ, অভিবাসী এবং পতনশীল অর্থনীতির ভয় দেখিয়ে মার্কিনিদের বিভক্ত করতে চাইছেন।
পুজার জীবনসঙ্গী ও আমেরিকায় দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী বাংলাদেশি শমীকও কমলা হ্যারিসকেই ভোট দেবেন। ট্রাম্পকে শমীক বর্ণবাদী ও নারীবিদ্বেষী বলে মনে করেন। এমনকি, তার কথায়, ২০২০-এর নির্বাচনের ফলাফল স্বপক্ষে না যাওয়ায় ট্রাম্প ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিল আক্রমণের উসকানি দিয়েছিলেন। তার সমর্থকরা ক্যাপিটল হিল আক্রমণ করেছিলেন।
এ বছর গাজায় ৪২ হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যু বহু লিবারেল মার্কিনি ও অভিবাসীদের চিন্তিত করে তুলছে। এর প্রতিক্রিয়ায় কমলা বা ডেমোক্র্যাটদের ভোটের কিছু অংশ ‘গ্রিন পার্টি’ পেয়ে যেতে পারে বলে সাধারণ মানুষ ও নির্বাচনি পর্যবেক্ষকরা অনুমান করছেন।
নির্বাচনি প্রচারণার সমাপ্তি
এদিকে গত শনিবার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প- দুইজনেই নর্থ ক্যারোলাইনায় ছুটে গেছেন শেষ মুহূর্তের নির্বাচনি প্রচারে।
ইতোমধ্যে ৭ কোটিরও বেশি মানুষ হয় ‘আগাম ভোট’ অথবা ই-মেইলে ভোট দিয়েছেন বলে ‘ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা’র ‘ইলেকশন ল্যাব’ জানিয়েছে। নর্থ ক্যারোলাইনায় ‘আগাম ভোটে’র শেষ দিন ভোট দিয়েছেন ৩৮ লাখেরও বেশি ভোটার। এ খবর ইতোমধ্যে খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে। তবে গতকাল রবিবার পর্যন্ত রাজ্যটির পশ্চিমাংশ এখনো হারিকেন হেলেনের ফলে সৃষ্ট বন্যার অভিঘাত কাটাতে পারেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের পক্ষে লড়াকু যোদ্ধা কমলা এ বিষয়ে নর্থ ক্যারোলাইনার ভোটারদের আবেগ কতটা জাগিয়ে তুলতে পারলেন, ভোটের ফলাফল প্রকাশিত হলে সেটা বোঝা যাবে।
নির্বাচনি প্রচারণার শেষ ৪৮ ঘণ্টায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী টিম ওয়ালজ রবিবার ইস্ট ল্যানসিংয়ে মিশিগান স্টেট সফর করেন। তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে ফেরার আগে অ্যালেনটাউন, ফিলাডেলফিয়া ও পিটসবার্গে র্যালি সমাপ্ত করে পেনসিলভানিয়ায় নির্বাচনি প্রচারাভিযানের ইতি টানবেন।
মূল্যবোধের রাজনীতি
বিভিন্ন জনমত জরিপে ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল ঘোষণা করা হলেও মার্কিনি সমাজে এখন চলছে মূল্যবোধের রাজনৈতিক লড়াই। নারীর গর্ভপাতের অধিকার অনেকে মেনে নিলেও মেয়েদেরই ভেতর রক্ষণশীল কেউ কেউ এ বিষয়ে একমত নন। সমকামী বিয়ে নিয়েও আছে দ্বিধা-বিভক্তি।
জন ডেনভারের ‘কান্ট্রি রোড টেক মি হোম’ শিরোনামের বিখ্যাত গানের সেই ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার কথাই ধরা যাক। পাহাড়ি এ এলাকায় ইস্পাতসহ নানা খনির শ্রমিকরা একসময় ছিলেন ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ভক্ত। আজ সেই রাজ্যেই মূল্যস্ফীতি, ২০২০ সালের খানিকটা ‘সন্দেহজনক’ বা ‘রহস্যময়’ নির্বাচনে ট্রাম্পের হেরে যাওয়াসহ নানা কারণেই সেখানে এবার জয়ী হতে পারেন রিপাবলিকানরা।
এ ছাড়া যতই ‘আলোকিত’ ও ‘উদার’ হোক আজকের আমেরিকা, ভিন্ন বর্ণের-ধর্মের-ভাষার অভিবাসীদের নিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গরা যথেষ্ট চিন্তিত। ২০২৩ সালের সর্বশেষ জনমত গণনা অনুযায়ী সারা দেশে ২৫২.০৭ শ্বেতাঙ্গ (তবে এদের ভেতর আরব বা উত্তর-আফ্রিকা থেকে আসা শ্বেতাঙ্গরাওও রয়েছেন- যত সীমিত সংখ্যাতেই হোক), ৪৫.৭৬ মিলিয়ন কালো বা আফ্রো-আমেরিকান, ৪.৪৯ মিলিয়ন আমেরিকান ইন্ডিয়ান এবং আলাস্কা নেটিভ, ২১.৩৯ মিলিয়ন এশিয়ান (এর ভেতর পূর্ব এশীয়, দক্ষিণ এশীয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়রাও আছে), হাওয়াই ও অন্যান্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপে ০.৯ মিলিয়ন এবং দুটো অন্য জাতিসত্তার ১০.৩২ মিলিয়ন মানুষ রয়েছে।
ধর্ম অনুসারে, আমেরিকার ৭০ শতাংশ নাগরিক খ্রিষ্টান, ২৩ শতাংশ নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম পালন করেন না এবং পাঁচ শতাংশের মতো নাগরিক অন্যান্য ধর্ম পালন করেন (ইহুদি ধর্ম, ইসলাম, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম)।
ভাষা অনুযায়ী, আমেরিকায় ৭৭.৫ শতাংশ নাগরিক ইংরেজি, ১৩.৭ শতাংশ নাগরিক স্প্যানিশ, অন্যান্য ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী ৩.৯ শতাংশ, এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভাষাসমূহ ৩.৬ শতাংশ ও অন্যান্য ভাষায় ১.৩ শতাংশ নাগরিক কথা বলেন।
সমগ্র এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক ও মূল্যবোধের পার্থক্য। এবারের নির্বাচনে এই পার্থক্যের ভিত্তিতেও ভোট ভাগাভাগি হবে। যে প্রার্থী সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মূল্যবোধকে তুলে ধরছেন বলে মনে করবেন, তারা তাকেই ভোট দেবেন। একটা বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের এটা হচ্ছে স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।