ইসরায়েল সিরিয়ার বেশকিছু অঞ্চলে হামলা চালিয়েছে। এরই মধ্যে এ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে দামেস্ক। তারা বলছে, এটি তাদের সার্বভৌমত্বের ন্যক্কারজনক লঙ্ঘন। কিন্তু কেন এ হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল?
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানান, সিরিয়ার জন্য ‘ভবিষ্যৎ হুঁশিয়ারি’ হিসেবে এ হামলাগুলো চালাচ্ছে তারা। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আল শারার প্রচলিত ডাকনাম ‘জোলানি’ ব্যবহার করে কাটজ তাকে বলেছেন, আপনি যদি সিরিয়ার ওপর দিয়ে শত্রুভাবাপন্ন বাহিনীকে প্রবেশ করতে দেন এবং ইসরায়েলি নিরাপত্তা স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলেন, তা হলে আপনাকে চড়া মূল্য দিতে হবে। তবে শত্রুভাবাপন্ন বাহিনী বলতে কাটজ কী বুঝিয়েছেন তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
ঠিক কোথায় কোথায় হামলা হচ্ছে
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ইসরায়েলি অভিযানে ২ এপ্রিল হামা বিমান ঘাঁটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। কয়েক ডজন আহতও হয়েছে। ইসরায়েল মধ্য সিরিয়ার পালমিরার কাছে টি৪ বিমান ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে। এটি ছিল দেশটির সবচেয়ে বড় ও কৌশলগত বিমান ঘাঁটি।
টি৪-এর সঙ্গে দামেস্ক ও হোমসের সড়ক সংযোগ রয়েছে। এ কারণে এটি রসদসংক্রান্ত সুবিধাও পায়। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, তুরস্ক ওই ঘাঁটিতে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিমান স্থাপনে আগ্রহী ছিল।
গত বৃহস্পতিবারও ইসরায়েল সিরিয়ার দক্ষিণের প্রদেশ দেরার নাওয়া অঞ্চলে গোলাবর্ষণ করেছে। সিরিয়ার কর্তৃপক্ষ বলছে, এতে ৯ জন মারা গেছে এবং অনেকে আহত হয়েছে।
ইসরায়েল ও সিরিয়ার সম্পর্ক কেমন
সিরিয়া ও ইসরায়েলের কখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সম্পর্ক ছিল না। বাশার আল-আসাদ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর আল শারা নিশ্চিত করেন যে তার বা তার সরকারের ইসরায়েলের সঙ্গে লড়াইয়ের ইচ্ছা নেই এবং তারা সিরিয়াকে বাইরের কোনো শক্তির আক্রমণ চালানোর স্থল হতে দেবে না।
আল শারা সিরিয়ায় ইসরায়েলের আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে অধিকৃত গোলান মালভূমি ছাড়িয়ে ইসরায়েলি বাহিনী যে সীমানা সম্প্রসারণ করছে, সেটিরও নিন্দা করেছেন তিনি।
অন্যদিকে ইসরায়েলের নেতৃস্থানীয়রা সিরিয়ার নতুন সরকারকে দেখছে ‘ইদলিবের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে, যারা জোরপূর্বক দামেস্ক দখল করেছে।
সিরিয়ার কাছে আসলে কী চায় ইসরায়েল
ইসরায়েল নিজের কর্মকাণ্ডের সাফাইয়ে বলছে যে পুরোটাই তারা করছে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অস্বাভাবিক কিছু চাহিদা রয়েছে বলেই জানিয়েছে আল-জাজিরা।
ফেব্রুয়ারির শেষে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা এইচটিএস গোষ্ঠী বা সিরিয়ার নতুন সামরিক বাহিনীকে দামেস্কের দক্ষিণে প্রবেশ করতে দেব না।’
সিরিয়ার সীমান্তে একটি বেসামরিকীকরণ অঞ্চল দখল করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এ ছাড়া আসাদ সিরিয়া ছেড়ে পালানোর সঙ্গে সঙ্গে ইয়ারমৌক নদীর গতিপথ ও আল ওয়াহেদা ড্যাম– এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ পানিসম্পদ ইসরায়েল দখলে নিয়েছে।
নেতানিয়াহু এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে তারা সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করবেন। সিরিয়ার লেখক রবিন ইয়াসিন কাসসাব জানান, তিনি অবাক হননি যে ইসরায়েল আরও ভূখণ্ড দখল করতে চায়। কাসসাব বলেন, ইসরায়েল সুযোগসন্ধানী, তারা সব সময়ই চায় দায়হীনভাবে কিছু করে ফেলতে। যদি তারা দায়হীনভাবে আরও ভূখণ্ড নিতে পারে, তারা আরও ভূখণ্ড নিয়ে যাবে।’
ইসরায়েলের কী অন্য উদ্দেশ্য আছে
ইসরায়েল সিরিয়ায় তুরস্কের প্রভাব কমাতে আগ্রহী। অন্তত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আলোচনায় উপস্থিত সূত্ররা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তাই জানিয়েছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানিয়েছিল যে তাদের স্বার্থে হলেও যাতে রাশিয়া নিজেদের ঘাঁটি সিরিয়ায় রাখে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বিস্মিত করেছিল।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সারের অভিযোগ, আঙ্কারা ‘নেতিবাচক প্রভাব’। তিনি বলেন, ‘তারা (তুরস্ক) নিজেদেরকে সিরিয়ার সুরক্ষাদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সর্বোচ্চটা করছে।
তুরস্ক সিরিয়ার আক্রমণ নিয়ে কী বলছে?
গত বৃহস্পতিবার তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরায়েলকে অবশ্যই সিরিয়া থেকে সরে যেতে হবে। মন্ত্রণালয়টি আরও বলেছে, ‘পুরো এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইসরায়েলকে অবশ্যই প্রথমে সম্প্রসারণ নীতি বাদ দিতে হবে, অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করতে হবে এবং সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় বাধা দেওয়া থামাতে হবে।’
বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে লড়ার সময় সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সমর্থনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল তুরস্ক। বর্তমানে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তাদের দৃঢ় যোগাযোগ রয়েছে।
সিরিয়া কী করতে পারে?
সিরিয়া মাত্রই ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধ পার করেছে। বর্তমানে দেশটি বাহ্যিক ও আর্থিকভাবে বেশ দুর্বল। আল শারার হাতেও খুব অল্পসংখ্যক পরিচিত ব্যক্তি রয়েছে, যাদের কাছে তিনি সহায়তা চাইতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে কাসসাব বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সরকারের যোদ্ধারা লড়াই করছে না। সিরিয়ার শহরগুলোর স্থানীয় জনসাধারণ নিজেদের প্রতিরক্ষায় লড়াই করছে। তিনি আরও বলেন, হোমস ও হামার স্থানীয়রা ইসরায়েলকে পিছু হটানোর জন্য চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি গণমাধ্যম এই স্থানীয়দের এইচটিএসের যোদ্ধা বলে প্রচার করছে। এর আগে দক্ষিণ সিরিয়ায় হামলা চালাতেও তারা একই কাজ করেছিল।
কাসসাব আরও বলেন, ‘এটি ভয়াবহ যে আন্তর্জাতিক কমিউনিটি ইসরায়েলকে দমানোর জন্য কিছুই করছে না।’ সূত্র: আল-জাজিরা