পাকিস্তান সামরিক বাহিনী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, গত ৭ মে চালানো ভারতের হামলার জবাব না দেওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের পক্ষ থেকে উত্তেজনা প্রশমনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই বক্তব্যের পর ভারতে পাকিস্তানের হামলাকে অত্যাসন্ন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- কীভাবে ভারতে হামলা চালাবে পাকিস্তান।
গত বুধবার ভারত পাকিস্তানের ৯টি স্থানে ২৪টি ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে। এর পাল্টা হিসেবে পরের দিন ভারতের ১৫টি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। এই হামলার পর দেশ দুটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, সর্বাত্মক যুদ্ধের ভার দুই দেশের কেউই বইতে পারবে না।
কয়েক দশকের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সংঘাত দেখার পর দুই দেশের সীমান্তবর্তী কোটি কোটি মানুষের মতো অনেকেরই মনে এখন একটা প্রশ্ন- এরপর কী ঘটতে পারে?
এমন ‘জিজ্ঞাসার’ বিষয়ে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এরপর কী ঘটবে, তার ‘বেশির ভাগটাই’ নির্ভর করছে ইসলামাবাদের সিদ্ধান্তের ওপর।
ভারতের হামলার পর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিলেও পাকিস্তান সীমান্তে গোলাবর্ষণ ছাড়া এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। তবে বৃহস্পতিবার রাতে ভারত দাবি করেছে, কাশ্মীরের জম্মু ও উদামপুরে এবং পাঞ্জাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও ড্রোন পাঠিয়ে হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।
সংঘর্ষের পর দুপক্ষই নিজেদের বিভিন্ন পদক্ষেপের ভিত্তিতে বিজয়ী দাবি করেছে। তবে বৈরিতা বাড়ছেই।
দুই দেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে। যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় পাকিস্তানে ভারতের আক্রমণে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ৯ স্থানে সুনির্দিষ্ট ‘সন্ত্রাসীদের আস্তানায়’ ভারতের হামলার পর দেশটির বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি তোলে পাকিস্তান।
হামলার দুই দিন পর পাকিস্তানের দাবি, তারা ভারতের ২৫টি সামরিক ড্রোনও ভূপাতিত করেছে। তারা এসব ড্রোনকে আখ্যা দিয়েছে ভারতের ‘বিপজ্জনক উসকানি’ হিসেবে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে এখন সবাই একটা ভয়ই পাচ্ছেন। সেটা হলো- নতুন করে কোনো ধরনের সংঘর্ষ হলে তা দুই দেশকে সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষক মাইকে কুগেলম্যান বলছেন, ‘সবার চোখ এখন পাকিস্তানের দিকে। যদি তারা মুখ রক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভারতের বিমান ধ্বংস করার ঘটনায় নিজেদের বিজয়ী দাবির মাধ্যমে এখানেই ইতি টানে, তবে উত্তেজনা প্রশমনের একটা সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।’
তবে সতর্ক করে দিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, ‘যদি পাকিস্তান পাল্টা হামলার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সব সম্ভাবনাই নস্যাৎ হয়ে যাবে।’
সিএনএন বলছে, বুধবারের হামলার পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম উচ্ছ্বসিত ছিল। ভারতের শীর্ষস্থানীয় একটি ইংরেজি দৈনিক তাদের সম্পাদকীয়তে ভারতের হামলাকে ‘ন্যায়বিচারের আঘাত’ হিসেবে অভিহিত করে। কাশ্মীরের পাহালগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জনের মৃত্যুর ‘বদলা’ নিতে চালানো এ হামলাকে ‘তীক্ষ্ণ’ ও ‘দৃঢ়’ প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রশংসাও করে পত্রিকাটি।
একই ধরনের শিরোনাম করে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও। পত্রিকাটি তাদের প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে লিখেছে, ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত’।
অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জনসমক্ষে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, সেটাও ‘আক্রমণাত্মক’। ভারতের হামলায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে দাবি করে তিনি ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তবে ভারতের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেন তিনি। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘শত্রুকে মাথা নত করাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা লেগেছে।’
ভারত বলছে, তারা ইসলামপন্থি দুটি গোষ্ঠী- লস্কর-ই-তৈয়েবা ও জইশ-ই-মুহাম্মদের অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। গোষ্ঠী দুটির বিরুদ্ধে ভারতে প্রাণঘাতী কিছু জঙ্গি হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
নয়াদিল্লির দাবি, মঙ্গলবার রাতের হামলায় পাকিস্তানের কোনো সামরিক অবকাঠামো নিশানা করা হয়নি এবং কোনো বেসামরিক লোকের মৃত্যু হয়নি। সেদিন রাতে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের একটি লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানে ভারত। দুই দেশের ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর এটি ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি ভেতরে হামলার ঘটনা।
পাকিস্তানে বিমান হামলার খবরের মধ্যেই ভারতের একাধিক রাজ্যে চলছে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা মহড়া। পাকিস্তানে বিমান হামলার খবরের মধ্যেই ভারতের একাধিক রাজ্যে চলছে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা মহড়া।
বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র আরেকটি সর্বাত্মক যুদ্ধের ভার বইতে পারবে না। এরই মধ্যে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দারের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে। দুই দেশের মহাপরিচালকদের মধ্যে একটি হটলাইন চালু হওয়ার তথ্যও দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান এরই মধ্যে তিনবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। আরেকটি যুদ্ধ ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
সাত দশক আগে ভারত ভাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া পাকিস্তান নানা সংকটে রয়েছে। প্রায় ২৩ কোটি মানুষের দেশটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে জঙ্গি উত্থান ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
সামরিক কিংবা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভারতকে তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী ধরা হয়। তবে যুদ্ধে জড়ালে ভারতকেও ‘কিছু না কিছু’ হারাতে হতে পারে বলে মনে করেন ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেন পলিসি প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ গবেষক তানভি মদন। তিনি বলেছেন, আগের ঘটনাগুলোর আলোকে এটা বলা যায়, শেষমেশ দুই দেশই যুক্তিবাদী, যারা সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে চায় না।’
আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের ভাবমূর্তি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বদ্ধপরিকর, যিনি ভারতে অলিম্পিক আয়োজনের চেষ্টা চালিয়েছে যাচ্ছেন এবং চীনকে টপকে উৎপাদনের বৈশ্বিক কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছাতে চান।
আরেকটি বিষয় হলো, ভারত বর্তমানে একাধিক সীমান্তে, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সীমান্তে নিরাপত্তা নিয়ে হুমকির মধ্যে রয়েছে।
হামলার বিষয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যখন হামলা চালাব, তখন গোটা বিশ্বই তা প্রত্যক্ষ করবে।’
ইউনিভার্সিটি অ্যাট আলবানির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি বলেন, ‘এখন ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থেকে অনেক দূরে। তবে দেশ দুটি গত ২৪ ঘণ্টায় যেখানে ছিল, তার চেয়ে বেশি যুদ্ধাবস্থায় পৌঁছেছে।’ আগামী কয়েক দিন দুই দেশের মধ্যে আরও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বজায় থাকবে। ভারতের সামরিক স্থাপনাগুলোও টার্গেট করতে পারে পাকিস্তান। ইতোমধ্যে সীমান্তবর্তী কয়েকটি রাজ্যে সামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ তুলেছে ভারত।’ তবে ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি মনে করেন, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় পাকিস্তান হামলায় ভিন্ন কৌশলও নিতে পারে, হামলার ধরনও পাল্টাতে পারে। তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা