পাহালগামে জঙ্গি হামলার জেরে গত ৭ মে পাকিস্তান এবং পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরজুড়ে বড় হামলা চালায় ভারত। যার নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’ ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়াই ছিল এ সার্জিকাল স্ট্রাইকের মূল উদ্দেশ্য।
ভারত দাবি করেছে, এই অভিযান সম্পূর্ণ সফল। কেননা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী প্রচেষ্টায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে এই সার্জিকাল স্ট্রাইক।
আসুন বিস্তারিত জেনে নিই কীভাবে ‘অপারেশন সিঁদুর’ ভারতের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে উঠেছে এবং এর মাধ্যমে ভারত কী কী অর্জন করতে পেরেছে।
১) ৯টি জঙ্গি ক্যাম্প ধ্বংস
ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী এই অভিযানে লস্কর-ই-তাইয়েবা, জৈশ-ই-মোহাম্মদ এবং হিজবুল মুজাহিদিনের ৯টি বড় জঙ্গি ঘাঁটি নির্মূল করেছে। এই ঘাঁটিগুলো থেকে ভারতীয় ভূখণ্ডে হামলার পরিকল্পনা করা এবং জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। নির্ভুল হামলার মাধ্যমে এই ঘাঁটিগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে, যা জঙ্গিদের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
২) পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডে শক্তিশালী হামলা চালিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন
অপারেশন সিঁদুর দুই দেশের যুদ্ধের সব পুরনো নিয়ম ভেঙে দিয়েছে। ভারত পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশসহ শত শত কিলোমিটার ভিতরে ঢুকে পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। বাহাওয়ালপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি আস্তানাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও হামলা করতে দ্বিধা করেছিল।
৩) পাকিস্তানের জন্য নতুন লাল রেখা
অপারেশন সিঁদুর দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন লাল রেখা টেনেছে। তারা এই হামলা দিয়ে পরিষ্কারভাবে জানান দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সন্ত্রাসবাদের দৃশ্যমান ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণতি হবে। এটি কেবল প্রতিশোধ নয়, বরং একটি প্রতিরোধ নীতির প্রয়োগ। পাকিস্তানকে এখন বুঝতে হবে যে সন্ত্রাসবাদ আর সহ্য করা হবে না।
৪) যৌথ-সেনার সমন্বয়ে প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন
ভারতীয় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী সমন্বিতভাবে হামলা চালিয়েছে – যা ভারতের ক্রমবর্ধমান যৌথ যুদ্ধক্ষমতার প্রমাণ।
৫) সন্ত্রাসবাদ নিয়ে নতুন সংজ্ঞা প্রদান
প্রথমবারের মতো ভারত স্পষ্টভাবে জঙ্গি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে পার্থক্য না করে উভয়ের বিরুদ্ধেই একই পদক্ষেপ নিয়েছে। এটি তাদের দীর্ঘদিনের সেই ধারণাকেও বাতিল করে দেয় যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্রের ছত্রছায়ায় চাইলেই প্রভাবশালী দুষ্কৃতকারীরা অনায়াসে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে পারে।
৬) পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষার দুর্বলতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া
ভারতীয় বাহিনীর সফল এয়ার স্ট্রাইক পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এক প্রকার হতচকিত করে দেয়। ভারতের মাত্র ২৩ মিনিটের মধ্যে পরিচালিত দ্রুত ও নিখুঁত হামলা পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাই প্রকাশ করে।
এ ছাড়া ভারত দাবি করছে, ভারতীয় রাফাল যুদ্ধবিমান কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই মিশন সম্পন্ন করে, যা প্রযুক্তিগত এবং কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করে।
৭) ভারতের বিমান প্রতিরক্ষার সক্ষমতা এবং পেশাদারত্ব প্রদর্শন
ভারত আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষার রূপান্তরিত রূপ তুলে ধরেছে। নিজস্ব আকাশসীমা সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করেছে। ভারত সফলভাবে পাকিস্তানের ব্যবহৃত চীনা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে।
এ ছাড়া ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত শত পাকিস্তানি ড্রোন ও মিসাইল ভূপাতিত করে তার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। এখন এটি রপ্তানিযোগ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে।
৮) উত্তেজনা ছাড়াই সুনির্দিষ্ট এবং সংগঠিত হামলা
জঙ্গি অবকাঠামো ছাড়া প্রাথমিকভাবে কোনো সামরিক বা বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। বড় মাত্রায় উত্তেজনা সৃষ্টি না করেই ভারত তার শূন্য-সহিষ্ণুতা নীতি অনুসরণ করে এসব হামলা চালিয়েছে। এ সময় ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড একাধিক জঙ্গি নিহত হয়।
৯) বিশ্বকে পাঠানো বার্তা
ভারত বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, জনগণকে রক্ষা করতে অনুমতির অপেক্ষা করা হবে না। সন্ত্রাসকে শাস্তি দেওয়া হবে – যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে, সন্ত্রাসবাদ ও তাদের পরিকল্পনাকারীদের জন্য আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই।
যদি পাকিস্তান প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে ভারত কেবল তা প্রতিহত করতেই সক্ষম নয়, প্রয়োজনে জবাবি হামলায় আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
পাকিস্তানের সামরিক কাঠামোর ক্ষতি:
গত ৯ ও ১০ মে রাতের অভিযানে ভারত এমন দেশ হয়ে উঠেছে, যারা একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের কয়েটি বিমান ঘাঁটির ক্ষতি সাধন করেছে। তিন ঘণ্টার মধ্যে ১১টি ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে – যার মধ্যে রয়েছে নুর খান, রফিকি, মুরিদ, সুক্কুর, শিয়ালকোট, পাসরুর, চুনিয়ান, সারগোধা, স্কারু, ভোলারি এবং জ্যাকবাবাদ।
হামলায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ২০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। ভারতের হামলায় ভোলারি ঘাঁটিতে পাকিস্তানের স্কোয়াড্রন লিডার উসমান ইউসুফ ও চারজন বিমানসেনাসহ ৫০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন এবং পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সমর্থন:
আগে যখনই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কিছু সংঘাতমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হতো, অধিকাংশ দেশ ভারতকে সংযমের আহ্বান জানাত। কিন্তু এবার, বহু বিশ্বনেতা ভারতের সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। সূত্র: আল-জাজিরা এবং এনডিটিভি
সুলতানা দিনা/