মঙ্গলবার ( ২০ মে) পাকিস্তান সরকার বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেছে। ৬৫ বছর পর দেশটির ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো কাওকে এই উপাধি দেওয়া হল।
জেনারেল আসিম মুনিরের এই পদোন্নতি পাকিস্তানের প্রথম ফিল্ড মার্শাল মুহাম্মদ আইয়ুব খানের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।
পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আইয়ুব খান। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর ক্ষমতা গ্রহন করার পর থেকে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তাকে একজন সামরিক স্বৈরশাসক হিসেবেই জানে সমগ্র বিশ্ব।
পাকিস্তানের প্রথম ফিল্ড মার্শাল মুহাম্মদ আইয়ুব খান ছয় দশকেরও বেশি সময় আগে (৬৫ বছর আগে) নিরঙ্কুশভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন।আইয়ুব খান একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর নিজেকে এই পদে নিযুক্ত করেছিলেন। যেটি ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটি বিতর্কিত পদক্ষেপ।
পাকিস্তানের সামরিক ইতিহাসে ‘ফিল্ড মার্শাল’ হলো দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক পদ যেটি কেবল অসাধারণ সামরিক অবদান বা যুদ্ধজয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ দেওয়া হয়। ১৯৫৯ সালে প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেন, যা রাজনৈতিকভাবে খুবই বিতর্কিত ছিল।
১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকেই গোটা পাকিস্তানকে নানান ধরণের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সাথে লড়াই করতে হয়। ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন, দুর্নীতি এবং ক্রমবর্ধমান জননিরাপত্তার হতাশা বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করে তোলে।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জা এসব বিশৃঙ্খলা সামলাতে সামরিক আইন ঘোষণা করেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন সর্বাধিনায়ক জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। অথচ মাত্র ২০ দিন পরই আইয়ুব খান ইস্কান্দার মির্জার বিরুদ্ধে চলে যান।
১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবর সন্ধ্যায়, রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জা এবং তার মনোনীত প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খানকে সংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে একসাথে চা পান করতে দেখা যায়। এই সংবাদ সম্মেলনের আড়াই ঘন্টা পর, মধ্যরাতে, তিনজন উচ্চপদস্থ জেনারেল করাচির রাষ্ট্রপতি প্রাসাদে য়াগে থেকে কিছু না জানিয়েই উপস্থিত হন। তারা মির্জাকে জানান যে,তারা আইয়ুব খানের নির্দেশে কাজ করছেন।
তাদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জাকে প্রকারান্তরে জানানো হয়: ‘পদত্যাগ করুন, অথবা জোর করে অপসারণ করা হবে।‘
কোন কার্যকর বিকল্প না পেয়ে, ইস্কান্দার মির্জা রাজি হয়ে বলেন, ‘যদি দেশের স্বার্থে আমার পদত্যাগ করা সমীচীন হয়, তাহলে আমি তা করব।’
চাপের মুখে তিনি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন এবং আইয়ুব খান পাকিস্তানের নতুন রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথ খুলে যায়। এটি ছিল দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সামরিক দখল।
পদত্যাগের পর, মির্জাকে কোয়েটায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে লন্ডনে নির্বাসিত করা হয়, যেখানে তিনি ১৯৬৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বসবাস করেন।
এর এক বছর পর, ১৯৫৯ সালে, আইয়ুব খান নিজেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ ফিল্ড মার্শাল পদমর্যাদা প্রদান করেন। এটি সাধারণত যুদ্ধকালীন গুরুত্বপূর্ণ বিজয় বা অন্যান্য দেশে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অবদান রাখা নেতাদের জন্য সংরক্ষিত একটি পদবি হলেও তার ক্ষেত্রে এটি ছিল স্ব-ঘোষিত। যার কোনও নজির পুরো বিশ্বে আর কোথাও ছিল না ।
পরবর্তী ১১ বছর ধরে, আইয়ুব খান কঠোর হাতে পাকিস্তান শাসন করেন। অর্থনৈতিক সংস্কার সহ নতুন অবকাঠামো প্রকল্প চালু করেন এবং সে সময়কার শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত করেন।
তার শাসনামলে ভারতের সাথে সিন্ধু পানি চুক্তি এবং ১৯৬৫ সালের যুদ্ধওফয়, যার পর থেকে তার জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে শুরু করে।
১৯৬৯ সালে, ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং বিক্ষোভের মধ্যে, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) থেকে, আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং আরেক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এবং রাজনীতি ছেড়ে দেন।
বিশ্বব্যাপী ফিল্ড মার্শাল পদটি একটি সম্মানজনক র্যাঙ্ক, যা সাধারণত যুদ্ধকালীন বীরত্ব ও কৌশলগত নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদান করা হয়। যুক্তরাজ্যে এই পদটি আজীবনের জন্য প্রদান করা হয় এবং অনেক সময় কেবল প্রথাগত বা কূটনৈতিক দায়িত্বে ব্যবহৃত হয়।
ভারতের শ্যাম ম্যানেকশ ও কে.এম. কারিয়াপ্পা এই মর্যাদা পেয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে এই পদ ‘জেনারেল অব দ্য আর্মি’ নামে পরিচিত, যা ডুইট আইজেনহাওয়ারের মতো নেতারা পেয়েছিলেন।
আধুনিক যুগে অনেক দেশ এই পদ ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছে। তবে যেসব দেশে এখনও আছে, সেখানে এটি একটি কূটনৈতিক এবং প্রতীকী মর্যাদা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সুলতানা দিনা/