ভারতের গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ভেঙে পড়ার পর প্রশ্ন উঠেছে বোয়িংয়ের নিরাপত্তা নিয়ে।
গত বৃহস্পতিবার (১২ জুন) দুপুরে লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানটি ওড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয়।
এই প্রথমবারের মতো বোয়িং ৭৮৭ মডেলের কোনো বিমান এমনভাবে দুর্ঘটনার শিকার হলো, যা বিমান নির্মাণ সংস্থা বোয়িংকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এদিকে বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটির ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল এক বিবৃতিতে ভারতের এয়ারক্র্যাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) জানায়, গুজরাট সরকারের ৪০ জন সদস্যের সহায়তায় ব্ল্যাক বক্সটি উদ্ধার করা হয়েছে। এটি ঘটনাস্থলের কাছেই এক চিকিৎসকের হোস্টেলের ছাদে পাওয়া গেছে।
পুরোনো আশঙ্কা এখন বাস্তব!
এই মডেল নিয়ে আগেই গুরুতর সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন বোয়িংয়ের সাবেক কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ার স্যাম সালেহপৌর। গত বছরের এপ্রিলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছিলেন, বোয়িং ৭৮৭ সিরিজের প্রতিটি উড়োজাহাজেই যান্ত্রিক ত্রুটি রয়েছে। তার মতে, বিমানগুলোর ফিউজলাজ জয়েন্টে অর্থাৎ বডির সংযোগস্থলগুলোতে সঠিকভাবে ‘সিম’ (ছোট ধাতব টুকরো) বসানো হয়নি। এর ফলে বিমানের কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং উড্ডয়ন বা উচ্চগতিতে এই চাপ মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
স্যাম ওই সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘এই ত্রুটির কারণে মাঝ আকাশে ফিউজলাজ ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সারা বিশ্বে চলমান সব ৭৮৭ বিমান জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষা করা দরকার।’
বোয়িংয়ের প্রতিক্রিয়া
সালেহপৌরের এই অভিযোগ প্রচারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বোয়িং একটি বিবৃতি দিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে। বিবৃতিতে বলা হয়- ‘বোয়িং একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠান এবং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার সিরিজের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী।’
তবে আহমেদাবাদের ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে- এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে কতটা বাস্তবতা রয়েছে তা নিয়ে।
টেকঅফের সময়ই কি ছিল সমস্যা?
বিমান দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ জেফরি টমাস বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ভিডিও দেখে বোঝা যাচ্ছে বিমানের চাকা তখনো নামানো ছিল, অথচ ডানার ফ্ল্যাপ গোটানো ছিল, যা খুবই অস্বাভাবিক। ফ্ল্যাপ দিয়ে সাধারণত বিমান ওঠা ও নামার সময় গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।’ টমাসের মতে, ‘টেকঅফের কিছুক্ষণের মধ্যেই ডানার ফ্ল্যাপ সম্পূর্ণ গোটানো ছিল, এটা একেবারেই স্বাভাবিক নয়।’
আরেক বিশ্লেষক টেরি টোজার বলেন, ‘ভিডিওতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ফ্ল্যাপগুলো খোলা ছিল না। এটা প্রমাণ করে বিমানটি হয়তো ঠিকমতো উড্ডয়নই করতে পারেনি।’
কী হতে পারে কারণ?
দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে এখনো সরকারি তদন্ত চলছে। ভারতের এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। বোয়িং জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে পূর্ণ সহযোগিতা করবে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী সম্ভাব্য কারণ হতে পারে- ফ্ল্যাপ ও আন্ডারক্যারেজ ব্যবস্থার ত্রুটি, পাইলটের সিদ্ধান্তমূলক ভুল, কাঠামোগত দুর্বলতা (যেমন ফিউজলাজ জয়েন্ট)। এ ছাড়া দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যেতে পারে ফ্লাইট রেকর্ডার (ব্ল্যাক বক্স) বিশ্লেষণ করে। ফলে ব্ল্যাক বক্স পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
বোয়িংয়ের জন্য নতুন সংকট?
বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এতদিন নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও এ দুর্ঘটনা নতুন করে বিমানটির কাঠামো ও মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে ৭৩৭ ম্যাক্স সিরিজের দুটি মারাত্মক দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে বোয়িংয়ের গ্রহণযোগ্যতা কমে গিয়েছিল। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ইন্দোনেশিয়া ও ইথিওপিয়ায় প্রাণ হারান মোট ৩৪৬ জন আরোহী। এসব ঘটনায় বোয়িংয়ের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। তদন্তে উঠে আসে, উড়োজাহাজের স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার সিস্টেমে ত্রুটি ছিল, যা এই দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ফলে প্রায় এক বছরের জন্য ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলটি বিশ্বজুড়ে গ্রাউন্ডেড করা হয়। পরবর্তী সময়ে সফটওয়্যার আপডেট ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের পর এ মডেলটি পুনরায় আকাশে ওড়ার অনুমতি পায়।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের প্রধান প্রধান এয়ারলাইনস তাদের বহরে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার রেখেছে, যার সংখ্যা ১ হাজার ১০০টিরও বেশি। আধুনিক প্রযুক্তির এই মডেলটি অন্যান্য উড়োজাহাজের তুলনায় অনেক বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী এবং এর শব্দদূষণও তুলনামূলকভাবে কম। পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার সক্ষমতার কারণে ড্রিমলাইনার দ্রুতই আন্তর্জাতিক আকাশপথে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে আহমেদাবাদের দুর্ঘটনার পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন প্রয়োজন সব চলমান ৭৮৭ বিমান পুনঃপরীক্ষা করা, স্বাধীনভাবে ফিউজলাজ জয়েন্ট ও সিম ত্রুটি বিশ্লেষণ করা এবং বোয়িংয়ের মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন করা।
আহমেদাবাদের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু একটি এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইটের না, বরং এটি বোয়িং ৭৮৭ সিরিজের ওপর বিশ্বের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।