ইরানের জনগণকে সাহায্য করতে রাশিয়া প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
তিনি বলেছেন, ‘ইরানের ওপর হামলার কোনো ভিত্তি নেই। রাশিয়া সব সময় ইরানি জনগণের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে।’
রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে স্থানীয় সময় সোমবার (২৩ জুন) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে এক বৈঠকের শুরুতে পুতিন এই মন্তব্য করেন। বৈঠকে আরাগচি সম্প্রতি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং রাশিয়ার সমর্থনের জন্য পুতিনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া ইতিহাসের সঠিক পাশে রয়েছে।’ এ সময় তিনি জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান পুতিনের প্রতি তাদের শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন।
এদিকে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ফলে এই সংঘাতে জড়িত পক্ষের সংখ্যা বেড়েছে এবং তা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। তিনি জানান, পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং এতে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি আছে কি-না তা এখনো নিশ্চিত নয়।
পেসকভ আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলা সম্পর্কে পুতিনকে আগে থেকে কিছু জানাননি। যদিও রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে কিছু সাধারণ আলোচনা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
রাশিয়া ও ইরান দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ মিত্র। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তিতে রাশিয়া ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। তবে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন।
যদিও রাশিয়া ইরানকে সমর্থন করছে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার কারণে মস্কোর পক্ষে ইরানকে বড় ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া আপাতত কঠিন হবে। তবুও কূটনৈতিক ও নৈতিকভাবে রাশিয়া ইরানকে পাশে রাখার বার্তা দিচ্ছে।
তবে পুতিনের বক্তব্য স্পষ্ট, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে রাশিয়া কড়া অবস্থানে আছে এবং ইরানি জনগণের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত।
কেন ইরানকে সরাসরি সাহায্য করছে না রাশিয়া? ব্যাখ্যা দিলেন পুতিন
পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমেই বাড়ছে উত্তেজনা। এরই মধ্যে গত রবিবার ভোর রাতে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে সরাসরি যোগ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের তিন পরমাণুকেন্দ্র লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালিয়েছে তারা। সেই হামলার কড়া নিন্দা করেছে রাশিয়া। তা হলে রাশিয়া কেন ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্বে যোগ দিচ্ছে না? এবার তার ব্যাখ্যা দিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক হামলার পর রবিবারই এক সাক্ষাৎকারে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে মস্কোর ভূমিকা স্পষ্ট করেছেন তিনি। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবাগে ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকে পুতিন জানান, পশ্চিম এশিয়ার মিত্রদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে রাশিয়ার।
পুতিন বলেন, ‘আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তৎপরবর্তী রাশিয়ার প্রায় ২০ লাখ মানুষ ইসরায়েলে বাস করে। একে প্রায় রুশ ভাষাভাষী দেশ বললেও ভুল বলা হবে না! রাশিয়ার সমসাময়িক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একে আমরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করি।’
পুতিন আরও জানিয়েছেন, রাশিয়ার জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মুসলিম ধর্মাবলম্বী। এ ছাড়াও, রাশিয়া ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন’-এর পর্যবেক্ষক। ফলে গত কয়েক দশক ধরেই পশ্চিম এশিয়ায় একটি ভারসাম্যমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে রাশিয়া।
রুশ প্রেসিডেন্ট জানান, ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বুশেহরে ইরানের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণেও সহায়তা করেছিল রাশিয়া। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গেও রাশিয়ার সম্পর্ক খারাপ নয়।
পুতিন বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে মস্কোর যেমন শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে, তেমনই উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে ইসরায়েলের সঙ্গেও।’
ফলে ইরানের পাশে দাঁড়ালেও রাশিয়া যে ইরান-ইসরায়েলের সংঘাতে এখনই সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হচ্ছে না, পুতিনের বার্তা থেকেই তার খানিক আঁচ পাওয়া গিয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, আনন্দবাজার পত্রিকা