ইসরায়েল ১০ ঘণ্টার জন্য সামরিক অভিযান স্থগিত ঘোষণার পর জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গাজায় বিমান থেকে খাদ্যসামগ্রী ফেলতে শুরু করেছে।
রবিবার (২৭ জুলাই) জর্ডানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমান থেকে গাজায় ২৫ টন খাবার ও মানবিক সরঞ্জাম ফেলেছে জর্ডান ও আরব আমিরাত। এতে অংশ নিয়েছে জর্ডানের সি-১৩০ মডেলের দুটি এবং আরব আমিরাতের একটি বিমান। গাজার একাধিক স্থানে এসব খাবার ফেলা হচ্ছে।
রয়টার্সকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জর্ডানের এক সরকারি কর্মকর্তা। এই উদ্যোগ এমন এক সময় এল, যখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা গাজায় অনাহার ও অপুষ্টি ছড়িয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছিল।
আল-জাজিরার যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে গাজা সিটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ত্রাণের প্যাকেট পড়তে দেখা যায়। তবে ওই ত্রাণগুলো জর্ডান ও ইউএই যৌথ অভিযানের অংশ কি না, সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গাজায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই রবিবার থেকে ইসরায়েল ১০ ঘণ্টার ‘কৌশলগত বিরতির’ ঘোষণা দেয়। প্রতিদিন স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আল-মাওয়াসি, দেইর আল-বালাহ ও গাজা সিটির নির্দিষ্ট এলাকায় কৌশলগত বিরতি কার্যকর থাকবে। এমন পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা।
রবিবার সকালে ইসরায়েলও ত্রাণ ফেলেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে ইসরায়েলের ‘এয়ারড্রপ’ শরণার্থীদের তাঁবুতে পড়ে ১১ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। গাজায় দুর্ভিক্ষ ও চরম ক্ষুধায় বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠায় ইসরায়েল গতকাল শনিবার জানায়, গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের অংশ হিসেবে তারা একটি ত্রাণ প্যারাসুট মিশন পরিচালনা করেছে।
গাজার স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই ত্রাণের কিছু প্যালেট আল-রাশিদ সড়কের পাশে শরণার্থীদের বসবাসরত তাঁবুতে পড়ে। এতে তাঁবুর ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা আহত হয়েছেন। এটি উপত্যকার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি প্রধান উপকূলীয় সড়ক। ত্রাণবাহী প্যালেটের অনেকগুলোই আবার শরণার্থী কেন্দ্রগুলোর চেয়ে দূরে, এমনকি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির কাছাকাছি এলাকায় গিয়ে পড়ে।
হামাস এই পদক্ষেপকে ‘প্রতীকী ও বিভ্রান্তিমূলক’ বলে অভিহিত করে বলেছে, এটি ইসরায়েলের ভাবমূর্তি রক্ষার কৌশল। হামাস জানায়, এটি একটি পরিকল্পিত নীতির অংশ, যার মাধ্যমে ইসরায়েল গাজার জনগণের ওপর অনাহার চাপিয়ে দিচ্ছে। তাদের দুর্ভিক্ষের মধ্যে ফেলছে এবং চরম অবমাননার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
হামাস আরও জানায়, গাজায় ত্রাণ সরবরাহে ব্যর্থতার জন্য বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সরাসরি দায়ী করা উচিত। ফিলিস্তিনিদের ক্ষুধায় মৃত্যুর জন্য নেতানিয়াহুর নীতি স্পষ্টতই যুদ্ধাপরাধ।
অতীতেও গাজায় পরিচালিত ‘ত্রাণের প্যারাড্রপ’ কার্যকর হয়নি। এগুলো পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। এসব উদ্যোগ বরং বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা ডেকে আনে। গত বছর আকাশ থেকে ফেলা ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে মাথার ওপর ত্রাণের প্যালেট পড়ে পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হন।
বিভিন্ন মানবাধিকার এবং সাহায্য সংস্থা জানায়, প্যারাড্রপ পদ্ধতিকে তারা ‘বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর’ বলে মনে করছেন। গাজার ২০ লাখের বেশি ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য এসব উদ্যোগ নিতান্তই সামান্য।
বিবিসির সংবাদদাতা জো ইনউড লিখেছেন, ‘গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য মাত্র একবেলার খাবার নিশ্চিত করতে হলেও অন্তত ১৬০টি বিমানের প্রয়োজন হবে।’
তবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিইর স্টারমার সম্প্রতি এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে জর্ডানের সঙ্গে মিলে ত্রাণ সরবরাহ পুনরায় শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১৩৩ জন অপুষ্টিতে মারা গেছেন। সূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি ও রয়টার্স