যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে সরাসরি একটি বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এটি তার সর্বশেষ পদক্ষেপ।
হোয়াইট হাউসে স্থানীয় সময় সোমবার (১৮ আগস্ট) জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতাদের এই প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। এ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন থামানোর উপায়।
ট্রাম্প জানান, তিনি পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর বৈঠকের প্রস্তুতি শুরু করেছেন এবং পুতিন-জেলেনস্কির দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর নিজেও দু’জন নেতার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।
তিনি তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে লেখেন, “এটি একটি ভালো এবং প্রাথমিক পদক্ষেপ—একটি যুদ্ধের ক্ষেত্রে, যা প্রায় চার বছর ধরে চলছে।”
ট্রাম্প আরও জানান, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে সমন্বয় করছেন।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এবং ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে আলাদাভাবে নিশ্চিত করেন যে পুতিন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রাজি হয়েছেন। তবে সময় ও স্থান নির্ধারণ হয়নি।
জেলেনস্কি সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে এবং তিনি পুতিনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
তবে মস্কো এখনো বৈঠকে সম্মতির বিষয়টি প্রকাশ করেনি। রুশ সংবাদ সংস্থা তাস প্রেসিডেন্টের সহকারী ইউরি উশাকভকে উদ্ধৃত করে জানায়, ট্রাম্প-পুতিন আলোচনায় “রাশিয়া-ইউক্রেনের সরাসরি সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে।”
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা
প্রস্তাবিত এ বৈঠক হবে পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাৎ। আলোচনায় ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে সেই নিশ্চয়তা কেমন হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
শান্তিরক্ষী পাঠানো প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে ট্রাম্প জানান, ইউরোপীয় দেশগুলো হবে ইউক্রেনের জন্য প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, তবে যুক্তরাষ্ট্রও বেশ কিছু সহায়তা দেবে। তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো নেতৃত্ব দেবে, আর যুক্তরাষ্ট্র থাকবে সমন্বয়কের ভূমিকায়।
জেলেনস্কি জানান, তার অংশীদাররা এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিশ্চয়তার খসড়া তৈরি করবে।
যদিও ট্রাম্প ইউক্রেনকে ন্যাটো সদস্যপদ দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন, তার বিশেষ দূত উইটকফ বলেন, পুতিন ন্যাটোর সমষ্টিগত প্রতিরক্ষার মতো একটি নিশ্চয়তা ব্যবস্থার বিষয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী।
ন্যাটো চুক্তির ৫নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সদস্য রাষ্ট্রে হামলা হলে তা সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হয়।
সোমবার আলোচনার পর মার্ক রুটে ফক্স নিউজে বলেন, ওয়াশিংটনের অংশগ্রহণকে “একটি বড় অগ্রগতি’’ মনে করা হচ্ছে। তবে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলবে।
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় সেনা মোতায়েনের বিষয়টি আলোচনায় আসেনি। রুটে বলেন, ‘‘আমরা সবাই একমত—যদি যুদ্ধ থামানো যায়, তবে তা স্থায়ীভাবে থামাতে হবে।’’
বিশেষজ্ঞদের মতামত
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নির্বাসিত রুশ গবেষক কনস্টানটিন সোনিন সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তার জন্য ইউরোপীয় সেনা ইউক্রেনে মোতায়েন করা দরকার। কিন্তু এটি পুতিনের জন্য একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। ফলে ইউরোপীয় নেতাদের ট্রাম্পকে বোঝাতে হবে যে এমন নিশ্চয়তা না থাকলে যুদ্ধ এখন থামলেও খুব শিগগিরই আবার শুরু হবে।
তিনি বলেন, ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে লিখিত নিশ্চয়তার ফাঁদে পড়েছে, যেমন ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের সময়। রাশিয়া বহু চুক্তিতে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তকে স্বীকৃতি দিয়েছে—২০০৪ সালে পুতিন নিজেও একটি চুক্তিতে সই করেছিলেন। তবুও ২০১৪ ও ২০২২ সালে সব চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউক্রেন বিষয়ক অধ্যয়ন বিভাগের গবেষক ইরিনা স্কুবি বলেন, এখনই কোনো চুক্তি সম্ভব কি না তা বলা যায় না। যদি রাশিয়া এখনো ইউক্রেনকে সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিতে দেখে এবং সর্বোচ্চ দাবি করে—অঞ্চল দখল ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে—তাহলে কোনো চুক্তিই সম্ভব নয়। কারণ এর মানে হবে ইউক্রেনকে নিজের সার্বভৌমত্ব আক্রমণকারীর হাতে তুলে দেওয়া।
ভূখণ্ড বিনিময়ের কঠিন সমীকরণ
হোয়াইট হাউসে আলোচনার পরও শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেন কতটা ভূখণ্ড ছাড়তে হতে পারে, তা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। বৈঠকের আগে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়া আর ইউক্রেনকে ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি ইঙ্গিত দেন, যুদ্ধ শেষ করতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে “কিছু জমি অদলবদল ও সমন্বয়’’ হতে পারে।
রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। অপরদিকে, ইউক্রেন গত বছরের পাল্টা আক্রমণে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণে নিলেও বর্তমানে রুশ ভূখণ্ড ধরে রাখতে পারে নি।
মার্কো রুবিও ফক্স নিউজে বলেন, চুক্তির জন্য মস্কো ও কিয়েভ উভয়কেই ছাড় দিতে হবে। রুবিও বলেন, অবশ্যই জমি বা সীমানা নির্ধারণ করা জরুরি যা যুদ্ধের পরিণতি নিশ্চিত করবে। হয়তো এটা সহজ হবে না, ন্যায্যও নাও হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ শেষ করতে এটাই একমাত্র উপায়।
জেলেনস্কি অবশ্য বারবার স্পষ্ট করেছেন, তিনি কোনো ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেবেন না।
কিয়েভভিত্তিক সামরিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশ্লেষক ইউরি পোইটা আল জাজিরাকে বলেন, ইতিবাচক পরিবেশ এবং ট্রাম্পের শান্তি প্রতিষ্ঠার ইচ্ছার কারণে বৈঠকটিকে ইউক্রেনের জন্য আংশিক সফল বলা যেতে পারে।
তিনি বলেন, আগে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার দাবি যুক্তরাষ্ট্রকে বিরক্ত করেছিল, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে উভয় পক্ষ এ নিশ্চয়তার কাঠামো নিয়ে কাজ শুরু করেছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা হয় এবং রাশিয়ার নতুন হামলা ঠেকানো যায়। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/