বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কোয়ারে চীনের ইতিহাস তথা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক কুচকাওয়াজে বিশ্বকে শান্তি ও সংলাপের পথে হাঁটার আহ্বান জানান চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) এই সামরিক কুচকাওয়াজে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব এখন শান্তি নাকি যুদ্ধ—এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
পশ্চিমা কোনও দেশের নেতা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। শি জিনপিংয়ের পাশাপাশি অতিথি হিসেবে কুচকাওয়াজে উপস্থিত ছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। মঞ্চে শি জিনপিংয়ের দুই পাশে বসেন পুতিন ও কিম। তারা ছাড়াও এই কুচকাওয়াজে তাদের সঙ্গে সহ মোট ২৬ জন রাষ্ট্রপ্রধান যোগ দিয়েছেন।
কুচকাওয়াজে খোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে শি জিনপিং সেনাদের সালাম গ্রহণ করেন। এই কুচকাওয়াজে নতুন কিছু অত্যাধুনিক অস্ত্র প্রদর্শন করেছ চীন।
এসব অস্ত্রের মধ্যে আছে কয়েক ধরণের লেজার অস্ত্র, পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পানির নিচের ব্যবহারযোগ্য ড্রোনসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম। একই সঙ্গে আকাশে হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমানের মহড়া চলে।
এছাড়া, এসময় পিপলস লিবারেশন আর্মির (PLA) সদস্যরা HQ-22A ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রদর্শন করেন। ৭০ মিনিটের এই শোভাযাত্রার শেষে আকাশে উড়ানো হয় ৮০ হাজার শান্তির কবুতর ও রঙিন বেলুন।
মাও সেতুং-এর ধাঁচে তৈরি পোশাক পরে প্রেসিডেন্ট জিনপিং লাল কার্পেটে ২০টিরও বেশি দেশের নেতাদের স্বাগত জানান।
এদিকে, মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য পুতিন এবং কিমকে তীব্র সমালোচনা করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তিনি লিখেন, "ভ্লাদিমির পুতিন এবং কিম জং উনকে আমার উষ্ণ শুভেচ্ছা জানান, কারণ আপনারা আমেরিকার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। কূটনৈতিক সমর্থন, তেল কেনা আরো বাড়িয়ে দেওয়া এবং রাশিয়া থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার মাধ্যমে বেইজিং মস্কোর যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে।"
যদিও পরে সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প বলেন, এই প্যারেডকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন না। আর, জাপান এ বিষয়ে মন্তব্য করা এড়িয়ে গিয়ে জানায়, তারা চীনের সঙ্গে “গঠনমূলক সম্পর্ক” গড়ে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়োজন শুধু সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে নতুন এক অক্ষশক্তি জাগিয়ে তোলার কৌশলও। যা একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার জন্য চীনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে তার প্রতিরোধকে তুলে ধরে।
এদিকে, রয়টার্স বলছে, গত দুই বছরে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সেনাবাহিনীর এক ডজনেরও বেশি জেনারেলকে সরিয়েছেন শি জিনপিং। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্যারেডে আধুনিক সামরিক অগ্রগতি দেখানো হলেও ভেতরের সংকটগুলো আড়াল করার চেষ্টা ছিল।
বেলারুশের শক্তিশালী নেতা আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ সহ অনেক নেতা কুচকাওয়াজে যোগদানের জন্য শীর্ষ সম্মেলনের পরেও চীনে ছিলেন। আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান এবং আজারবাইজানের রাষ্ট্রপতি ইলহাম আলিয়েভ, যাদের সরকার এসসিওতে যোগদানের পর বেইজিংয়ে ছিলেন এই সামরিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য।
আরো পড়ুন-
> পুতিন এবং কিমের উপস্থিতিতে কুচকাওয়াজে চীনের নতুন অস্ত্র প্রদর্শন
> চীনে নজিরবিহীন সামরিক কুচকাওয়াজ: কারা থাকছেন, কেন তা গুরুত্বপূর্ণ
> পুতিন-শি জিনপিং ও মোদির বৈঠক লজ্জাজনক: যুক্তরাষ্ট্র
এই সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নিতে বিদেশী নেতাদের দীর্ঘ সময় চীনে অবস্থান করার ফলে হাই-প্রোফাইল ইভেন্টগুলোর পাশাপাশি বৈঠক এবং চুক্তির যেন ঝড় ওঠে শহরটিতে।
কাজাখস্তান ঘোষণা করেছে, তারা চীনের সাথে ৭০টিরও বেশি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া জানিয়েছে যে তারা ২০টিরও বেশি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মধ্যে চীন ও রাশিয়া নতুন সাইবেরিয়ান গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তিও আছে।
প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে বেরিয়ে শি, পুতিন এবং কিম নিজেরা বৈঠক করেন। তিন নেতার বৈঠকের পর ভ্লাদিমির পুতিন এবং কিম জং উন চীন ত্যাগ করেন।
সুলতানা দিনা/