রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের জন্য পশ্চিমাদের প্রস্তাবিত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিবেশী দেশটিতে কোনো বিদেশি সেনা মোতায়েন হলে তারা রাশিয়ার সেনাবাহিনীর জন্য “বৈধ লক্ষ্যবস্তু” হবে।
আজ শুক্রবার পুতিন এ সতর্কবার্তা দেন, একদিন আগে ডজনখানেক দেশ শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হলে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার অংশ হিসেবে ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর অঙ্গীকার করার পর।
গতকাল বৃহস্পতিবারের “কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং”-এর এক সম্মেলনে ইউক্রেনের ২৬টি মিত্র দেশ সম্মত হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি সফল হলে পুনরায় রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে তারা সেনা মোতায়েন করবে। তবে এ ধরনের নিরাপত্তা উদ্যোগ কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অপরিহার্য হলেও দেশটি ইউক্রেনে সেনা মোতায়েন করবে কি না তা এখনো অনিশ্চিত। তবে ট্রাম্প আগেই বলেছেন, ওয়াশিংটন ইউক্রেনের মাটিতে সেনা পাঠাবে না, তবে বিমান হামলা ইত্যাদি অন্য সহায়তা দিতে পারে।
পূর্বাঞ্চলীয় শহর ভ্লাদিভোস্তকে অনুষ্ঠিত ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরামে পুতিন বলেন, “যদি কিছু সেনা সেখানে উপস্থিত হয়, বিশেষ করে এখন যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, তাহলে আমরা ধরে নেব যে তারা বৈধ লক্ষ্যবস্তু।” সম্প্রতি চীন ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রদর্শনের পর এ বক্তব্য দিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
পুতিন আরও বলেন, বিদেশি সেনা মোতায়েন দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য সহায়ক হবে না। বরং তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে ইউক্রেনের পশ্চিমাদের সঙ্গে সামরিক ঘনিষ্ঠতা এই যুদ্ধের অন্যতম “মূল কারণ”, যা শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ বাহিনী ইউক্রেনে প্রবেশ করার মাধ্যমে।
তিনি বলেন, “যদি এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয় যা শান্তি, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বয়ে আনবে, তাহলে আমি ইউক্রেনের ভূখণ্ডে তাদের উপস্থিতির কোনো অর্থ দেখি না—এতেই শেষ।”
আলাদাভাবে, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, প্যারিস সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব “একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা এটিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখব—ইউক্রেনের মাটিতে আন্তর্জাতিক বাহিনী, বা কোনো বিদেশি সেনা, বা ন্যাটো বাহিনীর উপস্থিতি—আমাদের সীমান্তের এত কাছাকাছি।”
পেসকভের দাবি, ইউক্রেনের জন্য প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তা নিশ্চয়তাই ২০২২ সালে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনায় গৃহীত চুক্তির মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইস্তাম্বুল কাঠামোর অধীনে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগদানের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করবে এবং নিরপেক্ষ, পারমাণু অস্ত্রমুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে।
তবে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের নেতৃত্বে আয়োজিত প্যারিস সম্মেলনের প্রস্তাবে বলা হয়, ভবিষ্যতের কোনো শান্তিচুক্তি কার্যকর করতে ইউক্রেনে “আশ্বাসদাতা” বাহিনী টহল দেবে। ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে যে, রাশিয়া অতীতে স্বাক্ষরিত বহু চুক্তি ভঙ্গ করেছে, বিশেষ করে ২০১৪-২০২২ সালের মধ্যে যখন রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ইউক্রেনের সেনাদের সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছিল।
অনিশ্চয়তা
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর আয়োজিত প্যারিস সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি উপস্থিত ছিলেন, আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারসহ আরও অনেকে ভার্চ্যুয়ালি যোগ দেন।
ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বে নতুন এ উদ্যোগ ইউরোপের নিজস্ব সক্ষমতা প্রদর্শনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে যখন ট্রাম্প সরাসরি পুতিনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন—যা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, তিনি ক্রেমলিনের বর্ণনাকেই মেনে নিতে প্রস্তুত এবং যুদ্ধবিরতির জন্য রাশিয়ার দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল।
ফলে প্যারিসে গৃহীত পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র কতটুকু অংশ নেবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
পুতিন শুক্রবার আবারও বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ের জন্যই থাকতে হবে।
তিনি বলেন, “আমি আবারও বলছি, অবশ্যই রাশিয়া এসব চুক্তি বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু যেকোনো ক্ষেত্রে, এখনো পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে গম্ভীরভাবে কেউ আলোচনা করেনি।”
প্যারিস সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প বলেন, তিনি শিগগিরই পুতিনের সঙ্গে কথা বলবেন। পেসকভ জানান, এমন ফোনালাপ দ্রুতই আয়োজন করা সম্ভব। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/