যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দাবি করেছে যে, দোহায় হামাসের আলোচকদের ওপর ইসরায়েলের হামলার আগে তারা কাতারের কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানিয়েছিল। তবে কাতার এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) কাতারের রাজধানী দোহায় একটি আবাসিক এলাকায় হামলার কয়েক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউস থেকে এই বিবৃতি আসে। কাতার গাজায় যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি আলোচনায় প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিট সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ট্রাম্প প্রশাসনকে জানিয়েছিল যে, ইসরায়েল হামাসের ওপর হামলা চালাচ্ছে, যা দুর্ভাগ্যবশত কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থিত একটি অংশে ছিল।
তিনি বলেন, একটি সার্বভৌম দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাতার শান্তি প্রতিষ্ঠায় ঝুঁকি নিয়ে আমাদের সঙ্গে খুব কঠোর ও সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করছে। সেই কাতারের অভ্যন্তরে একতরফা বোমা হামলা ইসরায়েল বা আমেরিকার লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে পারে না। তিনি আরও বলেন, তবে, গাজার মানুষের দুর্দশা থেকে লাভবান হওয়া হামাসকে নির্মূল করা একটি যোগ্য লক্ষ্য।
লিভিট আরও যোগ করেন যে, ট্রাম্প তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে আসন্ন হামলার বিষয়ে কাতারিদের অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তবে কাতার এই বর্ণনা অস্বীকার করে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাজিদ আল-আনসারি মুখপাত্র বলেন, সরকারকে হামলার বিষয়ে আগে থেকে অবহিত করা হয়েছিল, এমন দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
এক্স-এ এক বিবৃতিতে মাজিদ আল-আনসারি লেখেন, মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে যে কলটি এসেছিল, তা দোহায় ইসরায়েলি হামলার ফলে সৃষ্ট বিস্ফোরণের শব্দের সময় এসেছিল।
হামাস জানিয়েছে, এই হামলায় তাদের পাঁচজন সদস্য নিহত হলেও তাদের মূল কর্মকর্তারা বেঁচে গেছে। কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে একজন কাতারি নিরাপত্তা কর্মকর্তাও ছিলেন। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসরায়েলি হামলাকে ‘‘কাপুরুষোচিত’’ বলে নিন্দা জানিয়েছে এবং ‘‘তাদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে লক্ষ্য করে যেকোনো পদক্ষেপের’’ নিন্দা করেছে।
এর আগে, উপসাগরীয় এই দেশটি ২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতায় সহায়তা করেছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উভয় প্রশাসনই কাতারের এই ভূমিকার নিয়মিত প্রশংসা করেছেন।
ট্রাম্প হামাসের আলোচনা দলকে সতর্ক করার মাত্র কয়েক দিন পরেই ইসরায়েল দোহায় এই হামলা চালায়, কারণ তিনি একটি নতুন যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র বারবার হামাসকে আলোচনা বিলম্বিত করার জন্য অভিযুক্ত করেছে। তবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বারবার আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
রবিবার ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লেখেন, ‘‘ইসরায়েলিরা আমার শর্ত মেনে নিয়েছে। এখন হামাসেরও তা মেনে নেওয়ার সময়। আমি হামাসকে মেনে না নেওয়ার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছি। এটিই আমার শেষ সতর্কতা, আর কোনোটি থাকবে না!’’
হামলার পর হামাস জানায়, যাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল, তারা ট্রাম্পের সর্বশেষ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
সংগঠনটি আরও বলেছে যে, এই হামলা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে নেতানিয়াহু এবং তার সরকার কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সব সুযোগ নষ্ট করতে এবং আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করতে চাইছে।
সংগঠনটি আরও বলে, এই অপরাধের জন্য আমরা দখলদার ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে মার্কিন প্রশাসনকেও দায়ী করছি, কারণ তারা আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে আগ্রাসন এবং অপরাধে ক্রমাগত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, লিভিট সাংবাদিকদের বলেন যে ট্রাম্প এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটিকে শান্তির একটি সুযোগ হিসেবে দেখতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প হামলার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও কথা বলেছেন, কিন্তু তিনি এই ঘনিষ্ঠ মার্কিন মিত্রের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন কিনা তা তিনি জানাননি। একই সঙ্গে তিনি কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গেও কথা বলেছেন।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতি সত্ত্বেও, আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসি-এর নির্বাহী পরিচালক খলিল জাহশান মনে করেন যে, এই অঞ্চলের অনেক দেশ এবং বাসিন্দা এখনও ট্রাম্প প্রশাসনকে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত হিসেবেই দেখবে।
তিনি বলেন, যখন ইসরায়েলকে এই অঞ্চলের ওপর তাণ্ডব চালানোর এবং আন্তর্জাতিক আইন ও এমনকি নিজেদের শত্রু নয় এমন মিত্র দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করার জন্য একরকম সবুজ সংকেত দেওয়া হয়, তখন প্রশ্ন জাগে: ইসরায়েলের অবস্থান কোথায়, এবং কেন ইসরায়েলকে এমনটা করার অনুমতি দেওয়া হবে?
কাতারে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক স্থাপনা আল উদেইদ এয়ার বেসও রয়েছে। এই ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান বাহিনীর পাশাপাশি কাতার আমিরি এয়ার ফোর্স, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স এবং মোট প্রায় ১০ হাজার কর্মী রয়েছে।
কাতার বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির জন্য একটি কূটনৈতিক সম্পদ হিসেবেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। তারা হামাস এবং তালেবানের মতো তাদের পররাষ্ট্রনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলগুলোর রাজনৈতিক কার্যালয়কে আশ্রয় দিয়েছে। কাতারি কর্মকর্তারা বলেছেন যে, তারা এক দশকেরও বেশি আগে ওয়াশিংটনের অনুরোধেই হামাসের কার্যালয়কে আশ্রয় দিতে রাজি হয়েছিলেন।
নাবিল খৌরি, যিনি ইয়েমেনে মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অফ মিশন হিসেবে কাজ করেছেন, তিনি বলেন, মঙ্গলবারের হামলার স্থানটি দোহা শহরের প্রাণকেন্দ্রে এবং আল উদেইদ থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে হওয়ায় তিনি হতবাক হয়েছেন।
তিনি বলেন, আমি যতটাই হতাশাবাদী এবং ইসরায়েলি বাড়াবাড়িতে অভ্যস্ত হই না কেন, আমাকে বলতেই হবে যে আমি হতবাক হয়েছি। আমি মনে করি প্রত্যেকেরই হতবাক হওয়া উচিত এবং তাদের স্বপ্নের জগৎ থেকে জেগে উঠে এই বাস্তবতা উপলব্ধি করা উচিত যে, ইসরায়েল এখন স্পষ্টতই একটি সম্পূর্ণ বখে যাওয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
খৌরি বলেন, এই হামলা সম্ভবত কূটনীতিকে বাধাগ্রস্ত করবে, এই অঞ্চলে মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও ক্ষুণ্ন করবে এবং মার্কিন-সমর্থিত আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা ভাবছে এমন যেকোনো গোষ্ঠী বা মিত্রদেরকে ভাবতে বাধ্য করবে।
খৌরি বলেন, সত্যি বলতে, আমি বুঝতে পারছি না যে, কীভাবে কেউ, বিশেষ করে আরব বিশ্বে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
জাহশান আরও বলেন যে, কাতারের প্রতিবেশী দেশগুলো, যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত (যারা ২০২০ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে) এবং সৌদি আরব (যাদেরকে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল-আরব স্বাভাবিকীকরণের ‘‘মুকুটমণি’’ হিসেবে দেখা হচ্ছে), তারাও একটি শক্তিশালী অবস্থান নিতে চাপ অনুভব করবে।
তিনি বলেন, যদি তারা তাদের কাউকে এমন একটি হামলার লক্ষ্য হতে দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে তারাও সবাই এমন হামলার লক্ষ্য হতে পারে। তারা কীভাবে এগিয়ে যাবে? সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/