নেপালে ‘জেনারেশন জি’ বা জেন জি আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মোড় নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল, সেনাপ্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেল ও আন্দোলনকারীর প্রতিনিধিদের মধ্যে চলছে দফায় দফায় বৈঠক। তবে বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো সমঝোতা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে কারা আসবেন, তা নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকি ও বিদ্যুৎ প্রকৌশলী কুল মান ঘিসিং।
তিন দিনব্যাপী এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় তরুণদের সংগঠন ‘জেন-জি’। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) ও ইউটিউবসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ থেকেই ওই আন্দোলনের সূচনা। এই প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক তরুণ-তরুণীর আয়ের একমাত্র উৎস ছিল। একপর্যায়ে বিক্ষোভ সহিংস রূপ ধারণ করে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, হামলা-পাল্টাহামলা, গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া সর্বত্র জ্বালাও-পোড়াও, সরকারি ভবনে আগুন এবং মন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিবিদদের বাড়িতে হামলা করা হয়। এসব ঘটনায় সাবেক এক প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীসহ অন্তত ৩১ জন নিহত হন। আহত হন ১৩০০ জনের বেশি। এরপরই সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে এবং প্রধানমন্ত্রী ওলি পদত্যাগ করেন। তাকে সামরিক বিমানে কাঠমান্ডু ছাড়তে দেখা গেছে এবং তিনি সেনাবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
বর্তমানে দেশের নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে নিয়েছে সেনাবাহিনী। সেনাপ্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেল জানিয়েছেন, একটি নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনী দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
এমন প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছেন দুই বিশিষ্ট ব্যক্তি- সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকি এবং প্রকৌশলী কুল মান ঘিসিং। গতকাল প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাউডেল, সেনাবাহিনী এবং জেন-জি প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকে তাদের নিয়েই মূলত আলোচনা হয়েছে।
সুশীলা কারকি: নির্ভীক বিচারপতি
৭৩ বছর বয়সী সুশীলা কারকি নেপালের ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র নারী প্রধান বিচারপতি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানের জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে তিনি ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ তাকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে। কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহও তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে কারকির বয়স ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে।
কুল মান ঘিসিং: বিদ্যুৎ খাতে রূপকার
অন্যদিকে আলোচনায় রয়েছেন বিদ্যুৎ প্রকৌশলী কুল মান ঘিসিং। তার নেতৃত্বেই নেপাল দীর্ঘমেয়াদি লোডশেডিং সমস্যার সমাধান করে। ঘিসিংকে একজন ‘দেশপ্রেমিক ও নিরপেক্ষ’ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। যদিও আন্দোলনকারীদের প্রথম পছন্দ ছিলেন বালেন্দ্র শাহ, তিনি দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ঘিসিং এবং কারকির নাম সামনে আসে।
যত দ্রুত সম্ভব সংকট নিরসনের চেষ্টা করছি : নেপালের প্রেসিডেন্ট
নেপালে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট দ্রুত নিরসনের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমি সব পক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করছি এবং দেশের বিদ্যমান কঠিন পরিস্থিতির সাংবিধানিক সমাধান বের করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আন্দোলনরত নাগরিকদের দাবিগুলো মেটাতে যত দ্রুত সম্ভব সমাধান খোঁজা হচ্ছে। আমি সব পক্ষকে আমার ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি। হিমালয় কন্যা নেপালে গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার পর সেনাবাহিনী দেশটিতে কারফিউ জারি করে।
কারাগার ভেঙে ১৩,৫০০ বন্দির পলায়ন
বিক্ষোভের সময় দেশজুড়ে বিভিন্ন কারাগারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় ১৩,৫০০ বন্দি পালিয়ে যায় বলে জানায় পুলিশ। এখনো হাজার হাজার বন্দি পলাতক রয়েছেন। সেনাবাহিনী জানায়, তারা এখন পর্যন্ত ১৯২ জন বন্দিকে পুনরায় আটক করেছে।
সেপ্রসাং শহরের একটি কারাগার থেকে তারা পালিয়েছিল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে পূর্বে রামেছাপ জেলায় আরেকটি কারাগারে সংঘর্ষের সময় সেনাবাহিনী গুলি চালায়। এতে ২ জন বন্দি নিহত এবং ১২ জন আহত হয়।
সীমান্তে ধরা পড়ছে পলাতক বন্দিরা
নেপালের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত এলাকা বিস্তীর্ণ এবং অনিয়ন্ত্রিত। অনেক বন্দি পালিয়ে ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের চেষ্টা করে। ভারতের সীমান্ত রক্ষীরা অন্তত ৬০ জন বন্দিকে আটক করেছে। তাদেরকে নেপালি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বিক্ষোভের সময় লুট হওয়া প্রায় ১০০টি অস্ত্র তারা উদ্ধার করেছে। বিক্ষোভকারীরা স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে রাজপথে নামে। সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন, সরকারি অফিস এবং বাণিজ্যিক ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ‘প্রায় ধ্বংস’ হয়ে গেছে: নেপালের সুপ্রিম কোর্ট
নেপালে বিক্ষোভের সময় আদালত ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ নথি ও সরঞ্জামের ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হয়েছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন নেপালের প্রধান বিচারপতি প্রকাশ মান সিং রাউত। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘নেপালের বিচারিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।’
বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিতেও সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পুনরায় চালু করার বিষয়েও বলা হয়েছে বিবৃতিতে। জানানো হয়, আগামী রবিবার থেকে সুপ্রিম কোর্ট নিয়মিত শুনানি শুরু করবেন। সূত্র: বিবিসি, এএফপি, হিমালয়ান টাইমস