আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশ আইভরি কোস্টে আগামী ২৫ অক্টোবর আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে তুমুল আলোচনার ঝড় চলছে। সেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন সাবেক ফার্স্ট লেডি সিমোন এহিভেট বাগবো, যিনি তার কঠোর ব্যক্তিত্বের কারণে ‘লৌহমানবী’ নামে পরিচিত।
বর্তমানে তিনি আইভোরিয়ান পপুলার ফ্রন্টের (FPI) এর সংসদীয় গ্রুপের সভাপতি। ওউতারা-পন্থী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া, দীর্ঘ কারাবাস এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের মতো সংকট ও নানান বিতর্ক পেরিয়ে নিজের নতুন দল নিয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে নামছেন এই রাজনীতিবিদ।
২০০০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত কোট ডি'আইভোরের প্রেসিডেন্ট লরেন্ট বাগবোর স্ত্রী হিসেবে, তিনি আইভোরি কোস্টের ফার্স্ট লেডি ছিলেন।
দেশটির আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সিমিওনি বাগবোকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট আলাসানে উয়াতারার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৭৬ বছর বয়সী এই নারী রাজনীতিবিদ জয়ী হলে তিনি আইভরি কোস্টের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হবেন।
১৯৪৯ সালে গ্র্যান্ড-বাসামের মুসোতে জন্মগ্রহণকারী সিমোন সত্তরের দশকে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ইতিহাস ও ভাষাতত্ত্বে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর শ্রমিক আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। সেই আন্দোলনের মাধ্যমেই তার পরিচয় হয় সাবেক স্বামী লরেন বাগবোর সঙ্গে, যিনি পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হন।
এই দম্পতি একসঙ্গে তৎকালীন স্বৈরশাসক ফেলিক্স হউফুয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন এবং একাধিকবার কারাবন্দী হন।
স্থানীয় পুলিশ অফিসার জিন এহিভেট এবং মারি জাহার কন্যা সিমোন একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে মৌখিক সাহিত্যে থার্ড সাইকেল ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। একজন মার্কসবাদী শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা হিসেবে প্রয়োগিক ভাষাতত্ত্বে তিনি কাজ করতেন। আইভোরিয়ান প্রেসে তাকে " হিলারি ক্লিনটন ডেস ট্রপিক্স" নামে ডাকা হতো।
১৯৮২ সালে তিনি এবং তার সাবেক স্বামী যৌথভাবে আইভরিয়ান পপুলার ফ্রন্ট (এফপিআই) গঠন করেন। ২০০০ সালে লরেন বাগবো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে সিমন হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রক্ষমতার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক। সমর্থকদের কাছে তিনি ‘মমতাময়ী’ হলেও বিরোধীদের কাছে ছিলেন কঠোর কর্তৃত্বের প্রতীক। তার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি সাবেক স্বামীর প্রশাসনের একটি বড় সিদ্ধান্তের।
তবে এই দম্পতির শাসনকালে দেশজুড়ে অস্থিরতা বাড়ে। বিদ্রোহ দমন, বিরোধী কণ্ঠরোধ ও নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। ২০১০ সালে নির্বাচনে হেরে গেলেও লরেন বাগবো ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। তাতেই শুরু হয় ভয়াবহ সংঘাত, যেখানে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন।
শেষ পর্যন্ত উয়াতারার সমর্থকরা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ঘিরে ফেললে স্বামীর সঙ্গে বাংকারে লুকান সিমন। সেখান থেকেই তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর সিমন ২০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। যদিও ২০১৩ সালে ‘জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে’ প্রেসিডেন্ট উয়াতারা তাকে সাধারণ ক্ষমা প্রদান করেন। গৃহযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) মামলা হয় বাগবো দম্পতির বিরুদ্ধে। যদিও সিমনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়, তার স্বামীকে সাত বছর কাটাতে হয় নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের আদালতে।
২০২১ সালে দেশে ফিরে লরেন বাগবো বিবাহবিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। কিন্তু বিচ্ছেদের পর দমে না গিয়ে সিমন নতুন রাজনৈতিক দল মুভমেন্ট অব ক্যাপাবল জেনারেশনস (এমজিসি) গড়ে তোলেন। এবার সেই দল থেকেই তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
অন্যদিকে, ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় লরেন এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে তার সমর্থকদের বড় অংশ সিমনের দিকে ঝুঁকতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সুলতানা দিনা/