ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে উপকূলীয় অঞ্চলে স্থানান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি জানিয়েছেন, দেশটির প্রশাসনিক কেন্দ্র অন্যত্র সরানো এখন আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নয়, বরং বাধ্যবাধকতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান ইন্টারন্যাশনালের খবর।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান পরামর্শ দিয়েছেন, নতুন রাজধানী দক্ষিণাঞ্চলের পারস্য উপসাগর তীরবর্তী এলাকায় হলে দেশটির বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে। এই অঞ্চল উন্মুক্ত সমুদ্রের সরাসরি প্রবেশাধিকার দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়নের নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।
তেহরানের অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, বিদ্যুৎ ঘাটতি, ভয়াবহ পানি সংকট, যানজট ও ভূমিধসের হুমকির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
রাজধানী স্থানান্তরের ধারণাটি কয়েক দশক ধরে উত্থাপিত হয়ে আসছে। ২০১৬ সালে দেশটির সংসদ রাজধানী স্থানান্তরের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে, কিন্তু উচ্চ ব্যয় এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধের ফলে সেটির অগ্রগতি থেমে যায়।
এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি সহ একাধিক পূর্ববর্তী সরকার সেমনান, কোম বা এসফাহানের মতো বিকল্প শহরে এই স্থানান্তরের প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি বিভিন্ন কারণে।
তবে, পেজেশকিয়ান হলেন প্রথম ইরানি প্রেসিডেন্ট যিনি এই স্থানান্তরকে অনিবার্য বলে ঘোষণা করলেন।
বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) হরমোজগান প্রদেশ সফরে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তেহরান, কারাজ ও কাজভিনসহ আশপাশের অঞ্চলে পানি সংকট চরমে পৌঁছেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সমস্যা চললেও কার্যকর সমাধান হয়নি।’
তিনি জানান, রাজধানী স্থানান্তরের প্রস্তাব গত বছরই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কাছে তোলা হয়েছিল। যদিও সে সময় তীব্র সমালোচনা হয়, কিন্তু সংকট এত গভীর হয়েছে যে এখন আর দেরি করা যাবে না।
ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তেহরানের স্থায়ী জনসংখ্যা বর্তমানে ১ কোটির বেশি। এত মানুষের পুরো ইরানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পানি ব্যবহার করে ফলে শহরটির পানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছে।
সাধারণত রাজধানীর ৭০ শতাংশ পানি আসে বাঁধ থেকে, বাকি ৩০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। কিন্তু বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় বাঁধগুলোর সক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে।
পেজেশকিয়ান জানান, ২০২৪ সালে ইরানে বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ১৪০ মিলিমিটার, যেখানে স্বাভাবিক মান ২৬০ মিলিমিটার। অর্থাৎ ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বৃষ্টি কমেছে। চলতি বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ, বৃষ্টিপাত নেমে এসেছে ১০০ মিলিমিটারেরও নিচে। এর ফলে বাঁধে পানি সঞ্চয় কমছে, অনেক কূপ শুকিয়ে যাচ্ছে এবং অন্য অঞ্চল থেকে প্রতি ঘনমিটার পানি আনার খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ ইউরো।
ইরানের প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেন, ‘অযথা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রাকৃতিক সম্পদের ভারসাম্য নষ্ট হলে শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ছাড়া কিছুই বাকি থাকবে না। ইতোমধ্যেই তেহরানের কিছু এলাকায় বছরে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ভূমিধস হচ্ছে, যা ভয়াবহ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়।’
সুলতানা দিনা/