ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট নতুন মোড় নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে দেশের তেল ও খনিজ সম্পদের বড় অংশ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। ঠিক এই সময়েই বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো নোবেল শান্তি পুরস্কার পান—যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
ওয়াশিংটনকে তেল-খনিজে অংশীদার করার প্রস্তাব
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস–এর বরাতে জানা গেছে, মাদুরো প্রশাসনের কর্মকর্তারা সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারকে ভেনেজুয়েলার তেল ও অন্যান্য খনিজ সম্পদে প্রাধান্যপূর্ণ অংশীদারিত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এটি ছিল কয়েক মাসের আলোচনার ফল। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর সরকারকে “নার্কো–সন্ত্রাসী কার্টেল” হিসেবে আখ্যা দিয়ে ক্যারিবীয় সাগরে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে এবং মাদকবাহী বলে দাবি করা কিছু নৌযান ধ্বংস করে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, মাদুরো মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য ভেনেজুয়েলার সব বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ তেল ও স্বর্ণ প্রকল্প খুলে দেওয়ার, তাদের অগ্রাধিকারভিত্তিক চুক্তি দেওয়ার এবং চীন, ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি বাতিলের প্রস্তাব করেন। এমনকি ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির গন্তব্য চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং কারাকাসের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, ফলে আলোচনাগুলো আপাতত ভেস্তে যায়।
চাভেজের সম্পদ জাতীয়তাবাদ থেকে সরে আসা
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, মাদুরোর অনুমোদনেই তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা এমন ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা প্রয়াত হুগো চাভেজের “সম্পদ জাতীয়তাবাদ” নীতির মূল ধারণা থেকে সরে আসার শামিল। প্রকাশ্যে সরকার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও আড়ালে তারা তেল, গ্যাস, স্বর্ণ, লোহা, বক্সাইট ও কোলটান খাতে বিদেশি বিনিয়োগের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে চাইছিল।
নোবেল পুরস্কারে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
মারিয়া কোরিনা মাচাদো “স্বৈরশাসন থেকে গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ ও ন্যায্য রূপান্তরের সংগ্রামের জন্য” নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। নরওয়ের নোবেল কমিটি তাকে “লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক ইতিহাসে নাগরিক সাহসের অনন্য উদাহরণ” বলে আখ্যা দিয়েছে।
পুরস্কারপ্রাপ্তির পর প্রতিক্রিয়ায় মাচাদো বলেন, “আমি নির্বাক। আমি তো একা কিছুই করতে পারি না—এটা পুরো সমাজের অর্জন।”
ওয়াশিংটনের বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই পুরস্কার ট্রাম্প প্রশাসনের “মাদুরোবিরোধী কঠোর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে” এবং ট্রাম্পের কূটনৈতিক অবস্থানকেও রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক করে তুলবে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ট্রাম্প নিজেও নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন।
ওয়াশিংটনে আরও কঠোর হচ্ছে অবস্থান
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও প্রশাসনের ভেতর মাদুরোবিরোধী অবস্থানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি মাদুরোকে “অবৈধ নেতা” এবং “মার্কিন বিচার থেকে পলাতক” বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে বিশেষ দূত রিচার্ড গ্রেনেল কূটনৈতিক আলোচনার পক্ষে ছিলেন, তবে আপাতত রুবিওর কঠোর নীতিই প্রাধান্য পাচ্ছে।
একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমস–কে জানান, নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা বাজারে প্রবেশাধিকারের বিষয়ে যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। তবে তারা স্বীকার করেন যে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ এবং নিষেধাজ্ঞা আংশিক প্রত্যাহারের বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে।
ক্যারিবীয় উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা
থিঙ্ক ট্যাংক সিএসআইএস–এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে এবং এর লজিস্টিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে পুয়ের্তো রিকো। বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর ১০ শতাংশের বেশি জাহাজ সেখানে দক্ষিণ কমান্ডের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে—যা ঠান্ডা যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় উপস্থিতি।
পুয়ের্তো রিকোর পন্সে বন্দরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর জ্বালানি ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে। সান হুয়ানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ন্যাশনাল গার্ড ঘাঁটি থেকে উড়ছে নেভির পি–৮এ পসেইডন নজরদারি বিমান। এছাড়া সিইবা এলাকায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রুজভেল্ট রোডস নৌঘাঁটিও পুনরায় চালু করেছে পেন্টাগন।
সিএসআইএস সতর্ক করেছে, এই “মাদকবিরোধী অভিযানগুলো” ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলাকে লক্ষ্য করে বৃহত্তর সামরিক অভিযানে রূপ নিতে পারে।
মাদুরোর কূটনৈতিক বার্তা ও মিশ্র সংকেত
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ সম্প্রতি মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরনকে তাদের যৌথ প্রকল্পগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেয়। এমনকি শেল কোম্পানিকেও দেশটিতে পুনরায় কাজ শুরু করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। ড্রাগন গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস প্রক্রিয়াজাত হয়ে ত্রিনিদাদ থেকে বিক্রি হবে। রুবিও জানিয়েছেন, এই প্রকল্প থেকে মাদুরো সরকার কোনো উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবে না।
জাতিসংঘে মাদুরোর অভিযোগ, সামরিক হামলার আশঙ্কা
এদিকে ভেনেজুয়েলা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি অধিবেশন আহ্বানের অনুরোধ করেছে, অভিযোগ করে যে যুক্তরাষ্ট্র “ভেনেজুয়েলায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে”।
রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ভেনেজুয়েলা জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন “আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিপন্ন করছে।” দেশটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, “খুব শিগগিরই সশস্ত্র হামলা” হতে পারে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ট্রাম্পের সামরিক ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় অঞ্চলে চারটি প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালিয়েছে। কারাকাসের অভিযোগ, “মাদকবিরোধী অভিযানের” নামে ওয়াশিংটন মূলত সম্পদ দখলের উদ্দেশ্যে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।
বিরোধীদের পাল্টা প্রস্তাব ও তেলের অঙ্ক
অন্যদিকে বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো ওয়াশিংটনে করপোরেট নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ভিন্ন প্রস্তাব দেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিশ্রুতি দেন যে তার রাজনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী ১৫ বছরে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য ভেনেজুয়েলায় ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তার উপদেষ্টা সারি লেভি বলেন, “মাদুরো বিনিয়োগকারীদের স্থিতিশীলতা নয়, কেবল নিয়ন্ত্রণ দেন—ভয়ের মাধ্যমে টিকে থাকা এক নিয়ন্ত্রণ।” তিনি আরও যোগ করেন, “মার্কিন প্রশাসন বুঝে গেছে, এমন সহজ সমাধানের ফাঁদে পা দেওয়া ঠিক হবে না।”সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
মাহফুজ/