ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিহত ফিলিস্তিনিদের দেহ থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরির ভয়াবহ অভিযোগ এনেছে গাজা কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় জেনেভা-ভিত্তিক সংস্থা ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
ইউরো-মেড মনিটর গাজার চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ফেরত পাওয়ার পরপরই কয়েকটি মরদেহ পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরির প্রমাণ পেয়েছেন। তারা নিশ্চিত করেছেন, এসব মরদেহ থেকে ত্বক, মানব টিস্যু, কক্লিয়া এবং কর্নিয়ার পাশাপাশি লিভার, কিডনি এবং হৃদপিণ্ডের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আগেই সংগ্রহ করে নেওয়া হয়েছে।
গাজার বেশ কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা ইউরো-মেড মনিটর টিমকে জানিয়েছেন যে, শুধু ফরেনসিক মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত করা যাবে না, কারণ মৃত্যুর আগেও একাধিক মরদেহের অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। তারা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অঙ্গ চুরির এরকম বেশ কয়েকটি লক্ষণ স্পষ্টভাবে শনাক্ত করেছেন।
ইউরো-মেড মনিটর জানিয়েছে, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনিদের মরদেহ ধরে রাখার ইতিহাস রয়েছে। তারা জর্ডান সীমান্তের কাছে অবস্থিত "নাম্বারস কবরস্থান"-এ কমপক্ষে ১৪৫ জন ফিলিস্তিনির দেহাবশেষ এবং সেই সঙ্গে জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ স্থানে প্রায় ২৫৫ জন ফিলিস্তিনির দেহাবশেষ সংরক্ষণ করে রেখেছে ।
মানবাধিকার সংস্থাটির মতে, ইসরায়েল মৃত ফিলিস্তিনিদের মরদেহ "শত্রু যোদ্ধা কবর" হিসেবে উল্লেখ করে। গোপন সামরিক অঞ্চলের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থিত কবরস্থানে গোপনে এসব মরদেহ দাফন করা হয়। এখানে মৃতদের দেহাবশেষ বা মরদেহ শুধু ধাতব প্লেট দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।
ইউরো-মেড মনিটরের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনি মরদেহগুলোকে শূন্যের নীচের তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করে রেখেছিল যাতে সেগুলো অক্ষত থাকে এবং তা সম্ভবত অঙ্গ চুরির প্রমাণ লুকানোর জন্যই করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল কর্তৃক আটক ফিলিস্তিনি মরদেহের অবৈধ ব্যবহারের খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরি এবং ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল স্কুলগুলোতে সেগুলোর ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত।
কিছুদিন আগেই ইসরায়েলি ডাক্তার মেইরা ওয়েইস তার " ওভার দ্য ডেড বডিস" বইতে জানান যে, মৃত ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে নেওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদে চিকিৎসা গবেষণায় ব্যবহার করা হয়। এছাড়া তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইহুদি-ইসরায়েলি রোগীদের মধ্যে প্রতিস্থাপন করা হত।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল বইটিতে বলা হয়েছে যে, ইসরায়েলের আবু কবির ইনস্টিটিউট অফ ফরেনসিক মেডিসিনের সাবেক পরিচালক ইয়েহুদা হেস মৃত ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে মানব টিস্যু, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং ত্বক চুরির বিষয়টি স্বীকারও করেছেন।
এদিকে, শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের পরিচালক ইসমাইল থাওয়াবতা জানান, গত তিন দিনে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির মাধ্যমে ইসরায়েল ১২০টি মরদেহ ফেরত দিয়েছে। তিনি বলেন, এসব দেহের অধিকাংশই ভয়াবহ অবস্থায় ছিল। নির্যাতন ও গুলি করে এবং পরিকল্পিতভাবে হত্যার স্পষ্ট প্রমাণ দেখা গেছে।
থাওয়াবতা আরও জানান, অনেক মরদেহের চোখ, কর্নিয়া, কিডনি, হৃদপিন্ডসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনুপস্থিত। এমনকি কিছু মরদেহ হাত-পা বাঁধা অবস্থায়, চোখ বেঁধে রাখা অবস্থায় ফেরত এসেছে। কারও গলায় দড়ির দাগ, কারও শরীরে শ্বাসরোধের চিহ্ন—এসবই ইঙ্গিত দেয় ইসরায়েলি সেনারা তাদের হত্যা করেছে এবং অঙ্গ চুরি করেছে।
থাওয়াবতা এই পরিস্থিতিকে ‘অসভ্য ও নিষ্ঠুর অপরাধ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি অবিলম্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, যেন ইসরায়েলকে জবাবদিহির মুখে ফেলা যায়।
এছাড়া ইউরো-মেড মনিটর জানিয়েছে, উত্তর গাজা উপত্যকার আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্স এবং ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতাল থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কয়েক ডজন মৃতদেহ এবং "নিরাপদ করিডোর" - সালাহ আল-দিন রোডের আশেপাশের এলাকা থেকে কিছু মরদেহ জব্দ করেছে।
পাশাপাশি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আল-শিফা হাসপাতালের একটি আঙ্গিনায় অবস্থিত একটি গণকবর খনন করে মরদেহ জব্দ করেছে।
এদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখনো এসব অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল ক্যাম্পেইনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরায়েলের হেফাজতে রয়েছে ৭৩৫ জন ফিলিস্তিনি বন্দীর মরদেহ। তাদের মধ্যে ৬৭টি শিশু।
তবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, দক্ষিণ ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমির সডে তেইমান সামরিক ঘাঁটিতে গাজার প্রায় দেড় হাজার ফিলিস্তিনির দেহ সংরক্ষিত রয়েছে।
তাছাড়া, ইসরায়েল মৃত ফিলিস্তিনিদের মরদেহ ধরে রাখা এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরি করা বৈধ করেছে। ২০১৯ সালের ইসরায়েলি সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় সামরিক বাহিনীকে "নাম্বারস কবরস্থান"-এ অস্থায়ীভাবে মরদেহ দাফন করার অনুমতি দেয়। ২০২১ সালের শেষ নাগাদ, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট সেনাবাহিনী ও পুলিশকে ফিলিস্তিনিদের মরদেহ ধরে রাখার অনুমতি দিয়ে আইন পাস করে। সূত্র: দ্য মিডল ইস্ট মনিটর
সুলতানা দিনা/