যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়ার শীর্ষ দুই তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করতে ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো বড় পরিসরে রুশ তেল আমদানি কমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিল্পসূত্রে জানা গেছে, এ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তির পথে থাকা বড় একটি বাধা দূর করতে পারে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় থাকা এই বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক—যার অর্ধেকই রুশ তেল আমদানির প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা—কমানো হতে পারে। এর বিনিময়ে মস্কো থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি ধীরে ধীরে বন্ধ করতে সম্মত হতে পারে নয়াদিল্লি।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে ভারত সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে রাশিয়ার ছাড়ে বিক্রি হওয়া সমুদ্রপথের তেল আমদানি করে আসছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশটি দৈনিক প্রায় ১৭ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করেছে।
নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার দুটি বৃহত্তম তেল কোম্পানি—লুকওয়েল (Lukoil) ও রসনেফট (Rosneft)—এর ওপর আরোপ করা হয়েছে।
ভারতের বেসরকারি কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, যারা রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা, তারা রসনেফটের সঙ্গে বড় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিসহ রুশ তেল আমদানি কমানো বা পুরোপুরি বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। কোম্পানির এক মুখপাত্র বলেছেন, “রুশ তেল আমদানি পুনর্বিন্যাসের কাজ চলছে এবং রিলায়েন্স সম্পূর্ণভাবে ভারত সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগোবে।”
সরকারি তেল কোম্পানিগুলো—ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন (IOC), ভারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (BPCL) ও হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (HPCL)—এখন তাদের রুশ তেল আমদানির নথিপত্র পর্যালোচনা করছে যাতে নিষেধাজ্ঞার পর রসনেফট ও লুকওয়েল থেকে সরাসরি কোনো সরবরাহ না আসে।
একটি শিল্পসূত্র জানিয়েছে, “এবার ব্যাপকভাবে আমদানি কমবে। তবে তা একেবারে শূন্যে নামবে না, কারণ কিছু তেল হয়তো মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে আসতে পারে।”
গতকালের এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নেওয়া প্রথম পদক্ষেপ, যা ইউক্রেন ইস্যুতে মস্কোর ভূমিকা নিয়ে তার ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের প্রতিফলন।
আরবিসি ক্যাপিটালের বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফট এক নোটে লিখেছেন, “যদি ট্রাম্প প্রশাসন আজকের ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দেয়, তবে যারা যুক্তরাষ্ট্রের মূলধন বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে চায়, সেই পরিশোধনাগারগুলো রুশ তেল কেনা বন্ধ করবে।”
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, ২১ নভেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিগুলো রুশ তেল উৎপাদনকারী এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের লেনদেন গুটিয়ে নেওয়ার সময় পাবে।
এক ভারতীয় তেল কর্মকর্তার ভাষায়, “সবকিছুই ব্যাংকের ওপর নির্ভর করছে। ব্যাংক যদি অর্থপ্রদানের অনুমোদন দেয়, তাহলে আমরা কিনব; না হলে আমাদের আমদানি শূন্যে নামবে।”
রিলায়েন্স, যেটি ধনকুবের মুখেশ আম্বানির মালিকানাধীন এবং পশ্চিম ভারতের গুজরাটের জামনগরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল পরিশোধনাগার পরিচালনা করে, রসনেফটের কাছ থেকে দৈনিক প্রায় পাঁচ লাখ ব্যারেল তেল কেনার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে। পাশাপাশি তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমেও রুশ তেল কিনে থাকে।
সম্প্রতি রিলায়েন্স মধ্যপ্রাচ্য ও ব্রাজিল থেকে স্পট মার্কেটে তেল কিনেছে, যা আংশিকভাবে রুশ সরবরাহের বিকল্প হতে পারে। বৃহস্পতিবারও কোম্পানিটিকে নতুন সরবরাহের খোঁজে দেখা গেছে বলে মধ্যপ্রাচ্যের এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন।
সূত্রগুলোর মধ্যে একজন বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রুশ তেল থেকে উৎপাদিত জ্বালানি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার আগেই রিলায়েন্স তাদের রপ্তানিমুখী একটি পরিশোধনাগারে রুশ তেল কেনা বন্ধ করার পরিকল্পনা করেছিল।
রসনেফটের অংশীদার ভারতীয় কোম্পানি নয়ারা এনার্জিও রাশিয়ার এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে তেল কেনে, যদিও এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি।
শিল্প সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় সরকারি পরিশোধনাগারগুলো সাধারণত মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে রুশ তেল কিনে থাকে, সরাসরি রসনেফট বা লুকওয়েলের কাছ থেকে নয়।
এদিকে আজ বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। সূত্র: রয়টার্স
মাহফুজ/