পাকিস্তানে শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে দ্বন্দ্বের গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের গণমাধ্যমগুলো বলছে, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে দেশের প্রথম প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রধান (সিডিএফ) হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর এড়াতেই প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ পরিকল্পিতভাবে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
এ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল অনেকেই বলছেন, কিছুটা চালাকি করেই পাক প্রধানমন্ত্রী বাহরাইন গিয়ে সেখান থেকে সোজা লন্ডনে চলে গেছেন। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, তিনি এ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করতে চান না। ফলে নোটিফিকেশন জারি না হওয়ায় আসিম মুনিরকে পাঁচ বছরের মেয়াদ দিয়ে সিডিএফ পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া থমকে আছে।
আরেকপক্ষ বলছেন, পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের ভেতরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যদি ধরে নেওয়া হয় যে মুনিরের বর্তমান মেয়াদ শেষ, তাহলে পাকিস্তানে এখন কার্যত কোনো বৈধ সেনাপ্রধান নেই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিউক্লিয়ার কমান্ড অথরিটি, যাকে নতুন স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ডের অধীনে আনার কথা ছিল, সেটিও আটকে গেছে। এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য অস্বাভাবিকই নয়, অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তবে এমন গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ। এমন পরিস্থিতিতে বিড়ম্বনায় পড়েছে পাকিস্তান।
পাকিস্তানের যুগান্তকারী ২৭তম সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে সিডিএফ পদটি সৃষ্টি করা হয়। নতুন কাঠামোয় সিডিএফ পদটি সেনাবাহিনীর প্রধানের দায়িত্বের সঙ্গেই যুক্ত থাকবে—অর্থাৎ এটি হবে দ্বৈত দায়িত্বের একটি পদ। এই পদ সৃষ্টির ফলে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যানের (সিজেসিএসসি) পদটি বিলুপ্ত হয়েছে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ২৭ নভেম্বর শেষ হয়েছে।
আর সিজেসিএসসির পদ বিলুপ্তির ঘোষণার সঙ্গে সিডিএফ নিয়োগের নতুন প্রজ্ঞাপনটি জারি হবে বলে আশা করেছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং পর্যবেক্ষকেরা। কারণ দুদিন পর ২৯ নভেম্বর ছিল গুরুত্বপূর্ণ দিন। ওই দিন সেনাপ্রধানের মূল তিন বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
সরকার গত মাসেই দ্রুতগতিতে ২৭তম সংশোধনীটি জাতীয় সংসদে পাস করিয়ে নেয়। কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারি আটকে যাওয়ায় শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব বিব্রত অবস্থায় পড়েছে। প্রতিরক্ষা কাঠামোর উচ্চপর্যায়ের পুনর্গঠন নির্বিঘ্ন হবে বলে ধরে নিয়েছিলেন সামরিক পরিকল্পনাবিদেরা কিন্তু তা জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোর্ডের (এনএসএবি) সাবেক সদস্য তিলক দেবেশের এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, শেহবাজ শরিফ প্রথমে বাহরাইন ও পরে লন্ডনে চলে গেছেন। তিনি এমন সময় গেলেন, যখন সেনাপ্রধানের নতুন দায়িত্ব নিশ্চিত করতে তার স্বাক্ষর দরকার ছিল।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের ভেতরেই বিভক্ত মত শোনা যাচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করে, ২০০৪ সালের সেনা সংশোধনী আইনের ‘ডিমিং’ ধারার কারণে মুনিরের মেয়াদ আপনা-আপনিই পাঁচ বছর ধরা যেতে পারে, ফলে নতুন বিজ্ঞপ্তির প্রয়োজন নেই। তবে অন্য পক্ষের মতে, বিষয়টি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং শেষ পর্যন্ত আদালত ও সরকারের ব্যাখ্যাই নির্ধারণ করবে, কোন পথ খোলা থাকবে।
এমন গুঞ্জনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জিও নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) সভাপতি নওয়াজ শরিফ নোটিফিকেশন ঠেকিয়ে রেখেছেন—এ দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁর ভাষায়, ‘নওয়াজ কখনো এ ধরনের অবস্থান নেননি। তার বক্তব্যকে অযথা এ প্রসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।’
রানা সানাউল্লাহ বলেন, নতুন সিডিএফ প্রতিষ্ঠান ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ’ হবে এবং প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলেই যথাসময়ে নোটিফিকেশন জারি হবে। তিনি আরও জানান, যেদিন নোটিফিকেশন জারি হবে, সেদিন থেকেই শুরু হবে সিডিএফের পাঁচ বছরের মেয়াদ।
পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারারকে উদ্ধৃত করে দ্য ডন লিখেছে, অপ্রয়োজনীয় গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তার ভাষায়, মুনিরের মেয়াদ আগেই আইনগতভাবে সুরক্ষিত। নতুন সংশোধনী শুধু অভিন্ন পদ, সিওএএস-সিডিএফ গঠনের আনুষঙ্গিক বিধান যুক্ত করেছে। ফলে কিছু সময় লাগলেও এতে কোনো আইনগত জট সৃষ্টি হবে না।
তারার আরও জানান, সরকার শিগগিরই একটি নোটিফিকেশন জারি করবে, যার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে দেশের প্রথম প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রধান (সিডিএফ) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, মুনির ইতিমধ্যেই ‘সব দিক থেকেই ওই পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
গত মঙ্গলবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও জানান, প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী শিগগির দেশে ফিরছেন। নোটিফিকেশনও যথাসময়ে দেওয়া হবে।
ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বর্তমানে সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২৭তম সাংবিধানিক সংশোধনীর পর চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির পদ বিলুপ্ত করে যে নতুন কাঠামো করা হয়েছে, তার অধীনেই তাঁকে নতুন সিডিএফ পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। সিডিএফ ও সিওএএস—দুটি ভূমিকায় তাঁর দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব কীভাবে ভাগ হবে, তা সরকারই নির্ধারণ করবে।
এ ছাড়াও ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডে (এনএসসি) কমান্ডারের নিয়োগ বাকি আছে। আগে সিজেসিএসসির হাতে থাকা পারমাণবিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নতুন সৃষ্ট এই চার তারকা পদের অধীনে আসবে। কর্মকর্তাদের ধারণা, সিডিএফের প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত এ নিয়োগ দেওয়া হবে না।
এদিকে, সিজেসিএসসি পদ বিলুপ্তি এবং সিডিএফ ও এনএসসি কমান্ডারের পদ সৃষ্টিকে সংবিধানের ২৪৩ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি (এনসিএ) আইনেও সংশোধন আনা প্রয়োজন।
এই পরিবর্তনগুলো বেশ জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধানদের তুলনায় নতুন পদগুলোর অবস্থান কী হবে। তা ছাড়া কৌশলগত কমান্ড একীভূত এনএসসি কমান্ডারের অধীনে চলে গেলে বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধানেরা ভবিষ্যতে এনসিএতে প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখবেন কি না, তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে।
সুলতানা দিনা/