থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়া তাদের বিতর্কিত সীমান্তে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘর্ষের জন্য একে অপরকে দোষ দিচ্ছে এবং উভয় পক্ষই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করছে। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে এই সর্বশেষ সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
ক্যাম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) জানায়, সোমবার থেকে এ পর্যন্ত তাদের নয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে এবং ২০ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে থাই সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সংঘর্ষ পুনরায় শুরুর পর থেকে তাদের চারজন সেনা নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছে।
গত রবিবার রাতে নতুন করে লড়াই শুরু হয়, যা কয়েক লাখ মানুষকে ঘরছাড়া করে এবং জুলাই মাসে পাঁচ দিনের সংঘর্ষের পর টিকে থাকা নাজুক শান্তি পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে। জুলাইয়ের ওই সংঘর্ষে রকেট ও ভারী কামানের গোলাবিনিময় হয় এবং সীমান্ত জুড়ে প্রতিযোগী আঞ্চলিক দাবিগুলো উত্তেজনা বাড়ায় এবং উভয় পক্ষের অন্তত ৪৮ জনের মৃত্যু এবং ৩ লাখেরও বেশি মানুষের সাময়িক সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটায়।
পরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি হয়। তবে থাইল্যান্ড গত মাসে সেই চুক্তির বাস্তবায়ন স্থগিত করে, কারণ এক ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে তাদের এক সেনা পা হারান।
‘লড়াই করতে বাধ্য হচ্ছে ক্যাম্বোডিয়া’
থাই প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল বলেন, ক্যাম্বোডিয়া সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে থাইল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি এবং লড়াই চলবে।
“আমাদের যা করতে হবে, তা আমাদের করতেই হবে,” তিনি বলেন। “সরকার আগেই পরিকল্পিত সব ধরনের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করবে।”
থাই সামরিক বাহিনী জানায়, মঙ্গলবার ক্যাম্বোডিয়া থাই অবস্থান লক্ষ্য করে কামান, রকেট এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ক্যাম্বোডিয়ার শক্তিশালী সিনেট প্রেসিডেন্ট হুন সেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, আগের দিন তাদের সেনারা থাই বাহিনীর দিকে গুলি ছোড়া থেকে বিরত ছিল, কিন্তু রাতে তারা পাল্টা গুলি ছোড়া শুরু করে।
তিনি বলেন, থাই বাহিনী যেসব এলাকা দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল, সেখানে লক্ষ্যভেদ করলে পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে শত্রু বাহিনীকে দুর্বল ও ধ্বংস করা সম্ভব হবে।
হুন সেন আরও বলেন, “ক্যাম্বোডিয়া শান্তি চায়, কিন্তু নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষার জন্য ক্যাম্বোডিয়া বাধ্য হচ্ছে লড়াই করতে।”
উভয়পক্ষই প্রথম গুলি চালানোর জন্য অপর পক্ষকে দায়ী করছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মঙ্গলবার চলমান সংঘর্ষ নিয়ে উদ্বেগ জানায়।
“আমরা অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং উভয় পক্ষকে ২৬ অক্টোবরের কুয়ালালামপুর শান্তি চুক্তিতে উল্লিখিত উত্তেজনা-হ্রাসের পদক্ষেপে ফিরে যাওয়ার জন্য জোর আহ্বান জানাচ্ছি,” যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন।
কূটনীতির কোনো সুযোগ নেই
মঙ্গলবার সকালে এক বিবৃতিতে থাই নৌবাহিনী জানায়, তারা ট্রাট উপকূলীয় প্রদেশে তাদের ভূখণ্ড থেকে ক্যাম্বোডিয়ার বাহিনীকে হটিয়ে দিতে অভিযান চালাচ্ছে।
নৌবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যাম্বোডিয়ান বাহিনী ওই এলাকায় তাদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, স্নাইপার ও ভারী অস্ত্র মোতায়েন করছে, সুরক্ষিত অবস্থান তৈরি করছে এবং বাঙ্কার খুঁড়ছে—যা থাইল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের ওপর “সরাসরি ও গুরুতর হুমকি” হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই কারণেই তাদের হটিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুওংকেতকেও বলেন, ক্যাম্বোডিয়া এখনো “শান্তি আলোচনার জন্য প্রস্তুত নয়”।
তিনি বলেন, “একদিকে তারা বলে যে তারা প্রস্তুত, আবার মাটিতে তাদের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ উল্টো দিকে যায়।”
“যখন পরিস্থিতি কূটনীতিকে এগিয়ে নিতে উপযোগী হবে, তখনই কূটনীতি কাজ করবে,” তিনি বলেন। “দুঃখের সঙ্গে বলছি, বর্তমানে আমাদের সেই সুযোগ নেই।”
যদিও চলমান শত্রুতা ও সামরিক অভিযান দুই পক্ষেরই ক্ষতি ডেকে আনছে, ফুওংকেতকেও আরও বলেন, “আমরা চাই ক্যাম্বোডিয়া দেখাক যে তারা যা করছে তা বন্ধ করতে প্রস্তুত—তারপর অবশ্যই আমরা কূটনীতি ও আলোচনার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারব।”
পরে মঙ্গলবার ক্যাম্বোডিয়া জানায় তারা থাইল্যান্ডের সঙ্গে অবিলম্বে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসতে আগ্রহী।
ক্যাম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেতের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সোয়োস ইয়ারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “ধরুন, এখন থেকে এক ঘণ্টা পরেই উভয় পক্ষ রাজি হলো, টেবিলে বসল, তারপর যোগাযোগ শুরু করল—এটা খুবই ভালো উদ্যোগ হবে’’।
তবে, আলোচনা শুরু করতে প্রথম পদক্ষেপ তারা নেবে না বলেও জানান তিনি। “উভয় পক্ষের পারস্পরিক সদিচ্ছা থাকতে হবে,” তিনি যোগ করেন।
উভয় দেশই বলছে যে সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে সীমান্তের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পালিয়ে যাচ্ছে। থাইল্যান্ড বলছে, তাদের সীমান্ত এলাকায় ৪ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, আর ক্যাম্বোডিয়ার দাবি, তাদের ভূখণ্ডে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ স্থানান্তরিত হয়েছে।
তিনি বলেন, আপাতত উভয় পক্ষই শত্রুতা বন্ধ করতে আগ্রহী নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়া অপ্রত্যাশিত ছিল না। জুলাইয়ের সংঘর্ষ থামাতে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন—যদি উভয় দেশ যুদ্ধ বন্ধ না করে, তবে শুল্ক কমানোর আলোচনাগুলো স্থগিত রাখা হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অক্টোবর মাসে ট্রাম্পের উপস্থিতিতে একটি বর্ধিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হয়।
কম্বোডিয়ার থিংক ট্যাঙ্ক ‘ফিউচার ফোরাম’-এর প্রতিষ্ঠাতা ভিরাক উ আল জাজিরাকে বলেন, ওই যুদ্ধবিরতিটি ছিল “জোরপূর্বক চাপানো”, বিশেষ করে শুল্কসংক্রান্ত হুমকির কারণে। সেই কারণেই যুদ্ধবিরতিটি ভঙ্গুর ছিল, তিনি বলেন।
থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুওংকেতকেও মঙ্গলবার রয়টার্সকে বলেন, যুদ্ধবিরতি আলোচনায় থাইল্যান্ডকে চাপ দিতে শুল্কের হুমকি ব্যবহার করা উচিত নয় এবং সংঘর্ষ কমানোর দায়িত্ব প্রথমে ক্যাম্বোডিয়ার।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি না যে থাইল্যান্ডকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনার জন্য শুল্ককে চাপ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
“থাই–ক্যাম্বোডিয়া সম্পর্কের বিষয়টি এবং বাণিজ্য আলোচনার বিষয়টি আলাদা করে দেখা উচিত,” তিনি যোগ করেন।
ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ৮১৭ কিলোমিটার (৫০৮ মাইল) দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা নিয়ে থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়া পরস্পরের সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে। ১৯০৭ সালে ফ্রান্স যখন ক্যাম্বোডিয়াকে উপনিবেশ হিসেবে শাসন করছিল, তখন এই সীমান্ত মানচিত্র আঁকা হয়।
এই উত্তেজনা মাঝে মধ্যেই সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। যেমন ২০১১ সালে এক সপ্তাহব্যাপী কামান যুদ্ধ হয়, যদিও তা শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যার সমাধানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ১৯৬২ সালের রায় পুনর্ব্যক্ত করে, যেখানে প্রেহ ভিহিয়ার মন্দিরসংলগ্ন ভূমির একটি অংশ ক্যাম্বোডিয়ার অধীনে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং থাইল্যান্ডকে সেখান থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
থাইল্যান্ড কিন্তু এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের এখতিয়ার মানতে অস্বীকার করেছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ