মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় নেতাদের “দুর্বল” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে দেওয়া সহায়তা কমিয়ে আনতে পারে।
পলিটিকোকে দেওয়া বিস্তৃত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ক্ষয়িষ্ণু ইউরোপীয় দেশগুলো অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ইতি টানতে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তিনি অভিযোগ করেন, ইউরোপ ইউক্রেনকে “শেষ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত লড়াই করতে দিচ্ছে”।
ইউরোপীয় নেতারা যুদ্ধ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টায় নিজেদের ভূমিকা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে আসছে কারণ তাদের আশঙ্কা, দ্রুত সমাধানের স্বার্থে সেই প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এ প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, তিনি ইউরোপে শুধু “শক্তি” দেখছেন, প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ এবং কিয়েভকে আর্থিক সহায়তা এর উদাহরণ।
ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, দুইজন প্রেসিডেন্ট শান্তির জন্য কাজ করছেন। আর একজন প্রেসিডেন্ট, ভ্লাদিমির পুতিন, এ পর্যন্ত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে কেবল সংঘাত বাড়ানোর পথই বেছে নিয়েছেন।
ট্রাম্প জেলেনস্কির ওপর চাপ বাড়াতে থাকেন, যাতে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে কোনো চুক্তিতে সম্মত হন, এবং তাকে সহযোগিতা করতে আহ্বান জানান। যার অর্থ মস্কোর কাছে কিছু ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া। রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পূর্ণমাত্রায় ইউক্রেনে আক্রমণ চালিয়ে আসছে।
জেলেনস্কি মঙ্গলবার এক্সে লিখেন, ইউক্রেন ও ইউরোপ যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলোর সব উপাদান নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
ট্রাম্পের ইউরোপ সমালোচনার এই সর্বশেষ ঘটনা আসে একদিন পর, যখন ইউরোপীয় নেতারা লন্ডনে একত্রিত হয়ে ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধে তাদের যৌথ প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেন।
যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ইউরোপ কি যুদ্ধ শেষ করতে সহায়তা করতে পারে? ট্রাম্প বলেন: “তারা কথা বলে, কিন্তু কিছুই করে না। আর যুদ্ধ তো চলেই যাচ্ছে, চলেই যাচ্ছে।”
মার্কিন কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনীয় ও রাশিয়ান প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করেছে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে। এখনো কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো যায়নি।
ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে গত ১৮ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (মাঝে)। সংগৃহীত
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয় ও ন্যাটো নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—যেন তারা যুক্তরাষ্ট্রকে এমন কোনো চুক্তির দিকে ঠেলে দিতে না দেয়, যা ভবিষ্যতে ইউক্রেনকে আবারও হামলার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
গত রবিবার ট্রাম্প অভিযোগ করেন, জেলেনস্কিই শান্তির পথে প্রধান বাধা।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে শান্তি পরিকল্পনা উভয় পক্ষকে জানিয়েছে, তাতে রাশিয়া “সন্তুষ্ট”—যদিও সেই প্রস্তাবে ইউক্রেনের জন্য বড় ধরনের ছাড়ের কথা আছে, এবং যা মিত্রদের মতে ভবিষ্যৎ আক্রমণের জন্য ইউক্রেনকে অরক্ষিত করে তুলতে পারে।
পলিটিকোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইউক্রেনীয় আলোচকরা ওই প্রস্তাব “অত্যন্ত পছন্দ করেছে”, তবে জেলেনস্কি তা এখনো পড়েননি।
যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ইউক্রেনে এখন নির্বাচন করার সময় এসেছে কি না—ট্রাম্প বলেন: “আমার মনে হয় সময় এসেছে।”
ট্রাম্প আরও যোগ করেন, “হয়তো জেলেনস্কিই জিতবেন। আমি জানি না কে জিতবেন। কিন্তু তারা অনেক দিন ধরে নির্বাচন করেনি। আপনি জানেন, তারা গণতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু এমন একটা সময় আসে যখন আর সেটা গণতন্ত্র থাকে না।”
ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেন ২০২২ সালের আক্রমণের পর থেকে কোনো নির্বাচন করেনি। কারণ সামরিক আইন থাকায় নির্বাচন অবৈধ। শান্তিকালীন নিয়মে জেলেনস্কির মেয়াদ শেষ হয়ে যেত—যা রাশিয়ার বরাবরের প্রচারণার একটি প্রধান বিষয়।
ট্রাম্পের মন্তব্য প্রকাশের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জেলেনস্কি বলেন, তিনি “নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত” এবং আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দেবেন।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, জেলেনস্কি বলেছেন নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে আগামী ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যেই নির্বাচন সম্ভব।
মার্কিন-ইউরোপ জোটে মতাদর্শিক বিভাজনের দাবি
পলিটিকোর সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের জোট এখন মতাদর্শগত বিভাজনের কারণে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, যেসব নেতাকে তিনি দুর্বল মনে করেন, তারা কি এখনো মিত্র হতে পারেন? তিনি বলেন: “এটা নির্ভর করে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি মনে করি তারা দুর্বল এবং তারা রাজনৈতিকভাবে এতটাই সঠিক হতে চায় যে তারা জানেই না কী করতে হবে।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসে তার প্রশাসনের প্রকাশিত ৩৩-পৃষ্ঠার নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ঘোষণার পর, যেখানে ইউরোপের সম্ভাব্য “সভ্যতার বিলুপ্তি” নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে এবং প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কিছু দেশ আদৌ নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে টিকে থাকতে পারবে কি না।
রাশিয়া সেই কৌশলকে স্বাগত জানিয়েছে—যা রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কোনো হুমকি হিসেবে চিত্রিত করেনি এবং বলেছে এটি মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে “বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্যপূর্ণ”
মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) ট্রাম্প আরও সতর্ক করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে “ইউরোপের অনেক দেশ আর টিকে থাকার মতো দেশ হিসেবে থাকবে না।”
তিনি বলেন, “অভিবাসন নিয়ে তারা যা করছে তা সম্পূর্ণ বিপর্যয়।”
তিনি হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডকে এই ক্ষেত্রে “খুব ভালো কাজ করছে” বলে প্রশংসা করেন, তবে অন্য বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশকে “ক্ষয়িষ্ণু” বলে উল্লেখ করেন।
মঙ্গলবার ওই কৌশল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বলেন, এর কিছু অংশ যুক্তিযুক্ত বা বোধগম্য হলেও অনেক অংশই ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য।
তিনি ইউরোপে গণতন্ত্র রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেন এবং বলেন ইউরোপ নিজেই এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম।
এই কৌশলে ট্রাম্পের জাতিসংঘে দেওয়া আগের বক্তৃতার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়—যেখানে তিনি পশ্চিম ইউরোপের অভিবাসন নীতি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নীতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/