১৯৯৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণগুলির ঘটনার পর দেশটি বিশ্বের অন্যতম কঠোর অস্ত্র আইন চালু করেছিল। বাধ্যতামূলক লাইসেন্স, ক্রেতার অতীত যাচাই এবং প্রতিটি আগ্নেয়াস্ত্র নিবন্ধনের মতো নিয়ম তখন জাতীয় ঐকমত্যে গৃহীত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সে আইন শিথিল হওয়া, ইন্টারনেট যুগের বাস্তবতার সঙ্গে তাল না মেলানো এবং অতীত যাচাইয়ে ঢিলেমির মতো বিষয়গুলো সিডনির বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে গত রবিবারের হামলার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন অস্ত্র নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
বন্ডাই সৈকতে ১৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে অস্ট্রেলিয়ার কঠোর অস্ত্র আইন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আদৌ আইনটি কার্যকর আছে কি না, সে প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। বাস্তবে অস্ট্রেলিয়ার অস্ত্র আইন পরিচালিত হয় আটটি রাজ্য ও অঞ্চলের পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যে আনা সংশোধনের কারণে নজরদারি কিছুটা শিথিল হয়েছে। ফলে কম তদারকিতে বেশি অস্ত্র কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্ডাইয়ের হামলাকারী সাজিদ আকরাম (৫০) ২০২৩ সালে অস্ত্রের লাইসেন্স পান। তার বৈধভাবে কেনা ছয়টি অস্ত্র ছিল। সেগুলো তিনি ও তার ছেলে হামলায় ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৮ সালে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য অস্ত্র আইনের একটি নিয়ম বাতিল করে। ওই নিয়ম বাতিলের ফলে কারও কাছে আগে থেকেই একটি অস্ত্র থাকলে আরেকটি কেনার ক্ষেত্রে আর ২৮ দিন অপেক্ষা করতে হয় না। বেশির ভাগ রাজ্যই পরে একই পথ অনুসরণ করেছে।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের কর্মী ও ১৯৯৬ সালের আইনে অস্ট্রেলীয় সরকারকে পরামর্শ দেওয়া রেবেকা পিটার্স বলেন, ‘প্রতিটি নতুন অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে নজরদারি আরও কঠোর হওয়া উচিত ছিল। প্রতিটি অতিরিক্ত অস্ত্রের জন্য যদি ২৮ দিন অপেক্ষা করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক থাকত, তা হলে তার (হামলাকারী) পক্ষে এতগুলো অস্ত্র জোগাড় করা সম্ভব হতো না। নিউ সাউথ ওয়েলস সেই নিয়ম বাতিল করেছে।’ রাজ্য সরকার জানিয়েছে, তারা দ্রুত বৈঠক করে নতুন অস্ত্র আইন বিবেচনা করবে, তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
বন্ডাই হামলার পর ফেডারেল সরকারও বর্তমান আইনের দুর্বলতা স্বীকার করেছে। নতুন কিছু পরিবর্তনও আনতে চাইছেন তারা। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে- একজন লাইসেন্সধারী সর্বোচ্চ কতটি অস্ত্র রাখতে পারবেন তার সীমা নির্ধারণ এবং আজীবন লাইসেন্স দেওয়ার প্রথা বাতিল করা। তবে পিটার্সের মতে, অস্ত্রের সংখ্যা সীমিত করার চেয়ে প্রতিটি অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় ফিরিয়ে আনা জননিরাপত্তায় বেশি কার্যকর হবে।
থিঙ্কট্যাঙ্ক দ্য অস্ট্রেলিয়া ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার দেশ অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ১০ লাখ মানুষের অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে এবং বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, অস্ট্রেলীয়দের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আরও কঠোর অস্ত্র আইন চান, আর মাত্র ৬ শতাংশ আইন শিথিল করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
এদিকে, সিডনির বন্ডাই সৈকতে রবিবারের গণগুলির ঘটনায় জীবিত সন্দেহভাজন নাভিদ আকরামের বিরুদ্ধে ৫৯টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের দেওয়া তথ্যানুসারে, সেসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ১৫টি হত্যা মামলা এবং একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগও।
ঘটনাস্থলে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত হন নাভিদের বাবা, ৫০ বছর বয়সী সাজিদ আকরাম। অস্ট্রেলিয়ার ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এমন সময় ওই হামলা চালানো হয়, যখন তারা হানুক্কা উৎসব উদযাপন করছিলেন। সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি