চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে ড্রোন হামলায় সুদানের রাজধানী খার্তুমসহ দেশের একাধিক বড় শহর বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার পর এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) রিভার নাইল রাজ্যের আতবারায় অবস্থিত ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্রটি সরকার-সমর্থিত সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ)-এর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তা আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রথম ড্রোন হামলার পর আগুন নেভাতে গিয়ে দুইজন সিভিল ডিফেন্স সদস্য নিহত হন। পরে দ্বিতীয় দফা ড্রোন হামলায় আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত আরও উদ্ধারকর্মীরা আহত হন।
আল জাজিরা জানায়, শুরুতে স্থানীয় বাসিন্দারা ভেবেছিলেন এটি স্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট। পরে তারা জানতে পারেন, খার্তুম থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার উত্তরে আতবারায় ঘটে যাওয়া হামলার সঙ্গেই এই বিদ্যুৎ বিপর্যয় জড়িত।
সুদানের যুদ্ধে এ ধরনের ড্রোন হামলা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি বছর এবং গত বছরজুড়েই এমন ঘটনা ঘটেছে। আরএসএফের ড্রোন হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সুদানের ভেতরে হামলা চালাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য সুদানের সরকারকে দুর্বল করা এবং সাধারণ মানুষকে বোঝানো যে সামরিক সরকার তাদের সুরক্ষা দিতে পারছে না।
এই হামলা সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ ড্রোন অভিযানের সর্বশেষ উদাহরণ। ডিসেম্বরের শুরু থেকে সুদানের কর্দোফান অঞ্চলে এসব হামলায় অন্তত ১০৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি হয় দক্ষিণ কর্দোফানের কালোগিতে—একটি কিন্ডারগার্টেন ও হাসপাতাল লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলায় ৮৯ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ৪৩ শিশু ও আট নারী ছিলেন।
ডিসেম্বরের ১৩ তারিখে কাদুগলিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের একটি ঘাঁটিতে আরএসএফের ড্রোন হামলায় ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হন। এর পর জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, শান্তিরক্ষীদের লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এর একদিন পর ডিলিং মিলিটারি হাসপাতালে হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত ও ১২ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে বহু চিকিৎসাকর্মী ছিলেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফ—উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে ড্রোন ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘আফ্রিকা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে আফ্রিকার ১৩টি দেশে মোট ৪৮৪টি ড্রোন হামলা হয়েছে, যার মধ্যে ২৬৪টিই ঘটেছে সুদানে—অর্থাৎ পুরো মহাদেশের অর্ধেকেরও বেশি।
২০২৫ সালের মার্চ নাগাদ হামলার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়; ওই সময় মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ১০০টির বেশি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করে এসএএফ।
যৌন সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে সুদানে পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরু হয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যদিও প্রকৃত সংখ্যা এখনও স্পষ্ট নয়।
এই সংঘাতকে জাতিসংঘ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছে। দেশটিতে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং অন্তত ৩ কোটি মানুষের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। শুধু উত্তর কর্দোফান থেকেই ৪০ হাজারের বেশি মানুষ পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বহু শহরে সাধারণ মানুষ এখনও অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন।
টানা তৃতীয় বছরের মতো আন্তর্জাতিক উদ্ধার সংস্থা (আইআরসি)-এর জরুরি নজরদারি তালিকায় শীর্ষে রয়েছে সুদান। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই তালিকায় বলা হয়, বৈশ্বিক মানবিক তহবিল ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের এক জরিপে ২২টি ত্রাণ সংস্থা ২০২৫ সালের সবচেয়ে অবহেলিত সংকট হিসেবে সুদানকে চিহ্নিত করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস গতকাল বুধবার জানান, চলতি বছরে সুদানের বিভিন্ন চিকিৎসা স্থাপনায় ৬৫টি হামলায় ১ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রতিটি হামলাই আরও বেশি মানুষকে চিকিৎসা ও ওষুধ থেকে বঞ্চিত করছে।”
জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের মুখপাত্র সেইফ মাগাঙ্গোও জানান, যৌন সহিংসতাও ‘উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে’, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন নারীরা। তার ভাষায়, “নারীরা একদিকে হত্যাকাণ্ড ও বোমাবর্ষণ থেকে পালাতে গিয়ে, একই সঙ্গে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন।” বিশেষ করে এল-ফাশের এলাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমানে সবচেয়ে তীব্র লড়াই দারফুর অঞ্চল থেকে সরে এসে দেশের মধ্যাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যেখানে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলো দেশটিকে কার্যত দ্বিখণ্ডিত করে রেখেছে।
গত মঙ্গলবার ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেলথের হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাব প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অক্টোবরে এল-ফাশের দখলের পর আরএসএফ বাহিনী সেখানে সংঘটিত গণহত্যার প্রমাণ মুছে ফেলতে ‘ব্যবস্থাগত ও বহু সপ্তাহব্যাপী’ অভিযান চালায়। এতে মরদেহ কবর দেওয়া, পোড়ানো এবং মানবদেহের অবশেষ সরিয়ে নেওয়ার মতো কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/