প্রায় ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই প্রত্যাবর্তনকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।
বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বেলা পৌনে ১২টায় তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার ফ্লাইট বিজি-২০২ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিআইপি গেট থেকে বুলেটপ্রুফ বাসে করে তিনি রাজধানীর পূর্বাচল ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের উদ্দেশে রওনা হন। বাসটির গায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলের প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বড় আকারের প্রতিকৃতি সংবলিত ছিল।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ১৭ বছর পর দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতা তারেক রহমান। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তার প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে বিএনপি রাজধানীতে ইতিহাসের অন্যতম বড় সমাবেশ আয়োজন করেছে। বিমানবন্দর থেকে অভ্যর্থনাস্থল পর্যন্ত লাখ লাখ সমর্থক সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে দলীয় পতাকা, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও ফুল হাতে তাকে স্বাগত জানান।
আল জাজিরা আরও জানায়, বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তারেক রহমানকে দলটির প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতা মূলত খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার মধ্যে পালাবদল হয়েছে। তবে আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা জোরালো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, দেশের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান বৃহস্পতিবার ঢাকায় পৌঁছান। ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান ২০০৮ সালে রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ তুলে দেশ ছেড়ে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
এএফপি আরও উল্লেখ করে, গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এর পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা সবচেয়ে গুরুতর মামলার রায় বাতিল হয়। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তাকে অনুপস্থিতিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি বরাবরই অস্বীকার করে আসছিলেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এএফপিকে বলেন, “২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান ঢাকায় আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন, যা দলের জন্য অত্যন্ত আনন্দের দিন।”
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে জানায়, প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার মুসলিম-প্রধান বাংলাদেশ বর্তমানে এক সংবেদনশীল নির্বাচনী সময় পার করছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এ নির্বাচন পরিচালনা করছে। ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এক জরিপে বিএনপিকে আসন্ন নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পাওয়ার সম্ভাব্য দল হিসেবে দেখানো হয়েছে।
রয়টার্স আরও জানায়, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত কারণও রয়েছে। তার মা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ থাকায় পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে দেশে ফেরাকে জরুরি মনে করা হয়েছে। তবে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা ও গণমাধ্যমে হামলার ঘটনায় উদ্বেগও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ‘১৭ বছর পর স্ত্রী, কন্যা এবং বিড়াল নিয়ে তারেক রহমান ঢাকায় ফিরেছেন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, দীর্ঘ নির্বাসন শেষে লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান এবং পোষা বিড়াল। বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানাতে রাজধানীর রাজপথে নেমে আসে বিএনপির হাজারো নেতাকর্মী ও সমর্থক।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ডন ‘১৭ বছর পর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী তারেক রহমান’ শিরোনামে প্রতিবেদনে জানায়, তার এই প্রত্যাবর্তন ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নতুন করে উজ্জীবিত করবে বলে বিএনপির আশা। দলটির দৃষ্টিতে, আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে তিনি অন্যতম শীর্ষ সম্ভাব্য প্রার্থী।
ডনের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে হালকা ধূসর রঙের সূক্ষ্ম চেক ডিজাইনের ব্লেজার ও সাদা শার্ট পরিহিত তারেক রহমান জুতা খুলে খালি পায়ে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। এরপর এক মুঠো মাটি হাতে তুলে নেন, যা তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবে উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তার এই আবেগঘন প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মেহেদী/