যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর অভিযানে নিকোলাস মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক বলে জানিয়েছেন। সামরিক অভিযানের পরপরই তার কণ্ঠে যে কড়া সুর ছিল, এটি তার একটি বড় ধরনের পরিবর্তন।
রদ্রিগেজ স্থানীয় সময় রবিবার টেলিগ্রামে লিখেছেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখাকে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা মার্কিন সরকারকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি যাতে যৌথ উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সহযোগিতামূলক এজেন্ডা নিয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি।’’
২০১৮ সাল থেকে মাদুরোর ডেপুটি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রদ্রিগেজকে শনিবার ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১১ সালে পাকিস্তানে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার পর এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আলোচিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযান, যেখানে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়।
শনিবার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে রদ্রিগেজ মার্কিন এই পদক্ষেপকে ‘‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং একটি নৃশংসতা’’ বলে নিন্দা জানিয়েছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, ‘‘নিকোলাস মাদুরোই ভেনেজুয়েলার একমাত্র প্রেসিডেন্ট।’’
রদ্রিগেজের সেই বক্তব্য ট্রাম্পের সঙ্গে তার দূরত্বের সৃষ্টি করেছিল। কারণ মাদুরোকে ধরার পরপরই ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে মার্কিন কর্মকর্তারা রদ্রিগেজের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং তিনি সহযোগিতা করতে রাজি আছেন। কিন্তু রদ্রিগেজ যখন টেলিভিশনে ট্রাম্প প্রশাসনকে ‘চরমপন্থী’ বলে আখ্যা দেন, তখন ট্রাম্পের সুর বদলে যায়। তিনি রদ্রিগেজকে ‘ভদ্র’ বলার বদলে সরাসরি হুমকি দিতে শুরু করেন।
রবিবার সকালে ‘দ্য আটলান্টিক’ ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘‘সে (রদ্রিগেজ) যদি সঠিক কাজ না করে, তবে তাকে বড় মূল্য দিতে হবে, সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বেশি।’’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও জানান যে, ভেনেজুয়েলায় আরও হামলা হতে পারে এবং সেখানে স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তিনি পুনরুল্লেখ করেন যে, ভেনেজুয়েলা এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব ও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। এটি ট্রাম্পের নির্বাচনের সময় দেওয়া ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা অন্তহীন যুদ্ধ থেকে দেশকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এমনকি ইরাক যুদ্ধে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টারও তিনি আগে সমালোচনা করেছিলেন।
রদ্রিগেজ রবিবার আলাদাভাবে জানান যে, তিনি মাদুরো ও তার স্ত্রীর মুক্তির পথ খুঁজতে একটি কমিশন গঠন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘নার্কো-টেররিজম’ (মাদক-সন্ত্রাস), কোকেন আমদানি, এবং ভারী অস্ত্র ও ধ্বংসাত্মক সরঞ্জাম রাখার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই কমিশনের সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ করবেন ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল এবং রদ্রিগেজের ভাই হোর্হে, যিনি জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট।
মাদুরোর ভবিষ্যৎ হয়তো পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগার মতোই হতে যাচ্ছে। ১৯৯০ সালে পানামায় মার্কিন আগ্রাসনের পর নরিয়েগাকে একইভাবে আটক করা হয়েছিল। নরিয়েগার বিরুদ্ধেও মাদক পাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগ ছিল এবং তাকে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন দেশে জেল খাটেন।
সোমবার নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে মাদুরোর হাজির করতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই অভিযানকে একটি আইনি পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করছেন।
তবে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে এর পেছনে অন্যান্য কারণও ছিল, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ভেনেজুয়েলার অভিবাসীদের ঢল এবং কয়েক দশক আগে ভেনেজুয়েলা কর্তৃক মার্কিন তেলের স্বার্থ জাতীয়করণ করার বিষয়টি। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/