ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চন্দননগরে প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান বিপ্লবী ও অধ্যাত্ম সাধক মতিলাল রায়ের ১৪৫তম আবির্ভাব দিবস পালিত হয়েছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) ঋষি অরবিন্দের একান্ত অনুগামী, অধ্যাত্ম সাধক ও সঙ্ঘগুরু এই বিপ্লবীর আবির্ভাব উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া সোমঋতা মল্লিকের পরিচালনায় ‘নজরুলের মতিলালদা’ শীর্ষক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন শ্রী তপন চট্টোপাধ্যায়। স্বাগত ভাষণ দেন সঙ্ঘ সম্পাদক শ্রী প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করেন সঙ্ঘ সভাপতি ডা. সনৎ কুমার ঘোষ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- ড. রমাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- চন্দননগর রামকৃষ্ণ আশ্রম মঠের সমতানন্দপুরী মহারাজ। এ ছাড়া নজরুল চর্চাকেন্দ্র ছায়ানটের (কলকাতা) শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সোমঋতা মল্লিকের গবেষণায় উঠে আসে প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের সঙ্গে চেতনার কবি নজরুলের আন্তরিক সম্পর্কের কথা। ১৯২৫ সালের ২১ মে মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম হুগলি থেকে সঙ্ঘগুরু শ্রীশ্রী মতিলাল রায়কে চিঠিতে লিখেন- ‘মতিলালদা, এরা তিনজন উত্তরবঙ্গ থেকে আসছেন দেশভ্রমণে। এরা সকলেই ছাত্র, খুব ভালো ছেলে। প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের দেখবার মতো বস্তুগুলো এদেরকে দেখিয়ে দেবেন। এরা আমার সহোদর প্রতিম। ইতি- নজরুল’
নজরুল স্মৃতি-বিজড়িত জায়গাগুলো সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে জানানোর জন্য নজরুলপ্রেমীদের সঙ্গে নিয়ে ছায়ানট (কলকাতা) দীর্ঘ ১৮ বছর কাজ করছে। নজরুল-চর্চার ধারাবাহিকতায় প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের সাথে ছায়ানটের কার্যক্রমের সূত্রপাত। পরবর্তীতে প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের বর্তমান সম্পাদক প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করে এই সংস্থা।
প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘সঙ্ঘগুরু শ্রীশ্রী মতিলাল রায়কে নজরুল মতিলালদা বলে সম্বোধন করতেন। সঙ্ঘজননী রাধারাণী দেবীর অকৃত্রিম স্নেহ নজরুল পেয়েছিলেন। অন্নপূর্ণা মন্দির, যেখানে রাধারাণী দেবী অবস্থান করতেন, সেখানে অবলীলায় নজরুল প্রবেশ করতেন, মা অতি যত্ন সহকারে নজরুলকে খাবার পরিবেশন করতেন এবং খাওয়ার পর নজরুলের হাতে একটি পান দিতেন। নজরুল সেই পান না চিবিয়ে গালে রেখে দিতেন, তাঁর সামনে হারমোনিয়াম দেওয়া হত, নজরুল একের পর এক শ্যামাসঙ্গীত পরিবেশন করতেন। নজরুলের পরিবেশনায় মাসহ আশ্রমকন্যারা অভিভূত হতেন।’
প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের সংগ্রহশালার জন্য ছায়ানটের পক্ষ থেকে নজরুল-সংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি তুলে দেওয়া হয়। পীতম ভট্টাচার্যের পরিচালনায় সমবেতভাবে নজরুলের দুটি কবিতা ‘হে সর্বশক্তিমান’ ও ‘সাম্যবাদী’ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। নজরুল রচিত ভক্তিমূলক গান ‘মহাকালের কোলে এসে গৌরী হল মহাকালী’ এবং ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন’ সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয়। সোমঋতা মল্লিক একক কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘এবার নবীন মন্ত্রে হবে জননী তোর উদ্বোধন’ এবং ‘তোর রাঙা পায়ে নে মা শ্যামা আমার প্রথম পূজার ফুল’। ‘এবার নবীন মন্ত্রে হবে জননী তোর উদ্বোধন’ গানটি ১৩৪৭ বঙ্গাব্দে কার্তিক সংখ্যায় প্রবর্ত্তক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ গানটি সমবেতভাবে পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ছায়ানটের অনুষ্ঠান শেষ হয়।
বিপ্লবতীর্থ চন্দননগরে দাঁড়িয়ে নজরুলের বিপ্লবী চেতনার কথা তুলে ধরেন সোমঋতা মল্লিক। তিনি বলেন, ‘প্রাক্ স্বাধীনতা যুগে যে মন্ত্রে তিনি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উজ্জীবিত করেছিলেন, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও সুন্দর-বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে সেই মন্ত্রই হোক আমাদের পাথেয়। আত্মবলে বলীয়ান হয়ে, তাঁর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও যদি বলে উঠি- একবার শির উঁচু করে বল দেখি বীর, মোরা সবাই স্বাধীন, সবাই রাজা!’ শুধু সাহিত্য আসরে নয়, বৈপ্লবিক কাজে নজরুল একাধিকবার চন্দননগরে এসেছেন। প্রবর্ত্তক সঙ্ঘে নজরুল বেশ কয়েকবার যান, সেই সম্পর্কে মনোরঞ্জন সেনের এই লিখিত স্মৃতিচারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। বাসন্তী সংগীত বিদ্যাবীথির প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক এবং কাজী নজরুল ইসলামের সহযোগী সংগীতশিল্পী মনোরঞ্জন সেন তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন- ‘‘কাজী নজরুল ইসলামকে প্রথম দেখি ১৯২১ সালে চন্দননগরে প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের কার্যালয়ে শ্রদ্ধাস্পদ মতিলাল রায়ের সান্নিধ্যে, একটি সম্মেলন উপলক্ষে। ঐ সম্মেলনে আমি ‘বন্দেমাতরম’ গেয়েছিলাম, আর সেই সুবাদেই পরিচিত হলাম কাজী সাহেবের সঙ্গে। ওঁর পরিধানে তখন খদ্দরের খাটো ধুতি ও চাদর। লম্বা চুল, উজ্জ্বল চোখ আর ঘর-কাঁপানো হাসি তো ছিলই। পরিচয় হল বটে, তবে ঘনিষ্ঠতা নয়। কাজী সাহেবের সংগীতচর্চার বেশির ভাগটাই তখন স্বদেশী গান নিয়ে, গাইছেন ‘বল নাহি ভয় নাহি ভয়’, ‘ভাই হয়ে ভাই চিনবি আবার’, ‘এস এস ওগো মরণ’, ‘আজি রক্ত নিশি ভোরে’, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ প্রভৃতি গান। আমি মূলত ক্ল্যাসিকাল চর্চা করি শুনে বাংলা গান গাওয়ার উৎসাহ দিলেন। মাঝে-মধ্যে দেখা হলেও ঘনিষ্ঠতা শুরু হল ১৯২৬ সাল নাগাদ।’’
নজরুল ও প্রবর্ত্তক সঙ্ঘ সম্পর্কিত এইরকম বেশ কিছু তথ্য ছায়ানটের অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়। ছায়ানটের অনুষ্ঠান ছাড়াও চন্দননগরের খলিসানী বিদ্যামন্দিরের ছাত্র-ছাত্রীদের পরিবেশনা ‘বিপ্লবী মাখনলাল’ সবার প্রশংসা লাভ করে। বোড়াই চণ্ডীতলার প্রবর্ত্তক নারীমন্দিরের ‘আবৃত্তি আলেখ্য’ বিশেষ নজর কাড়ে। প্রতিটি পরিবেশনায় ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী বিপ্লবীদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা। অনুষ্ঠানে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ নতুন আশা জাগায়।
সুমন/